সজাগ বা আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়া পয়গম্বরত্ব লাভের কষ্টকর প্রবল অনুপ্রেরণা হতে একেবারেই আলাদা। এর সঙ্গে বুদ্ধের শান্ত আলোকনের বরং অনেক বেশি মিল ছিল: অতিন্দ্রীয়বাদ ঈশ্বরের ধর্মে অপেক্ষাকৃত শান্ত আধ্যাত্মিকতার সূচনা করছিল। বাহ্যিক কোনও সত্তার সঙ্গে সংঘাতের বদলে স্বয়ং অতিন্দ্রীয়বাদীর অন্তর হতে আলোকপ্রাপ্তি ঘটবে। এখানে সত্য অবহিত করার কোনও ব্যাপার ছিল না। তার বদলে মানবীয় কল্পনার অনুশীলন মানুষকে আলাম আল-মিথাল-খাঁটি প্রতিরূপের জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ঈশ্বরে প্রত্যাবর্তনে সক্ষম করে তুলবে।
সুহরাওয়ার্দি ইরানের প্রাচীন স্বর্গীয় আদি আদর্শ জগতের বিশ্বাসে ফিরে গিয়েছেন, যেখানে গেতিক (জাগতিক, বস্তুগত পৃথিবী)-এর প্রত্যেক ব্যক্তি ও বস্তুর আবার মেনকে (স্বর্গীয় রাজ্য) অবিকল মূর্তি রয়েছে। অতিন্দ্রীয়বাদ ঈশ্বর-ধর্মসমূহ কর্তৃক পবিত্যক্ত প্রাচীন মিথলজিকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছিল। সুহরাওয়ার্দি প্রকল্পে আলাম আল-মিথাল-এ পরিণত মেনক এখন আমাদের জগৎ ও ঈশ্বরেব মাঝে অবস্থিত মধ্যবর্তী এক জগৎ। যুক্তি বা ইন্দ্রিয় বোধ দিয়ে একে বোঝা যাবে না। সৃজনশীল কল্পনার গুণই আমাদেরকে গুপ্ত আদর্শজগৎ আবিষ্কারে সক্ষম করে তুলেছে, ঠিক কোরানের প্রতীকী ব্যাখ্যা যেভাবে এর প্রকৃত আধ্যাত্মিক অর্থ প্রকাশ করেছে। আলাম আল-মিথাল ইসলামের আধ্যাত্মিক ইতিহাস সম্পর্কে ইসমায়েলিদের ধারণা কিংবা ইবন সিনার দেবদূতবিদ্যার কাছকাছি, আগের অধ্যায়ে আমরা এনিয়ে আলোচনা করেছিঃ যা জাগতিক ঘটনাবলীর প্রকৃত অর্থ বহন করে । ইসলামের পরবর্তীকালে অতিন্দ্রীয়বাদীদের জন্যে তাদের অভিজ্ঞতা ও দিব্যদর্শনের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে এটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সুহরাওয়ার্দি এমন সব দিব্যদর্শন নিয়ে পৰীক্ষা করছিলেন যা অসংখ্য এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির শামান, অতিন্দ্রীয়বাদী বা দরবেশ যেই প্রত্যক্ষ করে থাকুক না কেন বিস্ময়করভাবে একরকম। সাম্প্রতিককালে এ বিষয়টিকে ঘিরে বেশ উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। জাং-এর সম্মিলিত চেতনাহীনতার ধারণাটি মানুষের এই সাধারণ কল্পনা নির্ভর অভিজ্ঞতাকে যাচাই করার সবচেয়ে বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রয়াস। রোমানীয়-আমেরিকান ধর্মীয় দার্শনিক মির্চা এলিয়াদের মতো অন্য পণ্ডিতগণ দেখানোর প্রয়াস পেয়েছেন কীভাবে প্রাচ্যীয় কবিদের মহাকাব্য এবং বিশেষ ধরণের কিছু রূপকথা ভাববাদী অভিযাত্রা ও অতিন্দ্রীয়বাদী যাত্রা হতে নেওয়া হয়েছে।[৩৮]
সুহরাওয়ার্দি জোর দিয়ে বলেছেন যে, অতিন্দ্রীয়বাদীদের দিব্যদর্শন ও ঐশীগ্রন্থের প্রতীকসমূহ-যেমন, স্বর্গ, নরক ও শেষ বিচার-আমাদের এই পৃথিবীর অভিজ্ঞতার মতোই বাস্তব, তবে একই রকম নয়। এগুলো প্রথাগতভাবে প্রমাণ করা যাবে না, কিন্তু কল্পনার ক্ষমতা দিয়ে বোঝা যাবে, দিব্যদ্রষ্টাকে যা জাগতিক ঘটনাবলীর আধ্যাত্মিক মাত্রা দেখায় সক্ষম করে তোলে। যাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই তারা এই অভিজ্ঞতা বোধ করতে পারে না, ঠিক যেমন প্রয়োজনীয় নৈতিক ও মানসিক অনুশীলনে অভ্যস্ত হওয়ার পরেই কেবল বৌদ্ধদের আলোকন লাভ সম্ভব। আমাদের সকল চিন্তা, ধ্যান ধারণা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও দর্শন আলম-আল মিথালের বাস্তবতার অনুরূপ । উদাহরণস্বরূপ, পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) রাত্রি দর্শনের সময় এই মধ্যবর্তী জগৎ সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠেছিলেন, যা তাকে ঐশী জগতের দোরগোড়ায় নিয়ে গেছে। সুহরাওয়ার্দি হয়তো এও দাবি করতেন যে, ইহুদিদের থ্রোন মিস্টিকদের দিব্যদর্শনও তাদের মনোসংযোগের আত্মিক অনুশীলনের সময় আলম-আল মিথালে প্রবেশ করতে শেখার পরেই ঘটেছিল। সুতরাং ফায়লাসুফরা যেমন ভেবেছিল, ঈশ্বরের পথ কেবল যুক্তির মাঝেই নিহিত ছিল না, বরং সৃজনশীল কল্পনার মাধ্যমে অতিন্দ্রীয়বাদীর জগৎও সেই পথ বটে।
আজকের দিনে নেতৃস্থানীয় কোনও ধর্মতাত্ত্বিক যদি বলেন যে, গভীর অর্থে ঈশ্বর কল্পনারই সৃষ্টি, তাহলে পশ্চিমের বহু লোকই শঙ্কিত হয়ে পড়বে। কিন্তু এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত যে, কল্পনা হচ্ছে প্রধান ধর্মীয় গুণ। জা-পল সাত্র একে ‘যা নেই তা চিন্তা করার ক্ষমতা আখ্যায়িত করেছেন। মানুষই একমাত্র প্রাণী যে অনুপস্থিত কোনও কিছু বা এই মুহূর্তে যার অস্তিত্ব নেই অথচ সম্ভব হতে পারে এমন কিছু কল্পনা করার ক্ষমতা রাখে। এভাবে শিল্পকলা ও ধর্মের মতো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও আমাদের প্রধান প্রধান সাফল্যের পেছনে আমাদের কল্পনাশক্তি কারণ হিসাবে কাজ করেছে। ঈশ্বরের ধারণা, একে যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হোক, সম্ভবত অনুপস্থিত সত্তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ, যার সহজাত সমস্যাদি সত্ত্বেও হাজার হাজার বছর ধরে নারী ও পুরুষকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। অনুভূতি ও যুক্তি-নির্ভর প্রমাণের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে অবস্থানকারী ঈশ্বরকে বোঝার একমাত্র উপায়। হচ্ছে প্রতীক। একে ব্যাখ্যা করা কল্পনাপ্রবণ মনের প্রধান কাজ। সুহরাওয়ার্দি মানব জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারকারী প্রতীকসমূহের কল্পনা নির্ভর ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছিলেন, যদিও সেগুলো যে বাস্তবতার কথা বলে সেগুলো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায়। প্রতীককে আমাদের অনুভূতি দিয়ে বোধগম্য বা মন দিয়ে ধারণযোগ্য এমন এক বস্তু বা ধারণা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় যার মাঝে ঐ বস্তুটির চেয়ে অতিরিক্ত কিছু আমরা প্রত্যক্ষ করি। কেবল যুক্তি আমাদেরকে কোনও বিশেষ পার্থিব বস্তুতে বিশ্বজনীন বা বিশেষভাবে চিরন্তনকে অনুধাবনে সক্ষম করে তুলতে পারবে না। এটা সৃজনশীল কল্পনার কাজ যাতে শিল্পীদের মতো অতিন্দ্রীয়বাদীরা তাদের অন্তদৃষ্টি স্থাপন করে। শিল্পকর্মের মতো সবচেয়ে কার্যকর ধর্মীয় প্রতীকসমূহ বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান ও মানুষের অবস্থা উপলব্ধি দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে । অসাধারণরকম চমৎকার আরবী ভাষায় রচনাকারী সুহরাওয়ার্দি যুগপৎ একজন অতি দক্ষ মেটাফিজিশিয়ান ও অতিন্দ্রীয়বাদী ও সৃজনশীল শিল্পী ছিলেন। দৃশ্যতঃ সম্পর্কহীন বিষয়াদিকে মিলিয়ে-অতিন্দ্রীয়বাদের সঙ্গে বিজ্ঞান, একেশ্বরবাদী ধর্মের সঙ্গে পৌত্তলিক দর্শন-তিনি মুসলিমদের নিজস্ব প্রতীক সৃষ্টিতে এবং জীবনের নতুন অর্থ ও তাৎপর্য খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পেরেছিলেন।
