সুহরাওয়ার্দির চেয়ে আরও বেশি প্রভাবশালী ছিলেন মুঈদ আদ-দীন ইবন। আরাবী (১১৬৫-১২৪০), যার জীবনকে আমরা সম্ভবত প্রাচ্য ও প্রতিচ্যের ভিন্ন। পথে যাত্রার প্রতীক হিসাবে দেখতে পারি। তাঁর পিতা ছিলেন ইবন রুশদের বন্ধু। একবার দুজনের সাক্ষাৎকালে তরুণের ধর্মানুরাগ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন রুশদ। অবশ্য এক কঠিন অসুখের সময় ইবন আল-আরাবী সুফীবাদের দীক্ষা নেন ও ত্রিশ বছর বয়সে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে ইউরোপ ত্যাগ করেছিলেন। তিনি হজব্রত পালন করে কাবাহয় প্রার্থনা ও ধ্যানে দুটি বছর পার করে দেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইউফ্রেতিসের তীরে মালাতিয়ায় থিতু হন। প্রায়শঃ শেখ আল আকবাহ-মহা গুরু’-নামে আখ্যায়িত আল-আরাবী ঈশ্বর সম্পর্কে মুসলিমদের ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। কিন্তু তার চিন্তাধারা পাশ্চাত্যকে প্রভাবিত করেনি। ইবন রুশদের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম দর্শন শেষ হয়ে গেছে বলে ধারণা ছিল। পাশ্চাত্যের ক্রিশ্চান জগৎ ইবন রুশদের অ্যারিস্টটলিয় ঈশ্বরকে কাছে টেনে নেবে এবং অন্যদিকে ইসলামি রাজ্যের অধিকাংশই অতি সাপ্রতিকাল পর্যন্ত অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বরের পক্ষে মত দিয়ে এসেছে।
১২০১ সালে কাবাহ্ গৃহ প্রদক্ষিণের সময় ইবন আল-আরাবী এক দিব্যদর্শন লাভ করেন যা তাঁর জীবনে সুদূরপ্রসারী ও গভীর প্রভাব রেখে গিয়েছে: স্বর্গীয় আভায় পরিবেষ্টিত নিযাম নামের এক কিশোরীকে দেখতে পান তিনি এবং উপলব্ধি করেন যে, মেয়েটি স্বর্গীয় প্রজ্ঞা সোফিয়ার অবতার। এই এপিফ্যানি তাঁকে উপলব্ধি করতে শেখায় যে, কেবল দর্শনের যৌক্তিক আলোচনায় নির্ভর করে থাকলে আমাদের পক্ষে ঈশ্বরকে ভালোবাসা সম্ভব হবে না। ফালসাফাহ আল্লাহর চরম অবোধ্যতার ওপর জোর দিয়েছে ও আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, কোনও কিছুর পক্ষেই তাঁর সমরূপ হওয়া সম্ভব নয়। এমন দূরবর্তী এক সত্তাকে কী করে ভালোবাসতে পারি আমরা? কিন্তু তারপরেও তাঁর সৃষ্ট প্রাণীতে দেখা ঈশ্বরকে আমরা ভালোবাসতে পারি: ‘যদি সৌন্দর্যের জন্যে তুমি কোনও সত্তাকে ভালোবাস, তাহলে সেটা ঈশ্বরকেই ভালোবাসা, কেননা তিনিই ‘সুন্দরতম সত্তা,-ফুতুহাত আল-মাক্কিয়াহ্-এ ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। এভাবে সবদিক থেকেই একমাত্র ঈশ্বরই ভালোবাসার লক্ষ্য। শাহাদাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনও প্রভু বা কোনও পরম সত্তা নেই। পরিণামে তাঁকে বাদ দিয়ে কোনও সৌন্দর্যও নেই। স্বয়ং ঈশ্বরকে আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু নিয়ামের মতো বেছে নেওয়া সৃষ্ট প্রাণীতে নিজেকে যেভাবে তিনি প্রকাশ করেন সেটা দেখতে পাই, আমাদের হৃদয়ে যা ভালোবাসা সৃষ্টি করে। প্রকৃতপক্ষেই নিযামের মতো একটি মেয়েকে প্রকৃত অবয়বে দেখার জন্যে অতিন্দ্রীয়বাদীদের নিজস্ব এপিফ্যানি সৃষ্টি করার দায়িত্ব রয়েছে। ভালোবাসা আবশ্যিকভাবে অনুপস্থিত কোনও কিছুর জন্য আকাঙ্ক্ষা, এ কারণেই মানুষের ভালোবাসার অনেকাংশই হতাশাব্যাঞ্জক হয়ে থাকে। নিযাম ‘আমার অনুসন্ধান ও আমার আশার বস্তু সবচেয়ে সাধ্বি কুমারীতে পরিণত হয়েছিল। প্রেমের কবিতার সংকলন দ্য দিওয়ান-এর ভূমিকার তিনি যা ব্যাখ্যা করেছেন:
বর্তমান গ্রন্থের জন্য রচিত আমার পঙক্তিসমূহে মুহূর্তের জন্যও আমি স্বর্গীয় অনুপ্রেরণা, আধ্যাত্মিক আবির্ভাব, দেবদূতদের বুদ্ধিমত্তার জগতের সঙ্গে আমাদের জগতের যোগাযোগের আকাঙ্ক্ষা হতে বিরত থাকিনি। এখানে প্রতাঁকের ভিত্তিতে আমার স্বভাবজাত চিন্তা করেছি, কারণ বাস্তব জীবনের বিষয়াদির চেয়ে অদৃশ্য জগতের বস্তুসমূহই আমাকে বেশি টানে; কারণ এই কিশোরীটি ঠিক জানে আমি কিসের কথা বোঝাচ্ছি।
সৃজনশীল কল্পনা নিযামকে ঈশ্বরের অবতারে পরিণত করেছিল।
মোটামুটি আশি বছর পর তরুণ দান্তে আলিগিরি ফ্রান্সে বিয়েত্রিস পাতিনারিকে দেখার পর একই রকম অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। মেয়েটিকে দেখামাত্রই আত্মার প্রবল কম্পন অনুভব করেন তিনি এবং যেন তার চিৎকার শুনতে পান: আমার চেয়ে শক্তিশালী এক দেবতাকে দেখ যে আমাকে জয় করতে আসছে। সেই মুহূর্ত হতে দান্তে বিয়েত্রিসের জন্যে তাঁর ভালোবাসায় নিয়ন্ত্রিত হতে থাকেন, যা আমার কল্পনার দেওয়া ক্ষমতার সুবাদে প্রবল হয়ে উঠেছিল। দান্তের বেলায় বিয়েত্রিস স্বর্গীয় ভালোবাসার প্রতিরূপ রয়ে গিয়েছিলেন এবং দ্য ডিভাইন কমেডিতে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে নরক ও স্বর্গের ভেতর দিয়ে কাল্পনিক যাত্রার পর এটা তাকে ঈশ্বরের দর্শন করিয়ে দিয়েছিল। দান্তের কবিতার পেছনে মুহাম্মদের (স) স্বর্গারোহণের মুসলিম বিবরণের অনুপ্রেরণা ছিল; নিঃসন্দেহে সৃজনশীল কল্পনার ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি ইবন আল-আরাবীর মতো। অ্যারিস্টটল যেমন বলেছিলেন, ইমাজিনেতিভা স্রেফ জাগতিক বিশ্ব থেকে নেওয়া ইমেজের সংমিশ্রণ নয়, বলে যুক্তি দেখিয়েছেন দান্তে, বরং এটা ঈশ্বর হতে আগত অনুপ্রেরণারই অংশ:
ও ফ্যান্টাসি (ইমাজিনেতিভা), দ্যাট রীভ’স্ট আস অফট অ্যাওয়ে
সো ফ্রেম আওয়ারসেলভস্ দ্যাট উই রিমেইন ডিস্ট্রট,
ডেফ দো আ থাউজ্যান্ড ট্রামপেটস রাউন্ড আস ব্রে.
হোয়াট মুভস দী হোয়েন দ্য সেনসেস শোউ দী নট?
লাইট মুভস দী, ফর্মড ইন হেভন, বাই উইল মেবী
অভ হিম হু সেন্ডস ইট ডাউন, অর এলস সেলফ-রট।
