কেউ কেউ একে ঈশ্বরের বর্ণনা হিসাবে দেখেছে: ইহুদিদের প্রজন্মান্তরের আতঙ্ক সত্ত্বেও শিউর কোমাহ এখানে উল্লিখিত ঈশ্বরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পরিমাপ করে গেছে। এই অদ্ভুত টেক্সটে ঈশ্বরের পরিমাপসমূহ হতবৃদ্ধিকর। মন কুলিয়ে উঠতে পারে না। পারাসাং’ (প্রাচীন পারসিয় মাপের একক)-মূল একক-১৮০ ট্রিলিয়ন ‘ফিংগার’-এর সমান এবং প্রতি ‘ফিংগার পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক অপর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সুবিশাল মাত্ৰা মনকে স্তম্ভিত করে দেয় যা আর সামনে বাড়তে পারে না, এমন বিশাল আকারের কোনও কিছু বুঝতে পারে না। এটাই মূল কথা। শিউর কোমাহ আমাদের বলার চেষ্টা করছে যে, ঈশ্বরকে পরিমাপ করা বা মানবীয় পরিভাষায় ধারণ অসম্ভব। তেমন কিছু করার সামান্য প্রয়াসই উদ্যোগের অসম্ভাব্যতা দেখিয়ে দেয় এবং ঈশ্বরের দুয়েতা সম্পর্কে আমাদের নতুন বোধ যোগায়। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, বহু ইহুদিই সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ঈশ্বরকে পরিমাপের বেমানান প্রয়াসকে ব্লাসফেমাস হিসাবে আবিষ্কার করেছে। এ কারণেই শিউরের মতো একটা নিগূঢ় রচনা অসতর্কদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে সঠিক প্রেক্ষিতে শিউর কোমাহ্ আধ্যাত্মিক নির্দেশকের পরিচালনায় সঠিকভাবে অগ্রসর হতে প্রস্তুতি নেওয়া নবীশদের সকল মানবীয় মান ছাড়িয়ে যাওয়া ঈশ্বরের দুজ্ঞেয়তা সম্পর্কে এক নতুন অন্তদৃষ্টি যোগাবে। এটা অবশ্যই আক্ষরিত অর্থে গ্রহণ করার জন্যে বোঝানো হয়নি; নিশ্চিতভাবেই কোনও গোপন তথ্যও জানায় না। এটা স্বেচ্ছায় মনের এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি যা বিস্ময় ও আতঙ্কের একটা বোধ সৃষ্টি করে।
শিউর ঈশ্বরের অতিন্দ্রীয় প্রতিকৃতির দুটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদানের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় যা তিনটি ধর্ম বিশ্বাসেই দেখা যায়। প্রথমত, এটা আবশ্যিকভাবে কল্পনা-নির্ভর; দ্বিতীয়ত, এটা অনির্বচনীয়। শিউর-এ বর্ণিত অবয়ব ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব, অতিন্দ্রীয়বাদীরা যাকে তাদের উধ্বারোহণের শেষ পর্যায়ে সিংহাসনে আসীন অবস্থায় দেখতে পায়। এই ঈশ্বরের মাঝে কোমল, ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত কিছু নেই; প্রকৃতপক্ষে তার পবিত্রতাকে দূরবর্তী মনে হয়। অবশ্য তাকে প্রত্যক্ষ করার পর অতিন্দ্রীয়বাদী গান গেয়ে উঠে যা ঈশ্বর সম্পর্কে খুব সামান্যই জানায় আমাদের, তবে প্রভাব রেখে যায়।
পবিত্রতার গুণ, ক্ষমতার গুণ, এক আতঙ্কময় গুণ, এক শাপময় গুণ, ভয়ের গুণ, এক ভীতির গুণ, এক ত্রাসের গুণ, স্রষ্টা, আদোনাই, ইসরায়েলের ঈশ্বরের পোশাকের গুণ, যিনি মাথায় মুকুট পরে আপন প্রতাপের সিংহাসনে আসেন;
তাঁর পোশাকের ভেতর বাইরে খোদাই করা আর YHwH, YHwH দিয়ে সম্পূর্ণ ঢাকা।
একে ধারণ করার ক্ষমতা কোনও চোখের নেই, সে চোখ রক্ত মাংসের হোক, বা তার দাসদের চোখই হোক।
আমরা ইয়াহ্ওয়েহ্র আলখেল্লা কেমন সেটাই কল্পনা করতে না পারলে ঈশ্বরকে ধারণ করার চিন্তা করব কীভাবে?
পঞ্চম শতাব্দীর সেফার ইয়েহি (দ্য বুক অভ ক্রিয়েশন)ই সম্ভবত প্রাথমিককালের ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদী টেক্সটের ভেতর সবচেয়ে বিখ্যাত। এখানে বাস্তবানুগভাবে ইহুদি সৃজনশীল প্রক্রিয়া বর্ণনার কোনও প্রয়াস নেই; বিবরণ সঙ্কোচহীনভাবে প্রতীকী এবং সেটা দেখায় যে, ঈশ্বর ভাষা দিয়ে বিশ্ব সৃষ্টি করছেন, যেন কোনও গ্রন্থ লিখছিলেন তিনি। কিন্তু ভাষা আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে; সৃষ্টির বাণী আর স্পষ্ট নেই। হিব্রু বর্ণমালার প্রত্যেকটা অক্ষরকে একটা করে সংখ্যা মূল্য দেওয়া হয়েছে: হরফগুলোকে পবিত্র সংখ্যার সঙ্গে সমন্বিত করে অতিন্দ্রীয়বাদী সেগুলোর সীমাহীন বিন্যাসের ভেতর দিয়ে বিশ্বের স্বাভাবিক সুর হতে নিজের মনকে সরিয়ে নেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বুদ্ধিবৃত্তিকে পাশ কাটানো ও ইহুদিদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, কোনও শব্দ বা ধারণা ঈশ্বর নামের বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। আবার ভাষাকে এর শেষ সীমায় ঠেলে দেওয়া ও একে ভাষাবিহীন তাৎপর্য সৃষ্টিতে বাধ্য করায় ঈশ্বরের অনন্যতার একটা অনুভূতি সৃষ্টি হতো। সহানুভূতিশীল বন্ধু ও পিতা হিসাবে নয় বরং এক অদম্য পবিত্র রূপ হিসাবে দেখা ঈশ্বরের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনে লিপ্ত হতে চায়নি অতিন্দ্রীয়বাদীরা ।
থ্রোন মিস্টিসিজম অন্যন্য কোনও ব্যাপার ছিল না। পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) আরব থেকে জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্টে রাত্রি যাত্রা করার সময়ও ঠিক একই রকম অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন বলে বর্ণিত আছে। ঘুমন্ত অবস্থায় জিব্রাইল কর্তৃক স্বর্গীয় ঘোড়ায় করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে। টেম্পল মাউন্টে পৌঁছানোর পর আব্রাহাম, মোজেস, জেসাস ও অন্য পয়গম্বররা তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। মুহাম্মদকে (স) তাঁর পয়গম্বরত্বের জীবনের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। এরপর জিব্রাইল ও মুহাম্মদ (স) সাত স্বর্গের ভেতর দিয়ে একটা মই (মিরাজ) বেয়ে বিপদ সঙ্কুল ঊর্ধ্বারোহণ শুরু করেন, যার প্রতিটির দায়িত্বে ছিলেন একজন করে পয়গম্বর। অবশেষে স্বর্গীয় বলয়ে পৌঁছান মুহাম্মদ (স)। প্রাথমিক সূত্রগুলো সশ্রদ্ধভাবে চূড়ান্ত দর্শন সম্পর্কে নীরবতা বজায় রেখেছে, কোরানের নিচে উল্লেখ করা পঙক্তিগুলোয় ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয় :
