সুহরাওয়ার্দিকে প্রায়শঃই শেখ আল-ইশরাক বা আলোকনের গুরু আখ্যায়িত করা হয়। গ্রিকদের মতো আলো রূপে ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তিনি। আরবী ভাষায় ইশরাক বলতে পুব আকাশে দেখা দেওয়া ভোরের প্রথম আলো ও আলোকন বোঝায়। সুতরাং প্রাচ্য ভৌগলিক কোনও স্থান নয়, বরং আলো ও শক্তির উৎস। সুতরাং সুহরাওয়ার্দির প্রাচ্য ধর্ম বিশ্বাসে মানুষ অস্পষ্টভাবে আপন উৎসকে স্মরণ করতে পারে, এই ছায়াচ্ছন্ন জগতে অস্বস্তিবোধ করে সে এবং আদি-আশ্রয়ে ফিরে যাবার আকাঙ্ক্ষায় থাকে। সুহরাওয়ার্দি দাবি করেছেন যে, তার দর্শন মুসলিমদের কল্পনার সাহায্যে চিরন্তন প্রজ্ঞাকে পরিশুদ্ধ করার জন্যে সত্য অবস্থান খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।
সুহরাওয়ার্দির অসম্ভব জটিল দর্শন বা পদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল গোটা বিশ্বের সকল ধর্মীয় দর্শনকে একটি মাত্র আধ্যাত্মিক ধর্মে সংযুক্ত করা। যেখানে পাওয়া যায় সেখানেই সত্যের সন্ধান করতে হবে। পরিণামে তাঁর দর্শন ইসলাম-পূর্ব ইরানি সৃষ্টিতত্ত্বকে টলেমিয় প্ল্যানেটারি সিস্টেম ও উৎসারণের নিওপ্লেটোনিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। তা সত্ত্বেও অন্য কোনও ফায়লাসুফ এত ব্যাপকভাবে কোরান হতে উদ্ধৃতি দান করেনি। সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনার সময় সুহরাওয়ার্দি প্রাথমিকভাবে বিশ্বজগতের বস্তুগত উৎস সম্পর্কে আগ্রহ দেখাননি। তাঁর অসাধারণ রচনা দ্য উইজডম অভ ইল্লিউমিনেশন-এ সুহরাওয়ার্দি পদার্থবিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন, কিন্তু সেটা ছিল কেবল তাঁর রচনার অতিন্দ্রীয়বাদী অংশের ভূমিকা মাত্র। ইবন সিনার মতো তিনিও ফালসাফাহ্র সম্পূর্ণ যৌক্তিক এবং বস্তুনিষ্ঠতায় অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন, যদিও সামগ্রিক সত্তার অনুধাবনে যৌক্তিক ও মেটাফিজিক্যাল আঁচ-অনুমানের স্থান আছে বলে মনে করতেন তিনি। তাঁর মতে একজন প্রকৃত সাধু দর্শন ও অতিন্দ্রীয়বাদ উভয় ক্ষেত্রেই সফল। পৃথিবীতে এমন একজন সাধু সবসময়ই থাকেন। শিয়াদের ইমামবাদের খুব কাছাকাছি এক তত্ত্বে সুহরাওয়ার্দি তাঁর বিশ্বাস তুলে ধরেছেন যে, এই আধ্যাত্মিক নেতাই প্রকৃত খুঁটি যার উপস্থিতি ছাড়া এই পৃথিবী টিকে থাকতে পারত না, যদি তিনি আড়ালেও থাকেন। সুহরাওয়ার্দির ইশরাকি অতিন্দ্রীয়বাদের চর্চা এখনও ইরানে চালু আছে। বিশেষ ধরনের বলেই নিগূঢ় ব্যবস্থা নয় এটি বরং এতে ইসমায়েলি ও সুফীদের মতো বিশেষ আধ্যাত্মিক ও কল্পনানির্ভর প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়।
গ্রিকরা হয়তো সুহরাওয়ার্দির পদ্ধতিকে কোরিগম্যাটিক না বলে ডগম্যাটিক আখ্যায়িত করত। তিনি সকল ধর্ম ও দর্শনের মূলে লুকায়িত কল্পনানির্ভর মূল বিষয়টি আবিষ্কারের প্রয়াস পেয়েছিলেন। যদিও যুক্তিকে যথেষ্ট মনে করেননি, তবুও গভীরতম রহস্যসমূহ নিয়ে অনুসন্ধানের অধিকার অস্বীকার যাননি কখনও। নিগূঢ় অতিন্দ্রীয়বাদের মতো বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদেও সত্যের সন্ধান করতে হবে। সমালোচনামূলক বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে অনুভূতিকে জ্ঞাত ও অনুপ্রাণিত করে তুলতে হবে।
নাম হতে যেমন বোঝায়, ইশরাকি দর্শন মূল বিষয় আলোর প্রতীক যাকে ঈশ্বরের নিখুঁত সমার্থক হিসাবে দেখা হয়েছে। এটা (অন্তত দ্বাদশ শতাব্দীতে) অবস্তুগত ও সংজ্ঞাতীত ছিল, কিন্তু তারপরও জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যও ছিল: সম্পূর্ণভাবে স্বপ্রকাশিত; এর সংজ্ঞা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন ছিল না; কিন্তু জীবন ধারণ সম্ভব করে তোলা উপাদান হিসাবে সবার উপলব্ধিতে ছিল। এটা ছিল সর্বব্যাপী: বস্তুর সমস্ত ঔজ্জ্বল্য সরাসরি তাদের বহিস্ত এক উৎস। আলোর কাছ থেকে পাওয়া। সুহরাওয়ার্দি উৎসারণবাদী সৃষ্টিতত্ত্বে আলো সমূহের আলো ফায়লাসুফদের প্রয়োজনীয় সত্তার সমার্থক, যা অবিমিশ্র সরল । এটা নিম্নমুখী ধারাক্রম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমিকভাবে নিম্নতর আলো তৈরি করে; প্রতিটি আলো আলোসমূহের আলোর ওপর নিজের নির্ভরশীলতা উপলব্ধি করে। একটা ছায়া-সত্তা গঠন করে যা টলেমিয় বলয়সমূহের অনুরূপ বস্তুজগতের উৎস। এটা ছিল মানুষের দুর্দশার এক উপমা। আমাদের সবার মাঝেই এরকম আলো-আঁধারের সমাবেশ রয়েছে। পবিত্র আত্মার মাধ্যমে (ইবন সিনার প্রকল্পে আমাদের জগতের আলো জিব্রাইল ফেরেশতা বলেও পরিচিত) জ্বণে । আলো বা আত্মা প্রবিষ্ট করানো হয় । আত্মার আলোর সর্বোচ্চ জগতের সঙ্গে মিলিত হবার আকাঙ্ক্ষায় থাকে। নির্দিষ্ট সময়ে কুতব (সাধু) বা তাঁর কোনও শিষ্যের হাতে সঠিকভাবে নির্দেশনা লাভ করলে ইহজগতেই তার পক্ষে এর একটা আভাস লাভ সম্ভব।
সুহরাওয়ার্দি হিকমাত-এ তাঁর আপন আলোকনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন তিনি, কিন্তু কোনও সুরাহা খুঁজে পাচ্ছিলেন নাঃ গ্রন্থগত বিদ্যা হতে কিছুই জানতে পারেননি। তখন সহসা ইমাম, বা কুতব, আত্মার আরোগ্যকারীর দর্শন লাভ করেন।
সহসা কোমলতায় আবৃত হলাম আমি; চোখ ধাঁধানো ঝলক দেখলাম, তারপর মানুষের মতো স্বচ্ছ আলো চোখে পড়ল। মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম আমি, এবং ওই যে তিনি…আমার কাছে এগিয়ে এলেন তিনি, এত কোমলভাবে স্বাগত জানালেন যে আমার বিস্ময়ানুভূতি মুছে গেল, আমার ভয় পরিচয়ে রূপ নিল। তারপর আমি জ্ঞানের ব্যাপারে, সমস্যার ব্যাপারে তাঁর কাছে অভিযোগ তুললাম ।
‘নিজেকে জাগিয়ে তোল, আমাকে বললেন তিনি, ‘তোমার সমস্যা মিটে যাবে।’[৩৭]
