অবশ্য সবার পক্ষে এই সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব নয়, তবে প্রতিমার মাঝে অন্য ক্রিশ্চানরা এই অতিন্দ্রীয় অভিজ্ঞতার খানিক ছটা দেখতে পাবে। পাশ্চাত্যে ধর্মীয় শিল্পকর্ম প্রবলভাবে প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে উঠছিল: জেসাস বা সাধুদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের ঐতিহাসিক বিবরণ তুলে ধরছিল তা । অবশ্য, বাইযান্তিয়ামে ইহজগতের কোনও বিষয়কে তুলে ধরার জন্যে মূর্তি ব্যবহার করা হতো না, বরং অতিন্দ্রীয়বাদীদের অনুপ্রাণিত করার জন্যে হেসিচ্যাস্টদের অতিন্দ্রীয় অভিজ্ঞতা চিত্রায়িত করার প্রয়াস ছিল এটা। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ পিটার ব্রাউন যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, ‘গোটা প্রাচ্য ক্রিশ্চান জগতে প্রতিমা ও দিব্যদর্শন একে অপরটিকে বৈধতা দান করেছে…সমন্বিত কল্পনার একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে গভীর সন্নিবেশ…ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ অনিবৰ্চনীয়তা একটা স্পষ্ট চেহারা লাভ করে, স্বপ্নে ও প্রতিটি মানুষের কল্পনায় যেখানে সাধারণভাবে এটা শিল্পে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিমা এক বাস্তবায়িত স্বপ্নের। বৈধতা ছিল। প্রতিমাসমূহ বিশ্বাসীকে উপদেশ দেওয়া বা কোনও তথ্য, ধারণা বা মতবাদ শিক্ষা দেওয়ার জন্যে ছিল না। এগুলো ছিল ধ্যানের (থিয়োরিয়া) একটা কেন্দ্রবিন্দু, বিশ্বাসীকে স্বর্গীয় জগতের এক ধরনের জানালার ব্যবস্থা করে দিত।
অবশ্য অষ্টম শতাব্দী নাগাদ ঈশ্বরের বাইন্তানীয় অভিজ্ঞতা এমন মূল বিষয়ে পরিণত হয় যে, সেগুলো গ্রিক চার্চে মতবাদ বিষয়ের প্রবল বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লোকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছিল যে, ক্রাইস্টকে আঁকতে গিয়ে শিল্পী আসলে ঠিক কী ওঁকেছেন। তাঁর ঐশ্বরিকতাকে তুলে ধরা অসম্ভব, কিন্তু শিল্পী যদি দাবি করেন যে, তিনি কেবল মানুষ জেসাসকে আঁকছেন, তাহলে নেস্টরিয়বাদের দোষে অপরাধী হবেন তিনি জেসাসের মানব ও স্বর্গীয় প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন, এই ধর্মদ্রোহী বিশ্বাস। প্রতিমা বিরোধীরা সব রকম প্রতিমা ধ্বংস করতে চেয়েছিল, কিন্তু নেতৃস্থানীয় দুজন সাধু বেথেলহেমের নিকটবর্তী মার সাব্বাস মঠের জন অভ দামাস্কাস (৬৫৬-৭৪৭) ও কন্সতান্তিনোপলের নিকটস্থ স্তাদিয়াস মঠের থিয়োদর (৭৫৯-৮২৬) প্রতিমার পক্ষে দাঁড়ান। ক্রাইস্টের মূর্তি গড়ায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিমা বিরোধীর প্রয়াস ভুল বলে যুক্তি দেখান তাঁরা। আবতার পর্বের পর বস্তুজগৎ ও মানবদেহকে স্বর্গীয় মাত্রা দান করা হয়েছে। সুতরাং, শিল্পী এই নতুন ধরনের দেবত্বপ্রাপ্ত মানুষকে আঁকতে পারেন। ক্রাইস্ট দ্য লগোস ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি। সুতরাং, শিল্পী ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিও আঁকছেন। ভাষা বা মানবীয় ধ্যান-ধারণায় ঈশ্বরকে তুলে ধরা সম্ভব নয়, কিন্তু শিল্পীর কলম বা শাস্ত্রের প্রতীকী ভঙ্গিতে তাঁকে বর্ণনা করা। যেতে পারে।
গ্রিকদের ধর্মানুরাগ প্রতিমার ওপর এত বেশি নির্ভরশীল ছিল যে ৮২০। সাল নাগাদ প্রতিমা বিরোধীরা জনতার কাছে পরাস্ত হয়েছিল। তবে ঈশ্বর এক অর্থে বর্ণনাযোগ্য ঘোষণা ডেনিসের অ্যাপেফ্যাটিক ধর্মতত্ত্বের প্রত্যাখ্যান ছিল। না। গ্রেটার অ্যাপলজি ফর দ্য হলি ইমেজেস-এ সাধু নিসেফোরাস দাবি করেন। প্রতিমাসমূহ ঈশ্বরের নীরবতার প্রকাশক, নিজেদের মাঝে সত্তার উধ্বের এক রহস্যের অনিবৰ্চনীয়তাকে তুলে ধরে রুদ্ধ না হয়ে বক্তব্যহীন থেকে ধর্মতত্ত্বের তিনগুণ অলৌকিক সুরে ঈশ্বরের মহানুভবতার প্রশংসা করে।২৩ বিশ্বাসীকে চার্চের ডগমার অধীনস্ত হবার নির্দেশ দেওয়ার বদলে আপন ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে সাবলীল ধারণা গড়ে তুলতে সাহায্য করার জন্যে প্রতিমাসমূহ তাদের এক রহস্যময়তার ভেতর ধরে রাখে। এইসব ধর্মীয় চিত্রকলার প্রভাব বর্ণনা করতে গিয়ে নিসেফোরাস এর সঙ্গে কেবল সঙ্গীতেরই তুলনা টানতে পেরেছেন যা শিল্পকলার সবচেয়ে অনির্বচনীয় ও সম্ভবত সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ধরণ। সঙ্গীতের মাধ্যমে আবেগ ও অনুভূতি এমনভাবে প্রবাহিত হয় যা ভাষা ও ধারণাকে পাশ কাটিয়ে যায়। উনবিংশ শতাব্দীতে ওয়াল্টার প্যাটার উল্লেখ করেছিলেন, সকল চিত্রকলা সঙ্গীতের মতো অবস্থা সৃষ্টি করে; নবম শতাব্দীতে বাইযান্তিয়ামে গ্রিক ক্রিশ্চানরা ধর্মতত্ত্বকে মূর্তিবিদ্যার অনুরূপ হিসাবে দেখেছে। তারা দেখেছে যে, যৌক্তিক আলোচনার চেয়ে শিল্পকর্মেই বরং ঈশ্বরকে ভালোভাবে তুলে ধরা যায়। চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর চরম ভাষানির্ভর খৃস্টতত্ত্বীয় বিতর্কের পর তারা ক্রিশ্চানদের কল্পনানির্ভন অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল এক ঈশ্বরের অবয়ব গড়ে তুলছিল।
এ বিষয়টির সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করেছিলেন কন্সতান্তিনোপলের ক্ষুদে মঠ সেইট ম্যাকবাস এর অ্যাবট সিমিয়ন (৯৪৯-১০২২)। নিউ থিয়োলজিয়ান’ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। নতুন ধরনের এই ধর্মতত্ত্বে ঈশ্বরের সংজ্ঞা দেওয়ার কোনও প্রয়াস ছিল না। এটা, জোর দিয়ে বলেছেন সিমিয়ন, ধৃষ্টতাপূর্ণ ব্যাপার হবে। প্রকৃতপক্ষেই ঈশ্বর সম্পর্কে যেভাবেই যা কিছু বলা হোক না কেন, তাতে বোঝাবে যে, “যা দুর্বোধ্য তা আসলে বোধগম্য।২৫ ঈশ্বরের স্বরূপ সম্পর্কে যৌক্তিক বক্তব্য রাখার বদলে নতুন ধর্মতত্ত্ব প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুভূতির উপর নির্ভর করেছে। ধারণাগতভাবে ঈশ্বরকে জানা অসম্ভব, যেন তিনি আরেকটি সত্তা মাত্র যার সম্পর্কে আমরা ধারণা করতে পারি। ঈশ্বর এক রহস্য। ক্রাইস্টের রূপান্তরিত মানবদেহে নিজেকে প্রকাশকারী ঈশ্বরের সচেতন অনুভূতি লাভকারী ব্যক্তিই প্রকৃত ক্রিশ্চান । সিমিয়ন পার্থিব জীবন থেকে আকস্মিকভাবে পাওয়া এক অভিজ্ঞতার সাহায্যে ধ্যানের জগতে প্রবেশ করেছিলেন। প্রথমে কী ঘটছে সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই করতে পারেননি তিনি, কিন্তু ক্রমে বুঝতে পেরেছেন, তাঁর মাঝে পরিবর্তন ঘটছে, আলোয় বিলীন হয়ে যাচ্ছেন তিনি, যা আসলে স্বয়ং ঈশ্বর। এ আলো অবশ্যই আমাদের চেনা আলো নয়, এটা ‘আকার, ইমেজ বা উপস্থাপনের অতীত; কেবল প্রার্থনার মাধ্যমে সহজাতভাবে অনুভব করা। সম্ভব।২৫ কিন্তু এই অভিজ্ঞতা কেবল অভিজাত বা সাধু শ্রেণীর জন্যে ছিল না; ফলে ক্রাইস্ট ঘোষিত রাজ্য হচ্ছে ঈশ্বরের বিলীন হওয়া যা পরকালের জন্যে অপেক্ষা না করেই সবাই ইহজগতেই অর্জন করতে পারে।
