পূর্ণাঙ্গ পুরুষ অধিকতর সাধারণ মরণশীলকে ঈশ্বর সন্ধানে অনুপ্রাণিত করে বলে বিশ্বাস করা হয়েছে: রুমির মাঝে মসনাবীর কাজের দরজা খুলে দিয়েছিলেন শামস আদ-দিন, যা এই বিচ্ছেদের বেদনাকেই তুলে ধরেছে।
অন্যান্য সুফীর মতো রুমিও বিশ্বজগতকে ঈশ্বরের অযুত নামের একটা থিওফ্যানি হিসাবে দেখেছেন। এসব নামের কোনও কোনওটি ঈশ্বরের ক্রোধ বা নিষ্ঠুরতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে বাকিগুলো স্বর্গীয় প্রকৃতির সহজাত কল্পনার গুণ প্রকাশ করে। অতিন্দ্রীয়বাদী সকল বস্তুতে ঈশ্বরের সহমর্মিতা, প্রেম ও সৌন্দর্য চিহ্নিত করার বিরামহীন সংগ্রাম (জিহাদে) নিয়োজিত; যাতে অন্য সবকিছু ঝরে পড়ে। মাসনাবী মানব জীবনে দুজ্ঞেয় মাত্রা আবিষ্কার ও চেহারা ভেদ করে নিজের মাঝে গুপ্ত সত্তাকে দেখার চ্যালেঞ্জ করেছে। অহমবোধ আমাদের সকল বস্তুর অন্তস্থ রহস্য সম্পর্কে অন্ধ করে রাখে, কিন্তু একবার যদি আমরা তা অতিক্রম করে যেতে পারি তখন আর বিচ্ছিন্ন আলাদা সত্তা থাকবে না, বরং সকল অস্তিত্বের ভিত্তি’র সঙ্গে এক হয়ে যাবে । আবার, রুমি জোর দিয়ে বলেছেন, ঈশ্বর কেবল অন্তরের অনুভূতি হাত পারেন । ঈশ্বর সম্পর্কে অন্যদের ধারণা বা বিশ্বাসকে অবশ্যই সম্মান জানানো উচিত বোঝাতে মোজেস ও রাখাল বালকের মজার এক কাহিনী শুনিয়েছেন তিনি। মোজেস একদিন শুনতে পেলেন রাখাল ঈশ্বরের সঙ্গে পরিচিত ঢঙে কথা বলছে: ঈশ্বরকে সাহায্য করতে চায় সে, তিনি সেখানেই থাকুন না কেন-তাঁর পোশাক ধোয়া, উকুন বাছা, শোয়ার সময় হাত পায়ে চুমু দেওয়া। তোমাকে স্মরণ করে আমি কেবল বলতে পারি, প্রার্থনা শেষ হলো, আইইইই ও আহহহহহহহ।’ শঙ্কিত বোধ করলেন মোজেস। রাখাল কার সঙ্গে কথা বলছে। বলে ভেবেছে? স্বর্গ ও পৃথিবীর স্রষ্টা? শুনে তো মনে হচ্ছে চাচার সঙ্গে আলাপ করছে! রাখাল বালক অনুশোচনা করে হতাশ মনে মরু প্রান্তরের দিকে এগিয়ে গেল, কিন্তু মোজেসকে ভৎর্সনা করলেন ঈশ্বর । তিনি অর্থডক্স বাক্যাবলী শুনতে চাননি, প্রবল ভালোবাসা ও নম্রতা চেয়েছেন । ঈশ্বর সম্পর্কে কথা বলার সঠিক কোনও পথ নেই:
তোমার কাছে যা ভুল মনে হচ্ছে ওর জন্যে তা ঠিক,
একজনের জন্যে যা বিষ, আরেকজনের কাছে তা মধু।
পবিত্রতা ও অপবিত্রতা, উপাসনায় শৈথিল্য ও পরিশ্রম
আমার কাছে এসবের কোনও অর্থ নেই।
আমি এসব কিছু হতে আলাদা।
উপাসনার উপায়সমূহকে একটি অপরটির চেয়ে উন্নত বা
নিম্নমানের হিসাবে দেখা যাবে না।
হিন্দুরা হিন্দুদের মতো করে।
ভারতের দ্রাবিড় মুসলিমরা তাদের মতো।
এসবই প্রশংসা, এসবই ঠিক।
উপাসনার কায়দায় আমি মহিমান্বিত হই না।
মহিমান্বিত হয় উপাসকরা! আমি কোনও কথা শুনি না ।
যা তারা বলে । আমি তার অভ্যন্তরে দেখি।
এই উন্মুক্ত-ভাঙা তাই আসল সত্তা,
ভাষা নয়! অলঙ্কারময় ভাষা ভুলে যাও।
আমি চাই দাহ, দাহ।
আপন দাহর বন্ধু হয়ে যাও। তোমার চিন্তা
আর অভিব্যক্তির রূপকে পুড়িয়ে দাও![৫২]
রাখালের কথার মতোই ঈশ্বর সম্পর্কে যে কোনও রক্তব্যই অবাস্তব, কিন্তু একজন বিশ্বাসী যখন পর্দা ভেদ করে বস্তুসমূহের প্রকৃত রূপ দেখতে পাবে তখন সে বুঝবে এটা মানুষের সকল ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।
ইতিমধ্যে ট্রাজিডি ইউরোপের ইহুদিদেরও ঈশ্বর সম্পর্কে নতুন ধারণা গঠনে সাহায্য করেছিল। পশ্চিমের ক্রুসেডিং-অ্যান্টি সেমিটিজম ইহুদি জনগোষ্ঠীর জীবন ধারণকে অতীষ্ঠ করে তুলেছিল; অনেকেই থ্রোন মিস্টিকদের অনুভূত দূরবর্তী উপাস্যের চেয়ে নিকটবর্তী ব্যক্তিক ঈশ্বরের আকাক্ষা করছিল। নবম শতাব্দীতে কালোনিমোস পরিবার দক্ষিণ ইতালি থেকে জার্মানিতে পাড়ি জমানোর সময় সঙ্গে করে কিছু অতিন্দ্রীয়বাদী সাহিত্য নিয়ে যায়। কিন্তু দ্বাদশ শতাব্দী নাগাদ নির্যাতন-নিপীড়ন আশকেনায়ি ধর্মানুরাগে এক নতুন নৈরাজ্যবাদ যোগ করে। কালোনিমাস পরিবারের তিনজন সদস্যের রচনায় তা প্রকাশ পেয়েছে। স্যামুয়েল দ্য এল্ডার, যিনি ১১৫০-এর দিকে সেফার হা-ইরাহ শীর্ষক ক্ষুদে নিবন্ধ রচান করেছেন: র্যাবাই জুদাহ দ্য প্রিস্ট সেফার হাসিদিম (দ্য বুক অভ দ্য প্রিস্টস্) এবং তাঁর কাজিন র্যাবাই এলিয়েদার বেন জুদাহ অভ ওঅর্মস (মৃ: ১২৩০), যিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ ও অতিন্দ্রীয়বাদী টেক্সট সম্পাদনা করেছেন। এঁরা দার্শনিক নিয়মনিষ্ঠ চিন্তাবিদ ছিলেন না, তাঁদের রচনাবলী দেখায় যে, তারা বিভিন্ন উৎস হতে ধারণা গ্রহণ করেছেন যেগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঠেকতে পারে । তারা নিরস ফায়লাসুফ সা’দিয়া ইবন জোসেফের রচনায় দারুণ প্রভাবিত হয়েছিলেন, যাঁর গ্রন্থাবলী হিব্রুতে অনূদিত হয়েছিল, ও ফ্রান্সিস অভ আসিসির মতো ক্রিশ্চান অতিন্দ্রীয়বাদীদের রচনা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। বিভিন্ন সূত্রের এই বিচিত্র মিশেল হতে তারা এমন এক আধ্যাত্মিকতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যা সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ফ্রান্স ও জার্মানির ইহুদিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গিয়েছে।
স্মরণযোগ্য, র্যাবাইগণ ঈশ্বরের সৃষ্টি আনন্দকে অস্বীকার করা পাপ হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু জার্মান পিয়েটিস্টরা এমন এক ত্যাগের শিক্ষা প্রচার করলেন যা ক্রিশ্চান সংযমবাদের অনুরূপ। একজন ইহুদি আনন্দ থেকে মুখ ফিরিয়ে পশু-পাখি পোেষা, বাচ্চাদের সাথে খেলে সময় কাটানো বাদ দিলেই কেবল পরকালে শেকিনাহর দেখা পাবে। ইহুদিদের উচিত ভর্ৎসনার অপমানে নির্লিপ্ত থেকে ঈশ্বরের আপাথিয়া গড়ে তোলা। তবে ঈশ্বরকে বন্ধুর মতো সম্বোধন করা যেতে পারে। এলিয়েযারের মতো কোনও থ্রোন-সিস্টিক ঈশ্বরকে ‘তুমি’ সম্মোধন করার কথা স্বপ্নের ভাবতে পারেনি। এই পরিচয় রূপ শাস্ত্রে অনুপ্রবেশ করেছে ও এমন এক ঈশ্বরকে তুলে ধরেছে যিনি আবার সর্বত্র বিরাজমান; খুব নিবিড়ভাবে উপস্থিত দুয়ে:
