আমাদের প্রত্যেকের মাঝে প্রকাশিত ও নিরেট অস্তিত্ব দেওয়া ব্যক্তিগত নাম ছাড়া আমরা আর কোনও ঈশ্বরকে দেখতে পাই নাঃ অনিবার্যভাবে আমাদের ব্যক্তিগত প্রভু সম্পর্কে উপলব্ধি আমরা যে ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছি সেই ধর্মের ধর্মীয় ঐতিহ্য দিয়েই রঞ্জিত। কিন্তু অতিন্দ্রীয়বাদী (আরিফ) জানে যে, আমাদের এই ‘ঈশ্বর একজন ‘দেবদূত বা স্বর্গীয় কোনও বিশেষ প্রতীক মাত্র, যাকে কোনওভাবেই স্বয়ং অদৃশ্য সত্তার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা চলবে না। পরিণামে সে একই ধর্মকে বৈধ থিওফ্যানি হিসাবে দেখে। অধিকতর গোঁড়া ধর্মসমূহের ঈশ্বর যেখানে মানুষকে বিবদমান শিবিরে বিভক্ত করেন, অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বর সেখানে এক ঐক্যবদ্ধকারী শক্তি।
একথা সত্যি যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপুল সংখ্যক মুসলিমের জন্যে আল আরাবীর শিক্ষা বড্ড বেশি দুর্বোধ্য ছিল, তবু তা বহু সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সুফীবাদ আর সংখ্যালঘু আন্দোলনে সীমিত থাকেনি। মুসলিম সাম্রাজ্যের বহু স্থানেই তা প্রভাবশালী ইসলামি ধারায় পরিণত হয়েছিল। এই সময়ের বিভিন্ন সুফী পদ্ধতি বা ত্বরিকা প্রতিষ্ঠিত হয় যাদের প্রত্যেকটির অতিন্দ্রীয়বাদী বিশ্বাস সম্পর্কে নিজস্ব ব্যাখ্যা ছিল। সুফী শেখগণের সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক প্রভাব ছিল এবং প্রায়শঃই শিয়াহ্ ইমামদের মতোই সম্মান লাভ করতেন তাঁরা। রাজনৈতিক সংঘাতের কাল ছিল এটা: বাগদাদের খেলাফতের ক্ষয় চলছিল এবং মঙ্গোল দস্যুরা একের পর এক মুসলিম নগরীতে ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছিল। সাধারণ মানুষ ফায়সুফদের দূরবর্তী ঈশ্বর ও উলেমাদের আইননিষ্ঠ ঈশ্বরের চেয়ে অধিকতর নিকটবর্তী ও সহানুভূতিশীল এক ঈশ্বরের কামনা করছিল। সুফীদের পরম আবেশ সৃষ্টির জন্যে জিকির অনুশীলন মন্ত্রের মতো স্বর্গীয় নাম উচ্চারণ, ত্বরিকার সীমা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছিল। শ্বাস-প্রশ্বাস ও আসন গ্রহণের নির্দেশিত বিশেষ ভঙ্গির মনোসংযোগের সুফী অনুশীলন মানুষকে নিজের মাঝেই এক দুৰ্জ্জেয় সত্তার বোধ জাগাতে সাহায্য করেছিল। সবারই অতিন্দ্রীয় অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু এইসব আধ্যাত্মিক অনুশীলন মানুষকে ঈশ্বর সম্পর্কে সাধারণ ও মানবীয় ধারণা ত্যাগ করে নিজের মাঝে তার উপস্থিতি অনুভবে সাহায্য করেছে। কোনও কোনও পদ্ধতি মনোসংযোগ গভীর করার উদ্দেশ্যে সঙ্গীত ও নাচের ব্যবহার করত। তাদের। পিগণ সাধারণ মানুষের চোখে নায়ক হয়ে উঠেছিলেন।
সুফীদের বিভিন্ন ধরনের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল মাওলাবিওয়াহ, পশ্চিমে যাদের সদস্যরা ‘ঘূর্ণায়মান দরবেশ’ হিসাবে পরিচিত। এদের বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ নাচ মনোসংযোগের এক ধরনের কৌশল বা পদ্ধতি ছিল। ক্রমাগত ঘুরতে ঘুরতে নাচের মাঝে মিশে যাওয়ার সময় সুফী অনুভব করে, সত্তার সব সীমানা মুছে যাচ্ছে, যা তাকে ফানার বিলীন হবার আগাম স্বাদ পিত। এ পদ্ধতির প্রতিষ্ঠাতা জালাল আদ-দীন রুমি (১২০৭-৭৩) শিষ্যদের কাছে মাওলানা বা আমাদের গুরু নামে পরিচিত ছিলেন। মধ্য এশিয়ার খুরাশানে জন্মগ্রহণ করেন তিনি, কিন্তু অগ্রসরমান মঙ্গোল বাহিনী পৌঁছার আগেই আধুনিক তুরস্কের কনিয়ায় পালিয়ে যান। তাঁর অতিন্দ্রীয়বাদকে এই তাণ্ডবলীলার প্রতি মুসলিমদের সাড়া হিসাবে দেখা যেতে পারে যার পরিণতিতে বহু মুসলিম আল্লাহয় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল। রুমির ধারণার সঙ্গে তাঁর সমসাময়িক ইবন আল-আরাবীর চিন্তাধারার মিল আছে, কিন্তু তাঁর কাব্য সুফী বাইবেল বলে পরিচিত মাসনবীর জনপ্রিয়তা ঢের বেশি এবং সুফী নয় এমন। সাধারণ মানুষের কাছেও অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বরকে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছে। ১২৪৪ সালে ভ্রাম্যমাণ দরবেশ শামস আদ-দিনের প্রভাব বলয়ে আসেন রুমি, তিনি তাঁকে তাঁর প্রজন্মের পূর্ণাঙ্গ পুরুষ হিসেবে দেখেছেন। প্রকৃতপক্ষেই শামস আদ-দিন নিজেকে পয়গম্বরের পুনরাবির্ভাব বলে বিশ্বাস করতেন এবং তাঁকে মুহাম্মদ’ সম্বোধন করার প্রতি জোর দিতেন। সন্দেহজনক খ্যাতি ছিল তার। জানা যায় নিজেকে নিয়ম-কানুনের মতো তুচ্ছ বিষয়ের উর্ধ্বে ভেবে শরীয়াহ্ বা ইসলামের সর্বোচ্চ আইন পালন করতেন না। রুমির অনুসারীরা তাদের গুরুর স্পষ্ট মোহাচ্ছন্নতায় বোধগম্য কারণেই উদ্বিগ্ন ছিল। এক দাঙ্গায় শামস নিহত হলে সান্ত্বনার অতীত হয়ে পড়ে অতিন্দ্রীয়বাদী সঙ্গীত আর নাচে আরও বেশি সময় অতিবাহিত করতে থাকেন রুমি। প্রবল শোককে কাল্পনিকভাবে ঈশ্বরের জন্যে ভালোবাসার প্রতাঁকে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন তিনি-মানুষের প্রতি ঈশ্বরের আকাঙ্ক্ষা ও আল্লাহর জন্যে মানুষের কামনা । জেনে হোক বা না জেনে, প্রত্যেকেই অনুপস্থিত ঈশ্বরের সন্ধান করছে, আবছাভাবে সচেতন যে অস্তিত্বের উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে সে।
নলখাগড়ার কথা শোন, কীভাবে গল্প বলছে সে, বিচ্ছিন্নতার অনুযোগ করছে। খড়ের ক্ষেত থেকে তুলে আনার পর থেকেই আমার বিলাপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছে নারী-পুরুষ। বিচ্ছিন্নতায় ছিন্ন হয়ে যাওয়া এক সুহৃদ চাই আমি, যাতে আমি এমন একজনের কাছে প্রেম-ইচ্ছার শক্তি তুলে ধরতে পারি: আপন উৎস হতে বিচ্ছিন্ন প্রত্যেকে যখন সে সঙ্গে ছিল সেই সময়ে ফিরে যেতে চায়।
