এইসব স্বর্গীয় লোগোই-এর প্রতিটি ঈশ্বর স্বয়ং নিজেকে যে নামে সম্বোধন করেন সেই নাম, এভাবে নিজেকে নিজের প্রতি এপিফ্যানিতে সামগ্রিকভাবে উপস্থিত করেন তিনি। স্বর্গীয় সত্তা যেহেতু প্রকাশের অতীত, সেহেতু একটি মাত্র মানবীয় প্রকাশ ভঙ্গি দিয়ে তাকে তুলে ধরা যাবে না। এখানে আরও বলা হচ্ছে যে, ঈশ্বর আমাদের প্রত্যেকের মাঝে যা প্রকাশ করেছেন তা অনন্য, আরও অসংখ্য নারী ও পুরুষের জ্ঞান ঈশ্বরের চেয়ে ভিন্ন যারা তার লোগোই-ও বটে। আমরা কেবল আমাদের নিজস্ব ঈশ্বরকেই চিনতে পাবি, কেননা তাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে অনুভব করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, অন্যকারও মতো করেও তাঁকে জানা অসম্ভব। ইবন আল-আরাবী যেমন বলেছেন: “প্রত্যেক সত্তার তার বিশেষ প্রভুই ঈশ্বর হিসাবে আছেন; গোটা ঈশ্বরকে লাভ তার পক্ষে সম্ভব নয়।’ তিনি হাদিসের উদ্ধৃতি দিতে পছন্দ করতেন: “ঈশ্বরের আশীর্বাদে ধ্যান করো, কিন্তু তাঁর মূল সত্তাকে নিয়ে নয়।”৭ ঈশ্বরের সমগ্র সত্তা জ্ঞানের অতীত, আমাদের অবশ্যই আপন সত্তা উচ্চারিত বিশেষ শব্দের দিকে দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ইবন আল-আরবী ঈশ্বরকে তার অগম্যতার ওপর জোর দেওয়ার জন্যে আল-আমা অর্থাৎ ‘মেঘ’ বা ‘অন্ধত্ব’ ডাকতেও ভালোবাসতেন কিন্তু এসব মানব লোগোই গোপন ঈশ্বরকে তার নিজের সামনেও তুলে ধরে। এটা একটা দ্বিমুখী প্রক্রিয়া: ঈশ্বর জ্ঞাত হওয়ার উদ্দেশ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন এবং যাদের মাঝে তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন তাদের মাধ্যমেই নিঃসঙ্গতা হতে মুক্তি পান। অজ্ঞাত ঈশ্বরের দুঃখ প্রত্যেক মানুষের মাঝে প্রকাশিত ঈশ্বর দিয়ে প্রশমিত হয়, যারা তাঁকে নিজের কাছে তুলে ধরে; আবার এটাও সত্যি যে প্রকাশিত ঈশ্বর প্রত্যেক ব্যক্তির মাঝে অবস্থান করার সময় আমাদের নিজস্ব আকাক্ষা জাগিয়ে তোলা এক ঐশী স্মৃতি তাড়নায় আবার মুল উৎসে ফিরে যেতে চান।
এভাবে ঈশ্বর ও মানুষ স্বর্গীয় জীবনের দুটো বৈশিষ্ট্য যা গোটা বিশ্বজগৎ বা সৃষ্টিকে সজীব করেছে। এই দর্শনটি জেসাসের দেহে ঈশ্বরের অবতারের উপলব্ধির চেয়ে খুব ভিন্ন ছিল না, কিন্তু ইবন আল-আরাবী এটা মেনে নিতে পারেননি যে, একজন মাত্র ব্যক্তি, তা তিনি যত পবিত্রই হোন না কেন, ঈশ্বরের অসীম সত্তাকে প্রকাশ করতে পারেন। তার বদলে তিনি প্রত্যেক মানুষকে একেকটি অনন্য স্বর্গীয় অবতার বলে বিশ্বাস করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ‘পূর্ণাঙ্গ মানুষের’ (ইনসান ই-কামিল) একটা প্রতীক সৃষ্টি করেছেন যিনি কিনা সমসাময়িকদের উপকারের জন্যে প্রতি প্রজন্মের প্রকাশিত ঈশ্বরকে ধারণ করেন; যদিও অবশ্যই তিনি ঈশ্বরের সমগ্র সত্তা বা তার ব্যাপক সত্তাকে ধারণ করেন না। পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) ছিলেন তাঁর সময়ের পূর্ণাঙ্গ মানুষ, কার্যকর ঐশী প্রতীকও ছিলেন তিনি।
এই অন্তর্মুখী কল্পনা নির্ভর অতিন্দ্রীয়বাদ সত্তার গভীরে অস্তিত্বের ভিত্তির অনুসন্ধান ছিল। এটা অতিন্দ্রীয়বাদীকে ধর্মে গোঁড়া রূপের কিছু নিশ্চয়তা হতে বঞ্চিত করেছে। যেহেতু প্রত্যেক নারী ও পুরুষের ঈশ্বর সংক্রান্ত অনন্য অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেক্ষেত্রে বলা চলে যে কোনও একটি ধর্ম সমগ্র স্বর্গীয় রহস্যকে তুলে ধরতে পারবে না। সবার মেনে নেওয়ার মতো ঈশ্বর সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ কোনও সত্যি নেই, যেহেতু এই ঈশ্বর ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যাবলী অতিক্রম করে যান এবং তার আচরণ বা ঝোঁক সম্পর্কে পূর্বানুমান অসম্ভব। সুতরাং, অন্যের ধর্মের বিপরীতে কারও নিজ ধর্ম নিয়ে অহংকার প্রকাশ নিঃসন্দেহে অগ্রহণযোগ্য, কারণ কোনও বিশেষ একটি ধর্ম ঈশ্বরের সমগ্র সত্যকে ধারণ করে না। ইবন আল-আরাবী অন্য ধর্মের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলেছিলেন যা কোরানেও দেখা যায়, এবং একে সহনশীলতার নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন:
আমার মন সকল রূপ ধারণেই সক্ষম ।
ভিক্ষুর জন্যে মঠ, মূর্তির জন্যে মন্দির,
হরিণের জন্যে চারণভূমি, বিশ্বাসীর কাবাহ্
তোরাহর ফলক, কোরান।
আমার ধর্ম ভালোবাসা: আমি যেদিকেই ফিরি
তাঁর উট, তবু এমাত্র সত্য ধর্মটি আমার।
ঈশ্বরে বিশ্বাসী সিনাগগ, মন্দির, গির্জা ও মসজিদে সমান স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, কেননা সবগুলোই ঈশ্বরের একটা বৈধ উপলব্ধি দিয়ে থাকে। ইবন আল আরাবী প্রায়শঃ ‘বিশ্বাসের সৃষ্টি ঈশ্বর’ (খালক আল-হাক্ক ফি’ল-ইতিকাদ) বাক্যটি ব্যবহার করতেন। একটি বিশেষ ধর্মের নারী-পুরুষ কর্তৃক সৃষ্ট অবতারকে স্বয়ং ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা অসমীচিন হতে পারে, এতে কেবল অসহিষ্ণুতা আর ধর্মান্ধতা জন্ম নেবে। এই ধরনের বহুঈশ্বরবাদীতার বদলে ইবন আল-আরাবী এই পরামর্শ দিয়েছেন:
কোনও নির্দিষ্ট ধর্ম বিশ্বাসের (Creed) সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে সংযুক্ত করো না যাতে অন্যগুলোকে তুমি অবিশ্বাস কর; সেক্ষেত্রে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আসল সত্য উপলব্ধি করতেও ব্যর্থ হবে। সর্বত্র বিরাজমান, সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কোনও একটি ধর্মে সীমাবদ্ধ নন, কারণ তিনি বলেছেন, ‘তুমি যেদিকেই তাকাবে, সেখানে আল্লাহ মুখায়ব।’ (কোরান ২: ১০৯)। সবাই যার যার বিশ্বাসের স্তুতি গায়; তার ঈশ্বর তার নিজস্ব সৃষ্টি, প্রশংসা করতে গিয়ে সে আত্মপ্রশংসা করে। পরিণতিতে অন্যদের বিশ্বাসকে দোষারোপ করে, ন্যায় আচরণ করলে এমনটি সে করতে পারত না, কিন্তু তাঁর অপছন্দের মূলে রয়েছে অজ্ঞতা।৫০
