গোটা কবিতায় দান্তে ইন্দ্রিয়গত ও দৃশ্যমান ইমেজোরি ক্রমশঃ একীভূত করেছেন। নরকের বিস্তারিত বাস্তব বিবরণ পারগোটরি পাহাড়ে আবেগগত আরোহণের কষ্টকর পর্বের পর পার্থিব স্বর্গে পৌঁছার পথ খুলে দেয় যেখানে বিয়েত্রিস তাঁকে শারীরিকভাবে শেষ হওয়া সত্তা হিসেবে দেখার জন্যে ভর্ৎসনা করে: বরং তাকে প্রতীক বা অবতার হিসাবে দেখা উচিত ছিল তার, যা তাঁকে জগৎ থেকে ঈশ্বরের দিকে চালিত করেছে। স্বর্গের বাস্তব বর্ণনা নেই বললেই চলে; এমনকি আশীর্বাদপ্রাপ্ত আত্মাসমূহও দূরবর্তী-আমাদের মনে করিয়ে দেয় কোনও মানুষই তার আকাক্ষার পরম বস্তুতে পরিণত হতে পারে না। সবশেষে, শীতল বুদ্ধিবৃত্তি ইমেজারি সকল কল্পনার অতীত ঈশ্বরের চরম দুয়েতা প্রকাশ করে। দান্তের বিরুদ্ধে প্যারাদিসো-তে ঈশ্বরের ঠাণ্ডা প্রতিকৃতি অংকনের অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু বিমূর্ত দিকটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শেষ পর্যন্ত তাঁর সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।
ইবন আল-আরাবীও বিশ্বাস করতেন যে, কল্পনা ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা। কোনও অতিন্দ্রীয়বাদী নিজস্ব এপিফ্যানি সৃষ্টি করার সময় আসলে সে আদি আদর্শ জগতে আরও নিখুঁতভাবে অবস্থানকারী একটা সত্তাকে পুণর্জন্ম দেয়। আমরা অন্য মানুষের মাঝে ঐশী সত্তাকে দেখার সময় আসলে প্রকৃত সত্তাকে উন্মোচন করার কল্পনা নির্ভর প্রয়াসে লিপ্ত হই: ‘ঈশ্বর আবরণের মতো প্রাণীসমূহকে সৃষ্টি করেছেন, ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি, যে ওগুলোকে সেভাবে চেনে সে আবার তার দিকে ধাবিত হয় আর সে ওগুলোকে বাস্তব হিসাবে ধরে নেয় সে তার সত্তা থেকে বঞ্চিত হয়। এভাবে-সুফীবাদের পথ হিসাবে বিবেচিত-যা মানুষের ওপর নিবেদিত সম্পূর্ণ ব্যক্তিরূপী আধ্যাত্মিকতা হিসাবে সূচিত হয়েছিল সেটাই ইবন আল-আরাবীকে ঈশ্বরের ব্যক্তির অতীত ধারণার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। নারীর প্রতিকৃতি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল । তিনি বিশ্বাস করতেন যে, নারীই স্বর্গীয় প্রজ্ঞা সোফিয়ার সবচেয়ে কার্যকর অবতার, কারণ তারা পুরুষদের মনে এমন এক ভালোবাসার অনুপ্রেরণা যোগায় যা শেষ পর্যন্ত তাদেরকে ঈশ্বরের দিকে চালিত করে। অনস্বীকার্য যে এটা একেবারে পুরুষবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, কিন্তু ঈশ্বরের ধর্মে একটা নারী-মাত্রা আনার প্রয়াসও ছিল এটা, যে ঈশ্বরকে প্রায়শঃই পরিপূর্ণভাবে পুরুষ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।
ইবন আল-আরাবী বিশ্বাস করতেন না যে তার জানা ঈশ্বরের বস্তুগত অস্তিত্ব আছে। যদিও দক্ষ মেটাফিজিশিয়ান ছিলেন, কিন্তু ঈশ্বরের অস্তিত্ব যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যায় বলে বিশ্বাস করেননি। নিজেকে খিজর-এর শিষ্য দাবি করতেন তিনি, এ নামটি কোরানে বাহ্যিক আইন পৌঁছে দেওয়া মোজেসের আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে আবির্ভূত এক রহস্যময় চরিত্রকে দেওয়া হয়েছে, ঈশ্বর খিজরকে তাঁর সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান দিয়েছিলেন, সে জন্যে মোজেস তাঁর কাছে নির্দেশনা প্রার্থনা করছেন, কিন্তু খিজর তাঁকে বলেছেন যে, তাঁর পক্ষে এটা সহ্য করা সম্ভব হবে না, কারণ এটা তাঁর নিজস্ব ধর্মীয় অভিজ্ঞতার বাইরে অবস্থান করছে। যে ধর্মীয় তথ্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমাদের নেই সেটা বোঝার চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই। খিজর নামটি ‘সবুজ জন’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, যেন তার জ্ঞানের চিরনতুন ও চিরন্তনভাবে নবায়নযোগ্যতার ইঙ্গিতবহ। এমনকি মোজেসের মতো বড় মাপের একজন পয়গম্বরও যে ধর্মের কিছু কিছু নিগূঢ় বিষয়াদি উপলব্ধি করতে পারবেন তা নয়, কারণ কোরানে প্রকৃতই খিজরের কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে উঠতে পারছেন না বলে আবিষ্কার করেছেন তিনি। এই অদ্ভুত পর্বটি যেন বোঝাতে চায়, ধর্মের বাহ্যিক সৌন্দর্য বা বিষয়াদি যে সবসময়ই এর আধ্যাত্মিক বা অতিন্দ্রীয় উপাদানের সঙ্গে মিলে যাবে এমন নয়। উলেমাদের মতো মানুষেরা হয়তো ইবন আল-আরাবীর মতো সুফীর ইসলামকে নাও বুঝতে পারেন। মুসলিম ঐতিহ্য খিজরকে অতিন্দ্রীয় সত্য-সন্ধানীদের গুরুতে পরিণত করেছে, যা উৎপত্তিগতভাবেই আক্ষরিক, বাহ্যিক রূপের চেয়ে একেবারে আলাদা ও উন্নত। ঈশ্বর সম্পর্কে আর দশ জন সাধারণ মানুষের যেমন ধারণা তিনি আপন অনুসারীদের ঈশ্বর সম্পর্কে সে রকম ধারণা গড়ে তোলায় উৎসাহিত করেননি, বরং এমন এক ঈশ্বরের কথা বুঝিয়েছেন যিনি গভীরভাবে আধ্যাত্মিক ।
ইসমায়েলিদের কাছেও খিজর গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন । ইবন আল-আরাবী সুফী হলেও তাঁর শিক্ষা ইসমায়েলিদের মতবাদের অনেক ঘনিষ্ঠ ছিল শেষ পর্যন্ত যা তাদের ধর্মতত্ত্বে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অতিন্দ্রীয়বাদী ধর্ম যে গোষ্ঠীগত বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে, এটা তার আরেকটা উদাহরণ । ইসমায়েলিদের মতো ইবন আল-আরাবী দার্শনিকদের ঈশ্বরের আপাথিয়ার ঘোরতর বিপরীত ঈশ্বরের করুণরসের ওপর জোর দিয়েছেন। অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বর তাঁর সৃষ্ট জীবকূলের মাধ্যমে পরিচিত হবার আকাঙ্ক্ষা করেন। ইসমায়েলিরা বিশ্বাস করত যে, বিশেষ্য পদ ইলাহ-প্রভু-এসেছে আরবী WLH মূল হতে: বিষণ্ণ হওয়া, দুঃখ করা। পবিত্র হাদিসে ঈশ্বরকে দিয়ে বলানো হয়েছে: ‘আমি গুপ্তধন ছিলাম এবং আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা করেছি। তারপর প্রাণীকূল সৃষ্টি করেছি ওদের মাধ্যমে পরিচিত হব বলে। ঈশ্বরের বিষণ্ণতার যৌক্তিক কোনও প্রমাণ নেই; আমরা কেবল আমাদের গভীরতম প্রত্যাশা পূরণের জন্যে একটা কিছুর প্রতি প্রত্যাশা ও জীবনের যন্ত্রণার ও করুণ দিক ব্যাখ্যা করার ইচ্ছার মাঝে তা বুঝতে পারি। আমাদের যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিরূপে সৃষ্টি করা হয়েছে, আমরা নিশ্চয়ই সর্বোত্তম আদর্শ ঈশ্বরকেই প্রতিবিম্বিত করি। সুতরাং ঈশ্বর’ বলে যে সত্তাকে পাওয়ার জন্যে আমরা আকাক্ষা করি সে আকাঙ্ক্ষা ঈশ্বরের বিষণ্ণতারই প্রতিনিধিত্ব করে। ইবন আল-আরাবী একক ঈশ্বর আকাঙ্ক্ষায় দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন বলে কল্পনা করছেন, কিন্তু এই দীর্ঘশ্বাস (নাফাস রাহমানি) আত্ম-করুণার বিচলিত প্রকাশ নয়। এর একটা সক্রিয়, সৃজনশীল শক্তি ছিল যা আমাদের গোটা মহাবিশ্বকে অস্তিত্ব দিয়েছে, এর ফলে মানুষও এসেছে, যারা পরিণত হয়েছে লোগোইতে, যে ভাষায় ঈশ্বর নিজের প্রকাশ করেন। এইভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিটি মানুষই লুকায়িত ঈশ্বরের অনন্য এপিফ্যানি, এক বিশেষ ও পুনরাবৃত্তির অতীত উপায়ে তাঁকে প্রকাশ করছে ।
