সুতরাং, সিমিয়নের কাছে ঈশ্বর জ্ঞাত ও অজ্ঞাত, কাছের ও দূরের । কেবল ভাষার সাহায্যে অনিবৰ্চনীয় বিষয়কে’২৬ বর্ণনার করার দুঃসাধ্য প্রয়াসের বদলে তিনি সাধুদের প্রতি নিজস্ব আত্মায় যা পরিবর্তনশীল সত্তা হিসাবে অনুভব করা সম্ভব সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এক দিব্যদর্শনের সময় ঈশ্বর সিমিয়নকে যেমন বলেছিলেন: ‘হ্যাঁ, আমিই ঈশ্বর, যে তোমাদের সাথেই মানুষে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর দেখ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, যেমন দেখতে পাচ্ছ; আর আমি তোমাকে ঈশ্বরে পরিণত করব।২৭ ঈশ্বর বাহ্যিক, বস্তুগত সত্য নন বরং আবশ্যিকভাবে অন্ত রের এবং ব্যক্তিগত আলোকপ্রাপ্তি ছিলেন। কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে আলোচনায় অস্বীকৃতির কারণে সিমিয়নের সঙ্গে অতীতের ধর্মতত্ত্বীয় দর্শনের বিচ্ছেদ ঘটেনি। তাঁর নতুন ধর্মতত্ত্ব ফাদার্স অভ দ্য চার্চ-এর শিক্ষার ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। হইমস অভ ডিভাইন লাভ-এ সিমিয়ন আথানাসিয়াস ও ম্যাক্সিমাস বর্ণিত মানুষের দেবত্বপ্রাপ্তির গ্রিক মতবাদ প্রকাশ করেছেন:
হে আলো, কেউ যার নাম বলতে পারে না, কারণ এর কোনও নামই নেই।
হে আলো, বহু নামধারী, কারণ এটা সব বস্তুতেই ক্রিয়াশীল…
ঘাসের সঙ্গে কীভাবে মেলাও তুমি নিজেকে?
কীভাবে, অপরিবর্তিত থেকে একেবারে দুর্গম হয়ে ঘাসের ধর্ম অটুট রাখ
তুমি?[২৮]
এই পরিবর্তন সম্পাদনকারী ঈশ্বরের সংজ্ঞা দেওয়া অর্থহীন, কারণ তিনি ভাষা ও বর্ণনার অতীত। তারপরেও মানুষের অখণ্ডতাকে অটুট রেখে তাকে পরিপূর্ণ ও বদলে দেওয়া অভিজ্ঞতা হিসাবে ‘ঈশ্বর এক তর্কাতীত বাস্তবতা। গ্রিকরা ঈশ্বর সম্পর্কে ট্রিনিটি ও ইনকারনেশনের মতো ধারণা গড়ে তুলেছিল যা তাদের অন্য একেশ্বরবাদীদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। তাসত্ত্বেও তাদের অতিন্দ্রীয়বাদীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ইহুদি ও মুসলিমদের অতিন্দ্রীয় অভিজ্ঞতার প্রচুর মিল ছিল।
এমনকি পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) প্রধানত একটা ন্যায়বিচার ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় মনোযোগি ছিলেন, কিন্তু তিনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচরদের কয়েকজন অতিন্দ্রীয়বাদের দিকে ঝুঁকে ছিলেন। মুসলিমরা খুব দ্রুত নিজস্ব আলাদা অতিন্দ্রীয়বাদী ট্র্যাডিশন গড়ে তুলেছিল । অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে ইসলামের অন্যান্য গোষ্ঠীর পাশাপাশি একটা ভাববাদী রূপও বিকাশ লাভ করেছিল; এই ভাববাদীরা রাজদরবারের আঁক ও উম্মাহর প্রাথমিককালের কৃচ্ছ্বতার অনুশীলন ত্যাগের ব্যাপারে মুতাযিলি ও শিয়াহদের মতোই উদ্বিগ্ন ছিল। পয়গম্বরের পছন্দ বলে কথিত উলের [আরবী সফ (sWF) তৈরি কর্কশ পোশাকে মদীনার আদি মুসলিমদের সরল জীবন ধারায় প্রত্যাবর্তনের প্রয়াস পেয়েছে তারা। পরবর্তীকালে এরাই সুফী’ নামে পরিচিতি পায়। সামাজিক ন্যায়বিচারের ব্যাপারটি এদের ধর্মানুরাগের মূল বিষয় রয়ে যায়, প্রয়াত ফরাসি পণ্ডিত লুই ম্যানিন যেমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
অতিন্দ্রীয় আহ্বান নিয়ম হিসাবে সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে বিবেকের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ফল, কেবল অন্যদের নয়, বরং প্রধানত ও বিশেষভাবে নিজের অপরাধের বিরুদ্ধে, অন্তরের পরিশুদ্ধতার মাধ্যমে যেকোনও মূল্যে ঈশ্বরকে লাভ করার আকাঙ্ক্ষায় যা জোরদার হয়ে ওঠে।[২৯]
শুরুর দিকে অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে সুফীদের অনেক মিল ছিল। এভাবে বিশিষ্ট মুতাযিলি যুক্তিবাদী ওয়াসিল ইবন আতা (মৃত্যু, ৭৪৮) পরবর্তীকালে সুফীবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে পরিগণিত মদীনার দরবেশ হাসান আল-বসরির (মৃত্যু, ৭২৮) শিষ্য ছিলেন।
উলেমাগণ ইসলামকে একক ও সত্য ধর্ম হিসাবে বিবেচনা করে একে অন্যান্য ধর্ম হতে সম্পূর্ণ আলাদা করে নিচ্ছিলেন, কিন্তু সুফীগণ সঠিক পথে পরিচালিত সকল ধর্মের এক্যের কোরানের দর্শন মোটামুটি অনুসরণ করে গেছে। উদাহরণ স্বরূপ, জেসাস বহু সুফীর অভ্যন্তরীণ জীবনের পয়গম্বর হিসাবে সম্মানিত হয়েছেন। কেউ কেউ এমনকি ‘আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনও প্রভু নেই এবং জেসাস তার বার্তাবাহক, উচ্চারণ করার জন্যে বিশ্বাসের ঘোষণা শাহাদা পরিবর্তন করেছে যা কৌশলগত দিক থেকে শুদ্ধ কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তর্কোদ্দীপক। কোরান যেখানে আতঙ্ক ও ভয় জাগানো ন্যায়বিচারের ঈশ্বরের কথা বলে, সেখানে প্রাথমিক ভাববাদী নারী রাবিয়াহ (মৃত্যু, ৮০১) এমনভাবে ভালোবাসার কথা বলেছেন, ক্রিশ্চানরা তাঁকে পরিচিত আবিষ্কার করত:
দুভাবে আমি তোমায় ভালোবাসি: স্বার্থপরের মতো,
এবং তারপর, যা তোমার উপযুক্ত।
আমার ভালোবাসা স্বার্থপর ভালোবাসা নয়,
কেবল সারাক্ষণ আমি তোমারই কথা ভাবি।
নিখাদ এই ভালোবাসা যখন তুমি তুলে ধর
আমার বিমুগ্ধ দৃষ্টির আবরণ।
সেখানে বা এতে আমার প্রশংসা নেই:
উভয় প্রশংসাই তোমার, আমি বিশ্বাস করি।
এটা তাঁর সুবিখ্যাত প্রার্থনার কাছাকাছিঃ ‘হে প্রভু! যদি আমি নরকের শাস্তির ভয় থেকে তোমার উপাসনা করি, আমাকে নরকের আগুনে পুড়িয়ে; যদি স্বর্গের প্রলোভনে উপাসনা করি, আমাকে স্বর্গ হতে বঞ্চিত করো, কিন্তু যদি কেবল তোমার জন্যেই উপাসনা করি, তোমার চিরন্তন সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত করে রেখো না।” ঈশ্বর-প্রেম সুফীবাদের মূল সুরে পরিণত হয়েছে। সুফীরা হয়তো বা নিকট প্রাচ্যের ক্রিশ্চান ভাববাদীদের দ্বারা ভালোভাবেই প্রভাবিত হয়ে থাকবে, তবে মুহাম্মদ (স) ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী হিসাবে বয়ে গেছেন। প্রত্যাদেশ পাওয়ার সময় মুহাম্মদের (স) যেমন অনুভূতি হয়েছিল অবিকল সেই অনুভূতি লাভের আকাঙ্ক্ষা করেছে তারা। স্বাভাবতই, তার অতিন্দ্রীয় স্বর্গারোহণের ঘটনার দ্বারাও অনুপ্রাণিত হয়েছেন তারা, যা তাদের ঈশ্বর বোধের আদর্শে পরিণত হয়।
