সবকিছুই তোমার মাঝে আর সবকিছুর মাঝে তুমি; তুমি সবকিছু জুড়ে থাক আর ঘিরে থাক; যখন সবকিছু সৃষ্টি হলো, সবকিছুতে তুমি ছিলে, সবকিছু সৃষ্টির আগে তুমিই ছিলে সব ।[৫৩]
এই সর্বব্যাপীতোকে তারা বিশেষ রূপ দিয়েছিলেন এভাবে যে, কারও পক্ষেই স্বয়ং ঈশ্বরের নিকটবর্তী হওয়া সম্ভব নয়; তবে তিনি তাঁর প্রতাপের (কাতোদ) বা ‘শেকিনাহ নামের মহাব্যাপ্তিতে’ নিজেকে যতটা প্রকাশ করেন কেবল তারই নৈকট্য লাভ করা যায়। পিয়েটিস্টরা আপাত অসামঞ্জস্যতায় উদগ্রীব ছিল না । তারা ধর্মতাত্ত্বিক সৌন্দর্যের বদলে বরং ব্যবহারিক বিষয়ের দিকে বেশি জোর দিয়েছে, সতীর্থ ইহুদিদের মনোসংযোগের পদ্ধতি (কাওয়ানাহ) ও অঙ্গভঙ্গির শিক্ষা দান করেছে যা ঈশ্বরের উপস্থিতি সম্পর্কে তাদের অনুভূতিকে জোরাল করে তুলবে। নীরবতার আবশ্যকতা ছিল; একজন পিয়েটিস্টকে শক্ত করে চোখ বন্ধ রাখতে হবে, বিচ্যুতি এড়াতে প্রার্থনার চাদরে মাথা ঢাকতে হবে, পেট ভেতরে টেনে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে রাখতে হবে। তারা ড্রয়িং আউট প্রেয়ার’-এর বিশেষ কায়দা আবিষ্কার করেছিল যাতে এই বোধ উৎসাহিত হতে দেখা গেছে। শাস্ত্রের বাক্যাবলীর মামুলি পুনরাবৃত্তির বদলে পিয়েটিস্টকে প্রত্যেক শব্দের অক্ষরগুলো গুনতে হবে, ওগুলোর সংখ্যাতাত্ত্বিক মূল্য হিসাব করে ভাষার আক্ষরিক অর্থের ঊর্ধ্বে আরোহণ করতে হবে। তাকে অবশ্যই এক উন্নত সত্তার অনুভূতি জোরাল করতে ওপরের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
ইসলামি সাম্রাজ্যের যেসব স্থানে অ্যান্টি-সেমিটিক নির্যাতনের অস্তিত্ব ছিল না সেসব জায়গায় ইহুদিদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো ছিল। তাদের এই আশকেনাযিয় ধর্মানুরাগের প্রয়োজন ছিল না। অবশ্য মুসলিমদের অগ্রগতির প্রতি সাড়া হিসাবে এক নতুন ধরনের ইহুদিবাদ গড়ে তুলছিল তারা। ইহুদি ফায়সুফরা যেমন বাইবেলের ঈশ্বরকে দর্শনের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছিল, ঠিক তেমনি অন্য ইহুদিরাও তাদের ঈশ্বরকে অতিন্দ্রীয় প্রতীকী ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। গোড়াতে এই অতিন্দ্রীয়বাদীরা একেবারে সংখ্যালঘু একটা গোষ্ঠী ছিল। এদের অনুশীলন ছিল নিগূঢ় অনুশীলন, তাত্ত্বিক গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নিতে হতো: একে তারা বলত কাব্বালাহ বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ঐতিহ্য। অবশ্য শেষ পর্যন্ত কাব্বালাহর ঈশ্বর সিংহভাগ মানুষকে আগ্রহী করে তুলবে ও ঈশ্বর সম্পর্কে ইহুদিদের দৃষ্টিভঙ্গিকে এমনভাবে ধারণ করবে যা দার্শনিকদের ঈশ্বরের পক্ষে কখনও সম্ভব হয়নি। দর্শন ঈশ্বরকে দূরবর্তী বিমূর্ত অস্তিত্বে পর্যবসিত করার হুমকি সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু অতিন্দ্রীয়বাদের ঈশ্বর যুক্তির গভীরে অবস্থিত আতঙ্ক ও উদ্বেগকে স্বপর্শ করতে সক্ষম ছিলেন। থ্রোন মিস্টিকরা যেখানে বাহ্যিকভাবে ঈশ্বরের ‘প্রতাপ লক্ষ করেই সম্ভষ্ট ছিল, কাব্বালিস্টরা সেখানে ঈশ্বরের অন্তস্থ জীবন ও মানুষের চৈতন্যকে ভেদ করার প্রয়াস পেয়েছে। ঈশ্বরের রূপ নিয়ে যুক্তির ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া ও জগতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সমস্যাদি নিয়ে মাথা ঘামানোর বদলে কাব্বালিস্টরা কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিল।
সুফীদের মতো কাব্বালিস্টরাও ঈশ্বরের মূল সত্তা এবং প্রত্যাদেশ ও সৃষ্টিতে আমরা যে ঈশ্বরের দেখা পাই এ দুয়ের মাঝে নস্টিক ও নিওপ্লেটোনিক পার্থক্যের ব্যবহার করেছে। স্বয়ং ঈশ্বর অত্যাবশ্যকীয়ভাবে জ্ঞানের অতীত, দুর্বোধ্য ও নৈর্ব্যক্তিক। গুপ্ত ঈশ্বরকে তারা এন সফ অভিহিত করত (আক্ষরিক অর্থে ‘অন্ত হীন’)। এন সফ সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি নাঃ এমনকি বাইবেল বা তালমুদে তাঁর নামোচ্চারিত হয়নি। ত্রয়োদশ শতাব্দীর অজ্ঞাতনামা এক লেখক লিখেছেন, এন সফ মানুষের কাছে প্রকাশিত হওয়ার মতো বিষয়ে পরিণত হতে অপারগ।৫* YHWH’র বিপরীতে এন সফের দালিলিক কোনও নাম ছিল না; তিনি কোনও ব্যক্তি নন। প্রকৃতপক্ষে গডহেডকে বোঝাতে ‘এটা বলাই অধিকতর সঠিক। এটা বাইবেল ও তালমুদের প্রবলভাবে ব্যক্তিক ঈশ্বরের ধারণা হতে মারাত্মক বিচ্যুতি। কাব্বালিস্টরা নির্দিষ্ট ধর্ম বিরোধিতার দিকে না গিয়ে এন সক ও YHWH’-র মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার জন্যে ধর্মীয় চৈতন্যের এক নতুন জগতে পদচারণার জন্যে নিজস্ব মিথলজির জন্ম দিয়েছে; যেখানে বলা হচ্ছে, এরা দুটো আলাদা সত্তা। কাব্বালিস্টরা ঐশীগ্রন্থ পাঠের এক প্রতীকী পদ্ধতির আবিষ্কার করে। সুফীদের মতো তারা এমন একটা প্রক্রিয়ার কথা কল্পনা করেছে যার মাধ্যমে গুপ্ত ঈশ্বর মানুষের সামনে হাজির হন। এন সফ দশটি ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য বা সেফিরদ অর্থাৎ সংখ্যায় ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদীদের সামনে নিজেকে প্রকাশ করেন, এই সংখ্যাগুলো জ্ঞানের অতীত গডহেডের অজ্ঞাত গভীরতা থেকে উৎসারিত স্বর্গীয় সত্তার অংশ। প্রতিটি সেফিরাহ এন সফের প্রকাশের এক একটি স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে; এর নিজস্ব প্রতীকী নাম আছে, কিন্তু এইসব স্বর্গীয় বলয়ের প্রতিটিই একেকটি বিশেষ শিরোনামের অধীনে ঈশ্বরের রহস্যের সম্পূর্ণটুকুই ধারণ করে। কাব্বালিস্টিক ব্যাখ্যায় বাইবেলের প্রতিটি শব্দ দশটি সেফিরদের কোনও একটিকে নির্দেশ করে: প্রতিটি পঙক্তি এমন এক ঘটনা বা বিষয়ের বর্ণনা করে যার অনুরূপ স্বয়ং ঈশ্বরের অন্তর্গত জীবনে অস্তিত্বমান ছিল।
