এটা স্পষ্টতই সংস্কৃতির শর্তাধীন হলেও এ ধরনের উর্ধ্বারোহণ’কে জীবনের তর্কাতীত সত্য বলেই মনে হয়। আমরা একে যেভাবেই ব্যাখ্যা করি না কেন, সারা বিশ্বের ও ইতিহাসের সকল পর্যায়ে মানুষ এই ধরনের ধ্যানমুখী অভিজ্ঞতার দেখা পেয়েছে। একেশ্বরবাদীরা এই পরম অন্তদৃষ্টিকে ঈশ্বরের দর্শন’ আখ্যায়িত করেছে। প্লাটিনাস একে দ্য ওয়ানের উপলব্ধি ধরে নিয়েছেন, বুদ্ধরা একে বলবে নির্বাণের দর্শন লাভ। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে, এটা এমন কিছু যা বিশেষ আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি সবসময়ই অর্জন করতে চেয়েছে। ঈশ্বর সংক্রান্ত অতিন্দ্রীয়বাদী অভিজ্ঞতার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা সকল ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই এক রকম। এটা সত্তার বাইরে নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ধারণা নয়, বরং এক ধরনের ভক্তিপূর্ণ অভিজ্ঞতা যার জন্যে অন্তরে যাত্রা করার প্রয়োজন হয়। মনের চিত্রকল্প গঠনকারী অংশের সাহায্যে এই প্রক্রিয়াটি অনুসৃত হয় প্রায়শঃই যাকে বলা হয় কল্পনা-অধিকতর বুদ্ধিবৃত্তিক যৌক্তিক অংশ দিয়ে নয়। এবং শেষ পর্যন্ত এটা এমন কিছু যা অতিন্দ্রীয়বাদী নারী বা পুরুষ ইচ্ছাকৃতভাবে নিজ সত্তায় সৃষ্টি করে থাকে: নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক বা মানসিক অনুশীলন চরম দর্শন লাভ ঘটায়; আচমকা কারও ওপর ঘটে যায় না।
অগাস্তিন সম্ভবত ধারণা করেছিলেন যে, বিশেষ সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা কখনও কখনও জীবদ্দশায়ই ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পেতে পারে। মোজেস ও সেইন্ট পলকে উদাহরণ হিসাব উল্লেখ করেছেন তিনি। আধ্যাত্মিক জীবনের স্বীকৃত শুরু এবং ক্ষমতাশালী প্রধান যাজক পোপ গ্রেগরি দ্য গ্রেট (৫৪০-৬০৪) দ্বিমত পোষণ করেছেন। বুদ্ধিজীবী ছিলেন না তিনি, বরং টিপিক্যাল রোমান হিসাবে আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন। ঈশ্বর সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের সামগ্রিক অস্পষ্টতা বোঝাতে মেঘ, কুয়াশা বা অন্ধকারের উপমা ব্যবহার করেছেন। তার ঈশ্বর দুর্ভেদ্য অন্ধকারে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গিয়েছেন, এই অন্ধকার গ্রিক ক্রিশ্চান গ্রেগরি অভ নাইসা ও ডেনিসের মেঘের দুর্বোধ্য অনুভূতির চেয়ে ঢের কষ্টকর। গ্রেগরির বেলায় ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা ছিল হতাশাজনক। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ দূরূহ। আমাদের পক্ষে তাঁর সম্পর্কে পরিচিতের মতো কোনও কিছু উচ্চারণ করার জো নেই। এমন নয় যে, আমাদের সঙ্গে তার কোনও মিল আছে। আমরা ঈশ্বর সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমরা মানুষ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের ভিত্তিতে ঈশ্বরের আচরণ সম্পর্কে কোনওরকম পূর্ব ধারণাই করতে পারি নাঃ ‘তো যখন আমরা বুঝতে পারি আমাদের পক্ষে ঈশ্বর সম্পর্কে পুরোপুরিভাবে কিছু জানা সম্ভব নয়, একমাত্র তখনই তার বিষয়ে আমরা সত্যের কাছাকাছি থাকি। গ্রেগরি ক্রমাগত ঈশ্বরকে লাভ করার প্রয়াস ও বেদনার কথা বলেছেন। প্রচণ্ড সগ্রামের পর মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্যে ধ্যানের আনন্দ উপভোগ করা যেতে পারে। ঈশ্বরের মধুর স্বাদ পাওয়ার আগে আত্মাকে এর স্বাভাবিক উপাদান অন্ধকার ছুঁড়ে বেরিয়ে আসার জন্যে লড়াই করতে হয়: এটা নিজের মাঝে চকিত দৃষ্টিতে যে জিনিসটা দেখেছে তার ওপর দৃষ্টি স্থির রাখতে পারে না, কারণ আপন স্বভাবের কারণেই এটা নিমজ্জিত হতে বাধ্য হয়। নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার জন্যে এটা হাঁপায়, সংগ্রাম করে, বারবার প্রয়াস পায়, কিন্তু আবার ডুবে যায়, ক্লান্তির ভারে চিরচেনা অন্ধকারে।[১৫]
কেবল মনের প্রবল প্রয়াসের পরেই ঈশ্বরকে লাভ করা যেতে পারে, মনকে তার সঙ্গে যুঝতে হয়; যেভাবে জ্যাকব যুদ্ধ করেছিলেন দেবদূতের সঙ্গে। ঈশ্বরের কাছে যাবার পথ অপরাধ, অশ্রু ক্লান্তিময়; মন তাঁর নিকটবর্তী হলে, কান্না ছাড়া আর কিছু করার থাকে না আত্মার। ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের আকাক্ষায় ‘নিপীড়িত’ আত্মা কেবল ক্লান্ত হয়ে অশ্রুতেই শান্তি খুঁজে পায়।[১৬] দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক পথ প্রদর্শক ছিলেন গ্রেগরি; স্পষ্টতই পশ্চিমের বাসিন্দারা ঈশ্বরকে চাপ হিসেবেই আবিষ্কার করে গেছে।
প্রাচ্যে ঈশ্বর সম্পর্কিত ক্রিশ্চানদের অভিজ্ঞতা অন্ধকারের বদলে আলোর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। গ্রিকরা এক ভিন্ন ধরনের অতিন্দ্রীয়বাদ গড়ে তুলেছিল, যা সারা বিশ্বে দেখা যায়। এ পদ্ধতি ইমেজারি ও দিব্য দর্শনের ওপর নির্ভরশীল ছিল না, বরং ডেনিস দ্য আরোপাগাইতের উল্লেখ করা অ্যাপোফ্যাটিক বা নীরব অভিজ্ঞতা ভিত্তিক ছিল। স্বভাবতই ঈশ্বরের সকল যৌক্তিক ধারণাই ছড়িয়ে গেছে সেসব। কমেন্টারি অন দ্য সং অভ সংস-এ গ্রেগরি অভ নাইসা যেমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন: ‘অনুসন্ধিৎসুর সন্ধানের পথে মনে আঁকড়ে রাখা প্রত্যেকটা ধারণা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ধ্যানীর লক্ষ্য সকল ধারণার উর্ধ্বে যাওয়া তো বটেই, সেই সঙ্গে যেকোনও রকম ইমেজের অতীতে পৌঁছানো, কারণ এগুলো বিক্ষেপের কারণ সৃষ্টি করতে পারে। এরপর একটা বিশেষ উপস্থিতির অনুভূতি অর্জন করবে সে, যা সংজ্ঞাতীত এবং নিঃসন্দেহে অন্য কোনও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের যে অনুভূতি তার অতীত। এই মনোভাবকে বলা হয়েছে ‘হেসিচিয়া প্রশান্তি বা অন্তরের নীরবতা। যেহেতু ভাষা, ধারণা এবং বিভিন্ন ইমেজ আমাদের কেবল জাগতিক বিশ্বে স্থান ও কাল আটকে রাখে, সুতরাং মনকে অবশ্যই মনোনিবেশের কৌশল প্রয়োগ করে স্বেচ্ছায় অটল করতে হয়, যাতে তা অপেক্ষমান নৈঃশব্দ্য গড়ে তুলতে পারে। কেবল তাহলেই এটা এমন এক সত্তার আকাভক্ষা করার আশা করতে পারবে যা এর ধারণার যেকোনও কিছুর উর্ধ্বে।
