তারপরেও লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে, হয়তো স্রোত ঘুরছে। ১৯৬০ দশকের দিক থেকে পাশ্চাত্যের জনগণ বিশেষ ধরনের যোগ ও বুদ্ধ ধর্মের মতো ধর্মের বিশেষ সুবিধা বা উপকার সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠতে শুরু করেছে, যেগুলোর অপর্যাপ্ত ঈশ্বরবাদ দুষিত না হওয়ার সুবিধা রয়েছে। ফলে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেশ সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে তা। মিথলজি নিয়ে প্রয়াত আমেরিকান পণ্ডিত জোসেফ ক্যাম্পবেলের রচনাবলী সম্প্রতি কদর পেয়েছে। পশ্চিমে সাম্প্রতিকালের সাইকোঅ্যানালিসেসের প্রতি প্রবল উৎসাহকে অতিন্দ্রীয়বাদের প্রতি এক ধরনের ঝোঁক হিসাবে দেখা যেতে পারে, কারণ এ দুটো বিষয়ের মাঝে আমরা লক্ষণীয় সাদৃশ্য লক্ষ করব। মিথলজিকে প্রায়ই মনের অন্তস্থ অবস্থা ব্যাখ্যা করার উপায় হিসাবে ব্যবহার করা হয়। ফ্রয়েড এবং জাং উভয়ই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তাদের নতুন বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করার জন্যে গ্রিক কাহিনী ঈদিপাস-এর মতো প্রাচীন মিথের সহায়তা নিয়েছেন। পশ্চিমের জনগণ হয়তো জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিখাদ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বদলে একটা বিকল্পের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।
অতিন্দ্রীয়বাদী ধর্ম অনেক প্রত্যক্ষ ও অধিকতর বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্ম বিশ্বাসের চেয়ে দুঃসময়ে বেশি কাজে আসে। অতিন্দ্রীয়বাদ অনুশীলন শিক্ষার্থীকে আদি সূচনা দ্য ওয়ানের দিকে প্রত্যাবর্তনে ও স্বর্গীয় সত্তার অব্যাহত বোধ জাগাতে সাহায্য করে। কিন্তু তারপরেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে গড়ে ওঠা প্রাথমিক ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদ ইহুদিদের পক্ষেও বেশ কঠিন ছিল, ঈশ্বর ও মানুষের মাঝে ব্যবধানের দিকেই যেন জোর দিয়েছিল তা। ইহুদিরা যে পৃথিবীতে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে সেখান থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে আরও শক্তিশালী স্বর্গীয় জগতে যেতে চেয়েছিল। ঈশ্বরকে এক পরাক্রমশালী রাজা হিসেবে দেখেছে তারা। সপ্তম আকাশে বিপদসঙ্কুল যাত্রার ভেতর দিয়েই কেবল যার দিকে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। র্যাবাইদের সহজ প্রত্যক্ষ কৌশল ব্যবহারের বদলে নিজেদের প্রকাশ করার জন্যে অতিন্দ্রীয়বাদীরা সুললিত অলঙ্কারিক ভাষা ব্যবহার করেছে। র্যাবাইরা এই আধ্যাত্মিকতাকে ঘৃণা করেছেন ও অতিন্দ্রীয়বাদীরা র্যাবাইদের বৈরী না করে তোলার ব্যাপারে উদগ্রীব ছিল। তবুও এই থ্রোন মিস্টিসিজম’, যেভাবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে, নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কোনও চাহিদা মিটিয়েছিল, কারণ দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শেষ পর্যন্ত নতুন ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদের কাব্বালাহর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে মহান । র্যাবাইনিয় একাডেমিগুলোর পাশাপাশি এর বিকাশ অব্যাহত ছিল। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে বাবিলনে সম্পাদিত থ্রোন মিস্টিসিজমের ক্লাসিক বিবরণ বোঝায়, নিজেদের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে সংযত অতিন্দ্রীয়বাদীরা র্যাবাইদের বিবরণের সঙ্গে জোরাল নৈকট্য অনুভব করত, যেহেতু তারাও র্যাবাই আকিভা, র্যাবাই ইশমায়েল ও র্যাবাই ইয়োহান্নানের মতো মহান তান্নাইমদের আধ্যাত্মিকতার গুরু বানিয়েছে। আপন জাতির পক্ষে ঈশ্বরমুখী এক নতুন পথ নির্মাণে ইহুদি চেতনার নতুন চরম পন্থা বের করেছিলেন তাঁরা।
আমরা যেমন দেখেছি, র্যাবাইদের বেশ উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় অভিজ্ঞতা। ছিল। র্যাবাই ইয়োহান্নান ও তার অনুসারীদের ওপর অগ্নিরূপে স্বর্গ থেকে। পবিত্র আত্মা অবতীর্ণ হওয়ার মুহূর্তে স্পষ্টতই তারা ইযেকিয়েলের ঈশ্বরের রথের অদ্ভুত দিব্যদর্শনের অর্থ নিয়ে আলোচনায় মগ্ন ছিলেন। রথ ও সিংহাসনে আসীন যে অবয়বকে ইযেকিয়ে দেখেছিলেন সেটাই যেন প্রাথমিককালের নিগূঢ় ভাবনা বা অনুমানের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রথ সম্পর্কিত গবেষণাকে (Ma’aseh Markavah) প্রায়ই সৃষ্টির কাহিনীর (Ma’aseh Bereskit) সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। সর্বোচ্চ স্বর্গে অবস্থিত ঈশ্বরের সিংহাসনে পৌঁছার অতিন্দ্রীয়বাদী অভিজ্ঞতার প্রাচীন যে বিবরণ আমরা পাই সেখানে এই আধ্যাত্মিক যাত্রার অপরিসীম বিপদের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে:
র্যাবাইগণ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন: চারজন এক উদ্যানে প্রবেশ করলেন এবং এঁরা হলেন: বেন আযযাই, বেন যোমা, আহের এবং র্যাবাই আকিতা । র্যাবাই আকি তাদের বললেন: “আপনারা খাঁটি মর্মর পাথরের কাছে পৌঁছে “পানি পানি!” বলে চিৎকার করবেন না, কারণ বলা হয়: যে। ব্যক্তি অসত্য উচ্চারণ করে সে আমার দৃষ্টির সামনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না।’ ‘ৰেন আযযাই তাকালেন এবং প্রাণ হারালেন। ঐশীগ্রন্থ তাঁর সম্পর্কে বলছে: ‘প্রভুর দর্শন লাভের পর মৃত্যু সাধুদের জন্যে অপরিসীম মূল্যবান। বেন যোমা তাকালেন এবং আঘাত পেলেন। ঐশীগ্রন্থ তাঁর সম্পর্কে বলছে: ‘তুমি কী মধু পেয়েছ? তোমার যতটা প্রয়োজন খেয়ে নাও, কিন্তু বেশি খেয়ে বমি করো না।’ আহের ধারা বন্ধ করে দিলেন [অর্থাৎ ধর্মদ্রোহী হয়ে গেলেন। বাবাই আকি শান্তিতে বিদায় নিলেন।
একমাত্র র্যাবাই আকিভাই অতিন্দ্রীয়বাদী পথে কোনও রকম ক্ষতির শিকার না হয়ে রক্ষা পেয়েছেন। মনের গভীরতম প্রদেশে অভিযাত্রায় অনেক বড় ধরণের ব্যক্তিগত ঝুঁকি জড়িত, কারণ ওখানে আমরা যার দেখা পাব সেটা সহ্যের অতীত হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণেই সকল ধর্ম অভিজ্ঞতাকে পর্যালোচনা করতে পারবেন, বিপদসঙ্কুল এলাকাসমূহ অতিক্রমে শিক্ষানবীশকে সাহায্য করবেন এবং সে নিজের সাধ্য পেরিয়ে গিয়ে বেন আযযাইয়ের মতো মৃত্যুবরণ বা বেন যোমার মতো পাগল হয়ে যাবেন না, এমন একজন বিশেষজ্ঞের অধীনে অতিন্দ্রীয় যাত্রা শুরু করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অতিন্দ্রীয়বাদীদের সকলেই বুদ্ধিমত্তা ও মানসিক স্থৈর্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। জেন (Zen) গুরুরা বলেন, কোনও মস্তিষ্ক বিকৃত লোকের পক্ষে ধ্যানের মাধ্যমে সুস্থতার সন্ধান করা অর্থহীন, কারণ এতে সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। অতিন্দ্রীয়বাদী হিসাবে সম্মানিত কয়েকজন ইউরোপিয় ক্যাথলিক সেইন্টের অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক আচরণকে অবশ্যই ভ্রান্তি হিসাবে দেখতে হবে। তালমুদিয় সাধুদের এই প্রতীকী কাহিনী দেখায়, ইহুদিরা গোড়া থেকেই বিপদ সম্পর্কে সচেতন ছিল: পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ সাবালক হয়ে ওঠার আগে তরুণদের আর কাব্বালার চর্চায় যোগ দিতে দেয়নি তারা। একজন অতিন্দ্রীয়বাদীকে অবশ্যই বিবাহিত হতে হতো, যৌনজীবনে তার সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্যে।
