পৌরাণিক সাতটি স্বর্গের রাজ্য দিয়ে অতিন্দ্রীয়বাদীকে ঈশ্বরের আসনের দিকে যাত্রা করতে হতো। কিন্তু সম্পূর্ণই কাল্পনিক যাত্রা ছিল সেটা। একে কখনও আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা হয়নি, বরং মনের রহস্যময় অঞ্চলে প্রতীকী উর্ধ্বারোহণ হিসাবে দেখা হয়েছে। র্যাবাই আকিভার ‘খাঁটি মর্মর পাথর সম্পর্কিত সাবধানবাণী সম্ভবত অতিন্দ্রীয়বাদীর কাল্পনিক যাত্রার বিভিন্ন জটিল পর্যায়ে উচ্চারণ করার সাংকেতিক শব্দের প্রতিই ইঙ্গিত করে। এক বিশদ অনুশীলনের অংশ হিসাবে এসব ইমেজ কল্পনা করা হতো। আজকাল আমরা জানি যে অবচেতন মন অসংখ্য ইমেজারিতে পূর্ণ যা স্বপ্ন, দৃষ্টি বিভ্রম ও অস্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক বা মস্তিষ্ক বিকৃতি, যেমন মৃগী রোগ বা সেযোফ্রেনিয়ার সময় প্রকাশ পায়। ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদীরা সত্যি সত্যি আকাশের ভেতর দিয়ে ওড়া বা ঈশ্বরের প্রাসাদে প্রবেশের কথা কল্পনা করেনি, বরং এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল উপায়ে তাদের মনে জেগে ওঠা ধর্মীয় ইমেজকে বিন্যস্ত করছিল। এর জন্যে চরম দক্ষতা ও নির্দিষ্ট মাত্রার মেজাজ ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল। জেন (Zen) বা যোগ অনুশীলনের মতো এখানেও একই রকম মনোসংযোগের প্রয়োজন, শিক্ষাব্রতাঁকে যা মনের গোলকধাঁধার মতো পথে সঠিকভাবে অগ্রগর হতেও সাহায্য করে। বাবিলনিয় সাধু হাই গাওন (৯৩৯ ১০৩৮) তুলনামূলক অতিন্দ্রীয়বাদী চর্চার সাহায্যে চার জন সাধুর কাহিনীর ব্যাখ্যা করেছেন: উদ্যান ঈশ্বরের প্রাসাদের স্বর্গীয় কক্ষসমূহে’ (bekhalot) আত্মার অতিন্দ্রীয়বাদী আরোহণের কথা বোঝায়। ঈশ্বর যাত্রায় আগ্রহী যে কাউকে অবশ্যই উপযুক্ত এবং বিশেষ গুনে গুনান্বিত হতে হবে, যদি সে ‘স্বর্গীয় রথের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে চায় এবং স্বর্গের ঊর্ধ্বের যেবেদূতদের দরবার দেখতে চায়। এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটবে না। তাকে এমন নির্দিষ্ট কিছু অনুশীলন করতে হবে যা সারা বিশ্বের যোগি ও ধ্যানীদের অনুশীলনের অনুরূপ:
তাকে অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু দিন উপবাস পালন করতে হবে, অবশ্যই দুহাঁটুর মাঝখানে মাথা রেখে মাটির দিকে মুখ করে আপনমনে নিচু কণ্ঠে ঈশ্বরের প্রশংসাসূচক বিভিন্ন শব্দ উচ্চারণ করতে হবে। এর ফল হিসাবে সে আপন হৃদয়ের অন্তস্তলে দৃষ্টি দিতে পারবে, তার মনে হবে যেন নিজ চোখে সে সাতটি দরবার দেখতে পাচ্ছে, দরবার হতে দরবারে ঘুরে বেড়াচ্ছে ও সেখানে যা কিছু আছে দেখছে।
যদিও এই ‘থ্রোন মিস্টিসিজম’-এর সবচেয়ে প্রাচীন টেক্সটের সময়কাল দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দী বলে বিরোচিত, কিন্তু এই ধরনের ধ্যান-কৌশল সম্ভবত আরও প্রাচীন। এভাবে সেইন্ট পল ‘মেসায়াহর অধীন’ এক বন্ধুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন, যিনি মোটামুটি চৌদ্দ বছর আগে তৃতীয় স্বর্গ পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিলেন। এই দিব্য দর্শনকে ব্যাখ্যা করার উপায় বুঝতে পারেননি সেইন্ট পল, কিন্তু বিশ্বাস করেছেন যে, ঐ ব্যক্তি স্বর্গে আটকা পড়েছিলেন আর এমন কিছু শুনেছেন যা মানবীয় ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না এবং করা সম্ভব নয়।
দিব্যদর্শনগুলোই শেষ কথা নয় বরং এক অনির্বচনীয় ধর্মীয় অনুভূতির উপায় যা স্বাভাবিক ধারণাকে অতিক্রম করে যায়। এখনও অতিন্দ্রীয়বাদী নির্দিষ্ট ধর্মীয় ঐতিহ্যের মাধ্যমে একজন ইহুদি দিব্যদ্রষ্টা সপ্ত-স্বর্গের দৃশ্য দেখবে, কারণ তার ধর্মীয় কল্পনার রাজ্য এসব বিশেষ প্রতাঁকে পরিপূর্ণ। বৌদ্ধরা বুদ্ধ এবং বোধিসত্তাদের নানা রকম প্রতিরূপ দেখে; ক্রিশ্চানরা দেখে ভার্জিন মেরিকে। এসব মানসিক অপচ্ছায়াগুলোকে বস্তুগত বা দুয়ে প্রতাঁকের অতিরিক্ত কিছু হিসাবে দেখা দিব্যদ্রষ্টার পক্ষে ভুল হবে। দৃষ্টিবিভ্রম যেহেতু অস্বাভাবিক অবস্থা, তাই গভীর ধ্যান ও আত্মবিশ্লেষণের সময় আবির্ভূত প্রতীকসমূহকে সামাল দেওয়া ও ব্যাখ্যা করার জন্যে বিশেষ ক্ষমতা ও মানসিক ভারসাম্য দরকার।
এইসব প্রাথমিক ইহুদি দিব্যদর্শনের সবচেয়ে বিচিত্র এবং সর্বাধিক বিতর্কিতটির দেখা মেলে পঞ্চম শতাব্দীর টেক্সট শিউর কোমাহয় (The Measurement of the Height) যেখানে ঈশ্বরের আসনে ইযেকিয়েলের দেখা অবয়বের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। শিউর কোমাহ এই সত্তাকে ইয়াতযরেন। আমাদের স্রষ্টা বলছে। এই ঈশ্বর দর্শনের অদ্ভুত বিবরণ সম্ভবত র্যাবাই আকিভার সবচেয়ে প্রিয় বাইবেলিয় টেক্সট সং অভ সংস-এর একটি অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে রচিত। নববধু তার প্রেমিকের বর্ণনা দিচ্ছে:
আমার প্রিয়তম শ্বেত ও রক্তবর্ণ;
তিনি দশ সহস্রের মধ্যে অগ্রগণ্য,
তাহার মস্তক নিৰ্ম্মল সুবর্ণের ন্যায়,
তাহার কেশপাশ কুঞ্চিত ও দাঁড়কাকের ন্যায় কৃষ্ণবর্ণ ।
তাহার নয়নযুগল জলপ্রণালীর তীরস্থ
কপোত যুগলের ন্যায়,
যাহারা দুধ্যে মাত ও পয়ঃপূর্ণ স্থানে উপবিষ্ট ।
তাঁহার গণ্ডদেশ সুগন্ধি ওষধির চৌকা ও আমোদকারী লতার স্তম্ভস্বরূপ,
তাঁহার ওষ্ঠাধর শোশন পুষ্পের ন্যায়,
দ্রব গন্ধরস ক্ষরণকারী।
তাহার হস্ত বৈদ্যুৰ্য্যমণিতে খচিত সুবর্ণের অঙ্গুরীয় স্বরূপ;
তাঁহার কায় নীলকান্ত মণিতে খচিত গজদন্তময় শিল্পকর্মের ন্যায়।
তাঁহার উরুদ্বয় সুবর্ণ চুঙ্গিতে বসান শ্বেত প্রস্তরময়
স্তম্ভ দ্বয়ের ন্যায়,
তাঁহার দৃশ্য লিবানোনের সদৃশ,
এরস বৃক্ষের ন্যায় উৎকৃষ্ট।
