সচেতনতার এক বিকল্প অবস্থা অর্জনে গোটা দুনিয়ার অতিন্দ্রীয়বাদীদের সাহায্যকারী কৌশল ও অনুশীলনও আবিষ্কার করেছে তারা। মুসলিম আইনের মৌল চাহিদার অতিরিক্ত উপবাসের রেওয়াজ, রাত্রি জাগরণ ও মন্ত্রের মতো স্বর্গীয় নাম জপার বিষয় যোগ করেছে। এইসব চর্চার ফলে মাঝে মাঝে এমন সব আচরণের সৃষ্টি হতো যাকে অদ্ভুত ও অনিয়ন্ত্রিত মনে হতো। এসব অতিন্দ্রীয়বাদীরা ‘মাতাল’ সুফী হিসাবে পরিচিত ছিল। এদের মাঝে সর্বপ্রথমজন ছিলেন আবু ইয়াযিদ বিস্তামি (মৃত্যু, ৮৭৪), রাবিয়াহর মতো প্রেমিক রূপে ঈশ্বরের নৈকট্য প্রত্যাশা করেছিলেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মানবীয় প্রেমের ক্ষেত্রে নারীকে খুশী করার মতোই আল্লাহকে খুশি করতে প্রয়াস পেতে হবে যাতে নিজের সমস্ত প্রয়োজন ও চাহিদা বিসর্জন দিয়ে প্রেমাস্পদের মাঝে বিলীন হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু অর্জনের জন্যে যে অন্ত মূখী অনুশীলনের আবিষ্কার করেছিলেন সেটা তাকে তার ব্যক্তিরূপ ঈশ্বরের ধারণার ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়েছিল । আপন পরিচয়ের অন্তস্তলে পৌঁছে আবিষ্কার করেছেন যে, ঈশ্বর ও তার মাঝে কোনও বাধা নেই; প্রকৃতপক্ষে যা কিছু তিনি ‘সত্তা’ হিসাবে জানতেন, তা যেন বিলীন হয়ে গেছে:
সত্যের চোখ দিয়ে আমি আল্লাহর দিকে তাকালাম এবং তাঁকে বললাম: ‘কে এটা? তিনি বললেন: “আমিও নই, আবার আমি ছাড়া অন্য কেউও নয়। আমি ছাড়া আর কোনও প্রভু নেই। তারপর আমাকে আমার পরিচয় হতে পরিবর্তিত করে তার সত্তায় গ্রহণ করলেন….তারপর আমি তার মুখের জিহ্বার সাহায্যে তার সঙ্গে ভাব বিনিময় করলাম, বললাম আমার সঙ্গে তোমার কী ঘটেছে?’ তিনি বললেন, তোমার মাঝেই আমি; তুমি ছাড়া আর কোনও প্রভু নেই।৩২
কিন্তু আবারও, মানবজাতির মহাকাশে বাহ্যিক কোনও উপাস্য ছিল না এটা। ঈশ্বর রহস্যজনকভাবে গভীরতম সত্তার সঙ্গে একীভূত অবস্থায় আবিষ্কৃত হয়েছেন। অহমবোধের পদ্ধতিগত বিনাশ এক বৃহৎ অনির্বচনীয় সত্তায় বিলীন হওয়ার অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়। বিলীন (ফানা) হয়ে যাবার এই অবস্থাটি সুফী আদর্শের মূল বিষয়ে পরিণত হয়। অন্য বহু মুসলিম কোরান নির্দেশিত প্রকৃত ইসলামের উপলব্ধি হিসাবে স্বীকার করে না নিলে বিস্তামি যেভাবে শাহাদার নতুন। ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন তাকে ব্লাসফেমাস বলেই অভিহিত করা হতে পারত।
‘সোবার’ সুফী বলে পরিচিত অপর অতিন্দ্রীয়বাদীরা অপেক্ষাকৃত কম কোলাহলময় আধ্যাত্মিকতার পক্ষপাতি ছিল। ভবিষ্যতের সকল ইসলামি অতিন্দ্রীয়বাদীদের মূল নকশা প্রণয়নকারী বাগদাদের আল জুনায়েদ (মৃ. ৯১৯) বিশ্বাস করতেন যে, বিস্তামির চরম পন্থা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন যে ফানা (বিলীন) কে অবশ্য বাকা-এক বর্ধিত সত্তায় প্রত্যাবর্তন করা-দ্বারা অনুসৃত হতে হবে। ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনে আমাদের স্বাভাবিক ক্ষমতাবলী ধ্বংস হওয়া চলবে না, বরং তা সম্পূর্ণতা পাবে: আপন সত্তার গভীর মর্মমূলে স্বর্গীয় সত্তা আবিষ্কার করার জন্যে প্রতিবন্ধক অহমবোধকে ছিন্নভিন্নকারী একজন সুফীর বাড়তি আত্মোপলব্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণবোধের অধিকারী হওয়ার কথা। সে আরও বেশি করে সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে। সুতরাং, সুফীরা যখন ‘ফানা ও বাকা’র অনুভূতি তর্জন করেছে তখন এমন এক অবস্থা অর্জন করেছিল গ্রিক ক্রিশ্চানরা যাকে ‘দেবত্বপ্রাপ্তি’ বলবে। আল জুনায়েদ গোটা সুফী অনুসন্ধানকে সৃষ্টির মুহূর্তে মানুষের আদিম রূপে প্রত্যাবর্তন হিসাবে দেখেছেন: সে ঈশ্বরের কাক্ষিত আদর্শ মানব সত্তায় ফিরে যাচ্ছে। আপন সত্তা বা অস্তিত্বের উৎসেও ফিরে যাচ্ছে সে। প্লেটোনিক বা নস্টিক অভিজ্ঞতার মতো বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং দূরত্ব সৃষ্টি সুফীদের কাছেও মৌলিক বিষয় ছিল: এটা সম্ভবত আজকাল ফ্রয়েডিয় ও ক্লিনিয়রা যে বিচ্ছিন্নতার কথা বলে তা থেকে আলাদা নয়, যদিও সাইকোঅ্যানালিস্টরা এর পেছনে নিরীশ্বরবাদী উৎসের কথা বলেন। আল জুনায়েদ শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁর মতো অভিজ্ঞ ও দক্ষা সুফী শিক্ষকের (পির) তত্ত্বাবধানে একজন মুসলিম স্রষ্টার সঙ্গে মিলিত হয়ে ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ উপস্থিতির অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে, কোরান অনুসারী যে অভিজ্ঞতা আদমের কুঁচকি থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করার সময় সে অর্জন করছিল। এটা বিচ্ছিন্নতা ও বিষাদের সমাপ্তি। এটা গভীর সত্তার সঙ্গে মিলন, যে সত্তা বিশেষ নারী বা পুরুষটির হওয়ার কথা ছিল। ঈশ্বর বিচ্ছিন্ন বাহ্যিক কোনও সত্তা ও বিচারক নন, বরং কোনওভাবে প্রতিটি সত্তার মূলে একীভূত:
এখন আমি জানতে পেরেছি, হে প্রভু,
কী আছে আমার অন্তরে;
গোপনে, গোটা জগৎ হতে বিচ্ছিন্ন,
আমার জিভ আমার পূজনীয়র সাথে কথা বলেছে।
সুতরাং, এক অর্থে আমরা
আমরায় একীভূত, এবং এক;
কিন্তু অন্যভাবে বিচ্ছেদ
আমাদের চিরকালীন অবস্থা।
যদিও আমার দৃষ্টির সামনে
থেকে তোমার সত্তার গভীর আতঙ্ক আড়াল করে রেখেছ,
বিস্ময়ভরা ও প্রবল ভারময় আশীর্বাদে
আমি অনুভর করি আমার গভীর ভিত্তি ছুঁয়েছ তুমি।
একত্বের ওপর গুরুত্ব আরোপ কোরানের তৌহীদের আদর্শের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়: আপন তুচ্ছ অমোঘ মত্ত সত্তাকে নিয়ন্ত্রণের ভেতর দিয়ে অতিন্দ্রীয়বাদী ব্যক্তিগত সংহতিতে স্বর্গীয় সত্তা অনুভব করবে।
