নিশ্চয়ই সে তাহাকে* আরেকবার দেখিয়াছিল অন্তবর্তী বদরীয় বৃক্ষের নিকট, যাহার নিকট অবস্থিত বাসোদ্যান।**
যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছাদিত হইবার, তা দ্বারা ছিল আচ্ছাদিত***। তাহার দৃষ্টি বিভ্রম হয় নাই। দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয় নাই। সে তো তাহার প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলী দেখিয়াছিল।
[*রাসুলুল্লাহ (স) দ্বিতীয়বার মিরাজে জিব্রাঈল (আ) কে দেখেছিলেন তাঁর পূর্ণ অবয়বে ষষ্ঠ বা সপ্তম আকাশে কুল গাছের কাছে। সূত্র, পবিত্র কুরআনুল করীম : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।
**অবস্থানের জায়গায়, বেহেশত, মুমিনদের বাসস্থান-বাগানবাড়ি, তাই বাসোদ্যান। সূত্র: পবিত্র কুরআনুল করীম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।
*** কুল গাছ আল্লাহর নূরে আচ্ছাদিত। সূত্র: পবিত্র কুরআনুল করীম, বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন।]
মুহাম্মদ (স) স্বয়ং ঈশ্বরকে দেখেননি, কেবল স্বর্গীয় সত্তাকে নির্দেশকারী প্রতীকসমূহ প্রত্যক্ষ করেছেন। হিন্দু ধর্ম বিশ্বাসে লোত বৃক্ষ যৌক্তিক চিন্তার শেষসীমা নির্দেশ করে। চিন্তা বা ভাষার স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা ঈশ্বর দর্শনের আবেদন সৃষ্টি করার মতো সুযোগ নেই। স্বৰ্গ আরোহন মানবীয় চেতনার দূরতম বিন্দুর প্রতীক, যা পরম অর্থের নৈকট্য নির্দেশ করে।
উর্ধ্বারোহণের ইমেজারি খুব সাধারণ। সেইন্ট অগাস্তিন অস্টিয়ায় মায়ের সঙ্গে ঈশ্বরের নিকট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, প্লটিনাসের ভাষায় যার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি :
স্বয়ং চিরন্তন সত্তার দিকে এক প্রবল আকর্ষণে আমাদের মন উত্থিত হয়েছিল। ধাপের পর ধাপ বেয়ে আমরা সকল সংশ্লিষ্ট বস্তু ও স্বর্গ অতিক্রম করে গেলাম যেখানে সূর্য, চাঁদ ও তারা পৃথিবীতে আলো বিতরণ করে। আরও ওপরে উঠে গেলাম আমরা। মনের ভাবনা ও কথোপকথন এবং আপনার সৃষ্টির বিস্ময়ে আরও উপরে উঠলাম এবং প্রবেশ করলাম আমাদের মনের গভীরে।
অগাস্তিনের মন সাত স্বর্গের সেমেটিক ইমেজের জায়গায় সত্তার অসীম ধারাবাহিকতার গ্রিক ইমেজারিতে পূর্ণ ছিল। এটা মহাশূন্যের কোনও ঈশ্বরের দিকে শূন্যের ভেতর দিয়ে আক্ষরিক অর্থে কোনও অভিযাত্রা ছিল না, বরং ছিল অন্তরের সত্তার দিকে মানসিক আরোহণ। আনন্দময় যাত্রা যেন কোনও কিছু ছাড়াই একটা কিছু দিয়েছে মনে হয় যখন তিনি বলেন, আমাদের মন উত্থিত হয়েছিল যেন মনিকা এবং তিনি আশীর্বাদের নিষ্ক্রিয় গ্রাহক, কিন্তু ‘চিরন্তন সত্তার দিকে ক্রমারোহণে এক ধরনের বিবেচনা রয়েছে। একই রকম কল্পনিক উধ্বরোহণের কথা সাইবেরিয়া হতে তিয়েরা দেল ফুয়েগো পর্যন্ত অঞ্চলের শামানদের ঘোরের অভিজ্ঞতার মাঝে উল্লেখ আছে, জোসেফ ক্যাম্পবেল যেমন বলেছেন।
ঊর্ধ্বরোহণের প্রতীক ইঙ্গিত করে যে, জাগতিক অনুভূতি পেছনে ফেলে আসা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অর্জিত ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা চরমভাবে বর্ণনার অতীত, কেননা স্বাভাবিক ভাষার প্রয়োগ আর চলে না। ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদীরা ঈশ্বর ছাড়া আর সবকিছুরই বিবরণ দেয়। তারা ঈশ্বরের আলখেল্লা, তার প্রাসাদ, স্বর্গীয় দরবার এবং যে আবরণ তাকে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে রাখে যা তার চিরন্তন আদি রূপের প্রকাশ করে, সেসবের কথা বলে। যেসব মুসলিম মুহাম্মদের (স) স্বর্গ অভিমুখে যাত্রা সম্পর্কে ভাবে তারা চূড়ান্ত ঈশ্বর দর্শনের স্ববিরোধী প্রকৃতির গুরুত্ব দিয়ে থাকে: তিনি স্বর্গীয় সত্তাকে দেখেছেন আবার দেখেননি। অতিন্দ্রীয়বাদী যখন নিজের মনের ইমেজারির জগৎ অতিক্রম করে যায়, তখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে ধারণা বা কল্পনা কোনওটিই তাকে আর দূরে নিয়ে যেতে পারে না। অগাস্তিন ও মনিকা উভয়ই তাদের যাত্রার ক্লাইমেক্স সম্পর্কে সংযত, এর স্থান, কাল ও সাধারণ জ্ঞানের উর্ধ্বে অবস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন। তারা ঈশ্বরের জন্যে কথা বলেছেন এবং হাঁপিয়েছেন এবং হৃদয়ের সামগ্রিক একাগ্রতার মুহূর্ত দিয়ে অল্প মাত্রায় একে স্পর্শ করেছেন। তারপর স্বাভাবিক ভাষায় ফিরে আসতে হয়েছে তাদের যেখানে একটি বাক্যের শুরু, মধ্যাংশ ও সমাপ্তি আছে:
সুতরাং আমরা বললাম: যদি কারও জন্যে দেহের কম্পন স্তব্ধ হয়ে গিয়ে থাকে, যদি মাটি, জল ও বাতাসের ইমেজসমূহ স্থির থাকে, যদি স্বৰ্গসমূহ আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়, এবং যদি খোদ আত্মা কোনও শব্দ না করে এবং নিজ সম্পর্কে চিন্তা বাদ দিয়ে একে অতিক্রম করে, যদি কল্পনায় সকল স্বপ্ন আর দৃশ্য বাদ দেওয়া হয়, যদি সকল ভাষা ও ক্ষণস্থায়ী সবকিছু নীরব থাকে-কারণ এরপর যদি কেউ এটা শুনতে পায়, তাহলে এদের সবাই বলবে, “আমরা আমাদের সৃষ্টি করিনি, আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনি যিনি চিরকাল আছেন।’ (শ্লোক ৭৯ : ৩, ৫) …এভাবেই যখন আমরা আমাদের সাধ্য প্রসারিত করলাম তখন মানসিক শক্তির এক ঝলকে সকল সত্তার অতীত চিরকালীন এক প্রজ্ঞা অর্জন করলাম।
এটা কোনও ব্যক্তিক ঈশ্বরের স্বাভাবিক দর্শন ছিল নাঃ বলা যায়, তারা প্রাকৃতিক যোগাযোগের স্বাভাবিক কোনও পদ্ধতিতে সাধারণ কণ্ঠে, দেবদূতের কণ্ঠে, প্রকৃতির মাধ্যমে বা কোনও স্বপ্নের প্রতাঁকে তাঁর কণ্ঠস্বর শোনেননি, তারা সকল সত্তার অতীত বাস্তবতাকে স্পর্শ করেছেন বলে মনে হয়।
