অতিন্দ্রীয়বাদের বিপদ সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন ছিলেন আল জুনায়েদ। পিরের পরামর্শ লাভ করেনি ও কঠিন সুফী প্রশিক্ষণবিহীন ব্যক্তিদের পক্ষে অতিন্দ্রীয়বাদী পরমানন্দের অনুভূতিকে ভুল বোঝা খুবই সহজ হয়ে দাঁড়াতে পারে; নিজেকে তখন ঈশ্বরের সঙ্গে বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে হয়তো খুব সরল অর্থ করে বসবে সে। আল-বিস্তামির মতো ব্যক্তিদের অসংজত দাবি নিঃসন্দেহে শাসকযন্ত্রের বিরক্তি সৃষ্টি করেছিল। একেবারে গোড়ার দিকে সুফীবাদ একটি সংখ্যালঘু আন্দোলনে সীমিত ছিল। উলেমাগণ প্রায়ই একে অসত্য আবিষ্কার হিসাবে বিবেচনা করেছেন। জুনায়েদের বিখ্যাত শিষ্য হুসেইন ইবন মনসুর (সাধারণভাবে ইনি আল-হাল্লাজ বা উল-কার্ডার নামে পরিচিত) অবশ্য সকল সাবধানতা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছিলেন; পরিণত হয়েছিলেন অতিন্দ্রীয়বাদী বিশ্বাসের শহীদ। খেলাফতের উৎখাত ও এক নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে গোটা ইরাক ঘুরে বেড়াতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের হাতে প্রথমে বন্দি এবং পরে তাঁর আদর্শ জেসাসের মতো ক্রুশবিদ্ধ হয়ে জীবন দিয়েছিলেন তিনি। পরমানন্দের মুহূর্তে আল-হাল্লাজ চিৎকার করে বলে উঠছিলেন: “আমিই সত্য।’ গস্পেলসমূহের বিবরণ অনুযায়ী জেসাসও নিজেকেই পথ, সত্য ও জীবন বলে আখ্যা দিয়ে একই দাবি করেছিলেন । ক্রাইস্টের দেহে ঈশ্বরের অবতারের খৃস্টিয় বিশ্বাসকে কোরান বারবার ব্লাসফেমাস বলে নিন্দা জানিয়েছে, সুতরাং আল-হাল্লাজের আনন্দ-চিৎকারে মুসলিমদের আশঙ্কিত হয়ে ওঠাটা বিচিত্র কিছু নয়। আল-হক আল্লাহর অন্যতম নাম, তুচ্ছ মরণশীল কারও পক্ষে এ উপাধি দাবি করাটা বহুঈশ্বরবাদীতার শামিল । আর-হাল্লাজ আল্লাহর সঙ্গে তার একীভূত হওয়ার অনুভূতিকে প্রকাশ করেছিলেন যাকে কিনা নিজেকে তাঁর একীভূত হওয়ার মতো মনে হয়েছিল । তিনি তাঁর এক কবিতায় যেমন বলেছেন:
আমিই সে যাকে আমি ভালোবাসি, এবং আমি যাকে ভালোবাসি সে আমি:
আমরা এক দেহে দুটি আত্মা।
যদি তুমি আমাকে দেখ, তাকে দেখতে পাবে,
যদি তাকে দেখতে পাও, তাহলে আমাদের দুজনকেই দেখবে।
গুরু আল-জুনায়েদ সত্তার বিলোপ ও ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার অনুভূতিকে ফানা আখ্যায়িত করেছেন, এটা তাঁরই দুঃসাহসী প্রকাশ। ব্লাসফেমির অভিযোগে অভিযুক্ত আল-হাল্লাজ তার দাবি প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রকৃত সন্ন্যাসীর মৃত্যুকে বেছে নেন।
ক্রুশবিদ্ধ করার জন্যে নিয়ে যাওয়া হলে ক্রুশ ও শূল দেখার পর সমবেত জনতার দিকে তাকিয়ে তিনি এক প্রার্থনাবাণী উচ্চারণ করেন, যার সমাপ্তিটুকু ছিল এরকম: “আর তোমার যেসব দাস তোমার ধর্মের রক্ষায় ও তোমার করুণা লাভের উদ্দেশ্যে আমাকে কতল করবে বলে সমবেত হয়েছে, হে প্রভু, তোমার করুণায় তাদের ক্ষমা করে দাও, তাদের ওপর দয়া বর্ষণ কর; কারণ নিশ্চয়ই তুমি আমার কাছে নিজেকে যেভাবে প্রকাশ করেছ সেভাবে ওদের সামনে প্রকাশিত হলে, ওরা যা করেছে তা করতে পারত না; আজ ওদের কাছে যা গোপন রেখেছ তা যদি তুমি আমার কাছেও গোপন রাখতে তাহলে আমাকে এই দুর্দশার মুখোমুখি হতে হতো না। তোমার সকল কাজই মহিমান্বিত এবং তোমার সকল ইচ্ছাই মহান।’[৩৫]
আল-হাল্লাজের উচ্চারণ আনা আল-হক:-’আমিই সত্য!’-দেখায় যে, অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বর বস্তুগত সত্তা নন বরং গভীরভাবে ভক্তিমূলক। পরে আল-গাযযালি যুক্তি দেখিয়েছেন, আল-হাল্লাজ ব্লাসফেমি করেননি, বরং অনভিজ্ঞদের বিভ্রান্ত করতে পারে এমন একটি নিগূঢ় সত্য প্রকাশ করে অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন মাত্র। যেহেতু আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনও সত্তা নই-শাহাদাহ্ যেমনটি বুঝিয়ে থাকে-সকল মানুষই অত্যাবশ্যকীয়ভাবে স্বর্গীয়। কোরান শিক্ষা দিয়েছে, ঈশ্বর তাঁর অবিকল প্রতিমূর্তিতে আদমকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি আয়নায় নিজেকে দেখার মতো করে ধ্যানমগ্ন হতে পারেন। সেকারণেই তিনি ফেরেশতাদের প্রথম মানুষের সামনে মাথা নত করে উপাসনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুফীরা যুক্তি দেখিয়েছে যে, ক্রিশ্চানরা মাত্র একজন ব্যক্তিকে গোটা স্বর্গীয় সত্তা ধারণকারী হিসাবে গ্রহণ করে ভুল করেছিল। আপন সত্তার মাঝে ঈশ্বরের মূল দর্শন আবিষ্কারকারী অতিন্দ্রীয়বাদী সৃষ্টির প্রথম দিনে যেমন ছিল নিজের মাঝেই তেমনি নতুন করে স্বর্গীয় ইমেজ আবিষ্কার করছে। সুফীদের অত্যন্ত পছন্দের পবিত্র বিবরণী হাদিসে কুদসি দেখায়, ঈশ্বর মুসলিমদের এমনভাবে নিজের দিকে আকর্ষণ করেন যে মনে হয় তিনি তাঁর প্রত্যেক দাসের মাঝে স্থান করে নিয়েছেন: আমি যখন তাকে ভালোবাসি, আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে, চোখ হই যা দিয়ে সে দেখে, হাতে পরিণত হই যা দিয়ে সে ধরে এবং পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে হাঁটে।’ আল-হাল্লাজের কাহিনী অতিন্দ্রীয়বাদী ও ধর্মীয় প্রশাসনের সম্ভাব্য গভীর বৈরিতাকেও তুলে ধরে, যাদের ঈশ্বর ও প্রত্যাদেশ সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা রয়েছে। অতিন্দ্রীয়বাদীর কাছে প্রত্যাদেশ এমন একটি ঘটনা যা তার আপন আত্মায় সংঘটিত হয়, কিন্তু প্রথাগত ধারণায় যারা বিশ্বাসী, যেমন উলেমাহদের বেলায় এ ঘটনা সম্পূর্ণই অতীতের ব্যাপার। কিন্তু আমরা দেখেছি, একাদশ শতাব্দীতে ইবন সিনা ও স্বয়ং আল গাযযালির মতো মুসলিম দার্শনিকরা ঈশ্বরের বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ অসন্দোষজনক আবিষ্কার করে অতিন্দ্রীয়বাদের শরণাপন্ন হয়েছেন। আল-গাযযালি সুফীবাদকে এস্টাবলিশমেন্টের কাছে গ্রহণীয় করে তুলেছিলেন; দেখিয়েছিলেন যে, এটাই মুসলিম আধ্যাত্মিকতার সবচেয়ে খাঁটি রূপ। দ্বাদশ শতাব্দীতে ইরানী দার্শনিক ইয়াহিয়া সুহরাওয়ার্দি এবং স্প্যানিশ বংশোদ্ভুত মুঈদ আদ-দিন ইবন আল-আরাবী ইসলামি ফালসাফাহকে অতিন্দ্রীয়বাদের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করে ইসলামি সাম্রাজ্যের বহু স্থানেই অতিন্দ্রীয়বাদীদের অনুভূত ঈশ্বরকে সাধারণ মাপকাঠিতে পরিণত করেন। অবশ্য আল-হাল্লাজের মতো সুহরাওয়ার্দিও ১৯৯১ সালে আলেপ্পোতে অস্পষ্ট কারণে উলেমাদের হাতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর ভাষায় আদি ‘প্রাচ্য ধর্মকে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত করাকে জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন এবং এভাবে ইবন সিনা প্রস্তাবিত প্রকল্পের সমাপ্তি টানতে চেয়েছেন। তাঁর দাবি ছিল প্রাচীন কালের সকল সাধুই একটিমাত্র মতবাদ প্রচার করে গেছেন। আদিতে হারমিসের-সুহরাওয়ার্দী যাকে কোরানে উল্লেখিত পয়গম্বর ইদ্রিস এবং বাইবেলে বর্ণিত ইনোক বলে শনাক্ত করেছেন-কাছে প্রকাশিত হয়েছিল; গ্রিক বিশ্বে প্লেটো ও পিথাগোরাস এবং মধ্যপ্রাচ্যে যরোস্ট্রীয় ম্যাজাইদের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল। অবশ্য অ্যারিস্টটলের পরবর্তী সময় থেকে এটা অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও মস্তিষ্কজাত দর্শনের ফলে চাপা পড়ে যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল-বিস্তামি ও আল-হাল্লাজ হয়ে স্বয়ং সুহরাওয়ার্দির কাছে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত সাধু পরম্পরায় গোপনে বাহিত হয়ে আসছিল। এই চিরন্তন দর্শন অতিন্দ্রীয়বাদী ও কল্পনানির্ভর কিন্তু যুক্তিকে বিসর্জন দিতে বলেনি। সুহরাওয়ার্দি বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে আল-ফারাবির মতোই কঠোর নিয়মনিষ্ঠ ছিলেন, কিন্তু তেমনি আবার সত্যের অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে অনুভূতির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। কোরান যেমন শিক্ষা দিয়েছে: সকল সত্য ঈশ্বর হতে আগত এবং সর্বত্রই সত্যের সন্ধান করা উচিত। একেশ্বরবাদের মতো পৌত্তলিকতাবাদ ও যরোস্ট্রিয়বাদেও এর দেখা মিলতে পারে। গোঁড়া ধর্মের বিপরীতে, নিজেকে যা গোত্রীয় বিরোধের দিকে ঠেলে দেয়, অতিন্দ্রীয়বাদ প্রায়শঃই দাবি করে যে, মানুষের মতো ঈশ্বরের কাছে যাবারও অসংখ্য পথ রয়েছে। সুফীবাদ বিশেষ করে অন্যদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অসাধারণ উপলব্ধি গড়ে তুলেছে।
