দুর্বোধ্য একজন ঈশ্বরকে জানা সম্ভব ছিল কীভাবে? গ্রিকরা এ ধরনের প্যারাডক্স ভালোবাসত এবং হেসিচ্যাস্টরা ঈশ্বরের সত্তা (Ousia) ও তাঁর শক্তি’ (energetai) বা জগতে তাঁর ক্রিয়াকর্মের সেই প্রাচীন পার্থক্যে ফিরে গেছে যা আমাদের ঈশ্বর সম্পর্কে কিছুটা জানতে সক্ষম করেছে। আমরা ঈশ্বরকে যেহেতু তার আপন সত্তায় কখনওই জানতে পারব না, সেহেতু প্রার্থনার সময় আমরা আসলে তার শক্তি’কে অনুভব করি, ‘সত্তা’কে নয়। একে পৃথিবীকে আলোকিত করে তোলা ঈশ্বর হতে বর্ষিত রশ্মি হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে; কিন্তু সূর্য রশ্মি যেমন সূর্য হতে আলাদা তেমনি এগুলোকেও ঈশ্বর হতে আলাদা স্বর্গীয় সত্তার । এগুলো এক চরম নীরব ও দুয়ে ঈশ্বরকে প্রকাশ করে। সেইন্ট বাসিল যেমন বলেছিলেন: “শক্তির সাহায্যে আমরা আমাদের ঈশ্বরকে জানতে পারি, আমরা তাঁর সত্তার নিকটবর্তী হওয়ার কথা। বলি না, কারণ তাঁর শক্তি আমাদের মাঝে অবতীর্ণ হয়, কিন্তু সত্তা দুর্গম রয়ে যায়।১৮ ওল্ড টেস্টামেন্টে এই স্বর্গীয় শক্তি’কে ঈশ্বরের ‘প্রতাপ’ (কভোদ) বলা হয়েছে। নিউ টেস্টামেন্টে তাবর পর্বতে ব্যক্তি ক্রাইস্টের মানবরূপ স্বর্গীয় রশ্মি দিয়ে বদলে যাওয়ার সময় (Transfigured) দেদীপ্যমান হয়েছিল। এবার সেই রশ্মি সারা বিশ্ব জগতে ছড়িয়ে পড়ে রক্ষাপ্রাপ্তদের দেবত্ব দান করেছিল। শক্তি’ বা ‘এনার্জিয়াই’ শব্দটি যেমন বোঝায়, এটা ঈশ্বর সম্পর্কিত সক্রিয় ও গতিময় ধারণা ছিল। পশ্চিমে যখন ঈশ্বরকে তাঁর চিরন্তন গুণাবলী-তার মহত্ব বিচার, প্রেম ও সর্বশক্তিমানতা-দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে দেখবে, তখন গ্রিকরা ঈশ্বরকে বিরামহীন তৎপরতার মাঝে কোনওভাবে উপস্থিত থাকার ভেতর দিয়ে নিজেকে সুগম্য করে তুলতে দেখেছে।
সুতরাং, আমরা যখন প্রার্থনায় শক্তিসমূহকে অনুভব করি, তখন এক অর্থে সরাসরি ঈশ্বরের সঙ্গেই সম্পর্ক স্থাপন করি, যদিও জ্ঞানাতীত সত্তা স্বয়ং অস্পষ্টতার ঘেরাটোপে রয়ে যান। নেতৃস্থানীয় হেচিসচাস্ট ইভাগ্রিয়াস পন্তাস (মৃত্যু, ৩৯৯) জোর দিয়ে বলেছেন, প্রার্থনায় আমরা ঈশ্বরের যেটুকু জ্ঞান লাভ করি তাঁর সঙ্গে ধারণা বা ইমেজের কোনওই সম্পর্ক নেই, বরং এসবের অতীত এক প্রত্যক্ষ স্বর্গীয় অনুভূতি। সুতরাং, হেসিচ্যাস্টদের পক্ষে আত্মাকে উন্মুক্ত করে তোলা অত্যন্ত জরুরি ছিল: ‘প্রার্থনা করার সময়, সন্ন্যাসীদের উদ্দেশে বলেছেন তিনি, “নিজের ভেতর উপাস্যের কোনও রূপ গড়ে তুলবে না, আবার মনকে কোনও রূপ দিয়ে আকৃতি গড়তেও দেবে না। বরং তার বদলে তাদের উচিত হবে ‘অবস্তুগতভাবে অবস্তুর দিকে অগ্রসর হওয়া।”১৯ ইভাগ্রিয়াস অনেকটা ক্রিশ্চান যোগের প্রস্তাব রাখছিলেন। এটা চিন্তার কোনও প্রক্রিয়া ছিল; প্রকৃতপক্ষে, প্রার্থনার মানে হচ্ছে চিন্তা দূর করা।২° এটা বরং ঈশ্বরের সহজাত উপলব্ধি ছিল। এর ফলে সকল বস্তুর ঐক্যের বোধ সৃষ্টি হবে, বিক্ষোভ ও জটিলতা হতে নিস্তার মিলবে এবং অহমের বিনাশ ঘটবে-এই অভিজ্ঞতা বুদ্ধ মতবাদের মতো নিরীশ্বরবাদী ধর্মসমূহের ধ্যানের মাধ্যমে সৃষ্ট অভিজ্ঞতার মতো। সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে অহংস্কার, লোভ, বিপদ বা ক্রোধ এর মতো প্রবল আবেগ যা তাদের অহমের সঙ্গে আটকে রাখে তা থেকে মনকে সরিয়ে এনে হেসিচ্যাস্টরা নিজেদের অতিক্রম করে যাবে এবং ঐশী শক্তি’তে তাবর পাহাড়ে রূপান্তরিত জেসাসের মতো একই রকম দেবত্ব লাভ করবে ।
পঞ্চম শতাব্দীর ফটিসের বিশপ দিওদোকাস জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই দেবত্ব প্রাপ্তি পরকালের জন্যে অপেক্ষা করে না, বরং সচেতনভাবে ইহজগতেই অর্জন করা যেতে পারে। তিনি মনোসংযোগের একটা পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছিলেন যার সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের সম্পর্ক ছিল: শ্বাস গ্রহণের সময় হেসিচ্যাস্টরা প্রার্থনা করবে: ‘জেসাস ক্রাইস্ট, ঈশ্বর-পুত্র’; শ্বাস ত্যাগ করতে করতে উচ্চারণ করতে হবে: ‘আমাদের মার্জনা করুন। পরবর্তীকালের হেসিচ্যাস্টরা এই অনুশীলনের পরিমার্জনা করে: ধ্যানীকে কাঁধ মাথা নিচু করে বুক বা নাভীর দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করতে হবে। মনের গভীরে হৎপিণ্ডের মতো নির্দিষ্ট কোনও শারীরিক অংশের দিকে মনোযোগ দেওয়ার জন্যে খুব ধীরে। ধীরে শ্বাস নিতে হবে। খুব কঠিন অনুশীলন ছিল এটি, অবশ্যই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে; একমাত্র অভিজ্ঞ গুরুর অধীনেই নিরাপদে এর চর্চা করা যেতে পারে। ক্রমে কোনও বৌদ্ধ ভিক্ষুর মতো হেসিচ্যাস্ট নারী বা পুরুষ আবিষ্কার করবে যে সে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা আস্তে করে এক পাশে সরিয়ে রাখতে পারছে: মনে ভিড় জমানো ইমেজারি মিলিয়ে যাবে এবং হেসিচ্যাস্ট প্রার্থনায় বিলীন হয়ে যাবার বোধ পাবে । গ্রিক ক্রিশ্চানরা নিজেরাই এমন কৌশল আবিষ্কার করেছিল যা প্রাচ্য দেশীয় ধর্মগুলোয় শত শত বছর ধরে অনুসৃত হয়ে আসছিল। প্রার্থনাকে তারা মানসিক বিকারজাত শারীরিক প্রক্রিয়া হিসাবে দেখেছে, অন্যদিকে অগাস্তিন ও গ্রেগরির মতো পাশ্চাত্যবাসীরা মনে করেছেন প্রার্থনায় শরীর হতে আত্মার মুক্তিলাভ ঘটা উচিত। ম্যাক্সিমাস দ্য কনফেসর জোর দিয়েছেন: ‘সম্পূর্ণ মানুষকে ঈশ্বরে পরিণত মানুষের কৃপায় ঈশ্বরে পরিণত হতে হবে, প্রকৃতিগত দিক দেহ-আত্মায় সম্পূর্ণ মানুষ, প্রকৃতিগত দিক দিয়ে পরিণত হবে সম্পূর্ণ মানুষ, আত্মা আর দেহ। এমন শক্তিশালী ও জোরাল শক্তি আর স্পষ্টতার অনুভূতি লাভ করবে হেসিচ্যাস্ট যা ঐশ্বরিক না হয়ে পারে না। আমরা যেমন দেখেছি, গ্রিকরা এই ‘দেবতৃপ্রাপ্তিকে মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক আলোকন হিসাবে দেখেছে। তাবর পর্বতে রূপান্তরিত ক্রাইস্টের মাঝে অনুপ্রেরণার সন্ধান পেয়েছিল তারা, ঠিক বৌদ্ধরা যেমন মানব সত্তার পূর্ণাঙ্গ বোধ লাভকারী বুদ্ধের প্রতিমূর্তি দেখে অনুপ্রাণিত হয়। প্রাচ্যের অর্থডক্স চার্চসমূহের ক্ষেত্রে রূপান্তরের দ্য ফিস্ট অভ ট্রান্সফিগারেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, একে এপিফ্যানি, ঈশ্বরের অভিব্যক্তি বলা হয়। পশ্চিমের সতীর্থদের বিপরীতে গ্রিকবা ঈশ্বর-অনুভূতি লাভের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ, শুষ্কতা ও নৈঃসঙ্গকে অনতিক্রম্য পূর্বশর্ত হিসাবে দেখেনিঃ এগুলো তুচ্ছ বিকৃতি মাত্র এবং অবশ্যই নিরাময় করতে হবে। গ্রিকদের মাঝে আত্মার কৃষ্ণপক্ষের কোনও বিশ্বাস ছিল না। গেথসেমেন বা/এবং ক্যালভারি নয়, জোরাল মোটিফটি ছিল তাবর।
