তারপরেও ব্যক্তিক ঈশ্বর বিরাট দায়ে পরিণত হতে পারেন। আমাদের নিজস্ব কল্পনায় খোদাই করা তুচ্ছ এক মূর্তি আমাদের সীমাদ্ধ চাহিদা, আতঙ্ক ও আকাঙ্ক্ষারও অভিক্ষেপে পরিণত হতে পারেন তিনি। আমরা ধরে নিতে পারি যে আমরা যা ভালোবাস তিনি তাই ভালোবাসেন এবং আমাদের ঘৃণার বস্তু তারও ঘৃণার বস্তু, সংস্কারের ঊর্ধ্বে ওঠায় বাধ্য করার বদলে সংস্কারের পক্ষে দাঁড় করাতে পারেন। যখন তিনি কোনও দুর্যোগ ঠেকাতে ব্যর্থ হন কিংবা মনে হয় যে বিপদ ঘটানোর ইচ্ছা করছেন, তখন তাকে খুবই শীতল ও নিষ্ঠুর মনে হতে পারে। বিপদ-আপদ ঈশ্বরের ইচ্ছায় ঘটে, এরকম সহজ বিশ্বাস আমাদেরকে মৌলিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বিষয় মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে। ব্যক্তি রূপে ঈশ্বরের লিঙ্গ আছে, এ সত্যটিও তাঁকে সীমাবদ্ধ করে দেয়: এর মানে নারীদের বাদ দিয়ে মানবজাতির অর্ধেকাংশের যৌন পরিচয় পবিত্র রূপ দেওয়া হয়েছে এবং তাতে মানুষের যৌন আচরণে এক ধরনের বিকৃত ও অসম্পূর্ণ ভারসাম্যহীন অবস্থা দেখা দিতে পারে। সুতরাং একজন ব্যক্তিক ঈশ্বর হয়ে উঠতে পারেন বিপজ্জনক। সীমাবদ্ধতা হতে উদ্ধার করার বদলে তিনি আমাদের সেই সীমাবদ্ধতার মাঝেই আত্মতুষ্টির সঙ্গে রয়ে যেতে উৎসাহ যোগাতে পারেন; আমাদের তিনি’ নিষ্ঠুর করে তুলতে পারেন, করতে পারেন শীতল, আত্ম-সন্তুষ্ট ও পক্ষপাতদুষ্ট। যে সহমর্মিতার অনুভূতি সকল উন্নত অগ্রসর ধর্মের বৈশিষ্ট্য হওয়ার কথা, আমাদের মাঝে সেটা জাগিয়ে তোলার বদলে তিনি আমাদের বিচার করতে, নিন্দা জানাতে ও এক পাক্ষিক হতে অনুপ্রাণিত করতে পারেন। সুতরাং, এটা মনে হয় যে ব্যক্তিক ঈশ্বরের ধারণা আমাদের ধর্মীয় অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটা পর্যায় হতে পারে মাত্র। বিশ্বের সকল প্রধান ধর্ম যেন এই বিপদকে শনাক্ত করতে পেরেছে এবং মহান সত্তার ব্যক্তিক ধারণার ঊর্ধ্বে উঠতে চেয়েছে।
পরিমার্জনার ইতিহাস হিসাবে ও পরবর্তীকালে ইয়াহ্ওয়েহ্র গোত্রীয় ও ব্যক্তিক রূপ ত্যাগ করে YHWH হয়ে ওঠার কাহিনী হিসাবেও ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা যেতে পারে। তর্ক সাপেক্ষে একেশ্বরবাদী ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিক ধর্ম বিশ্বাস খৃস্টধর্ম ট্রিনিটির অভিব্যক্তিক মতবাদের সাহায্যে দেহধারী ঈশ্বরের বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পেয়েছে। মুসলিমরা অচিরেই কোরানের যেসব অনুচ্ছেদে ঈশ্বর দেখেন, ‘শোনেন এবং বিচার করেনে’র মতো মানবীয় কাজের কথা বুঝিয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্র সমস্যা আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মই অতিন্দ্রীয়বাদী ধারার জন্ম দিয়েছে যা তাদের ঈশ্বরকে ব্যক্তি পর্যায়ের ঊর্ধ্বে তুলে নির্বাণ ও ব্রহ্ম-আত্মার অনুরূপ নৈর্ব্যক্তিক সত্তায় পরিণত করতে সাহায্য করেছে। খুব নগণ্য সংখ্যক মানুষই প্রকৃত অতিন্দ্রীয়াবাদের চর্চার যোগ্যতা রাখে, কিন্তু তিনটি ধর্ম বিশ্বাসেই (পাশ্চাত্য খৃস্টধর্ম বাদে) অতিন্দ্রীয়বাদের উপলব্ধির ঈশ্বরই অতিসাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত বিশ্বাসীদের মাঝে শেষমেষ আদর্শ বিবেচিত হয়েছে।
ঐতিহাসিক একেশ্বরবাদ আদিতে অতিন্দ্রীয়বাদী ছিল না। আমরা বুদ্ধের মতো ধ্যানী ও পয়গম্বরদের অভিজ্ঞতার পার্থক্য আলোচনা করেছি। ইহুদিবাদ, খৃস্টধর্ম ও ইসলাম আবশ্যিকভাবেই সক্রিয় ধর্ম এবং আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে, স্বর্গের মতোই পৃথিবীতে ঈশ্বরের অভিপ্রায় বাস্তবায়িত হয়েছে। পয়গম্বর আনীত এইসব ধর্মের কেন্দ্রীয় মটিফ হচ্ছে ঈশ্বর ও মানুষের মাঝে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ বা সংঘাত। এই ঈশ্বর কর্মের আদেশ রূপে অনুর্ভুত হন; তিনি আমাদের নিজের দিকে আহ্বান করেন; আমাদেরকে তার ভালোবাসা ও মনোযোগ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার অবকাশ দেন। নীরব ধ্যানের বদলে এই ঈশ্বর সংলাপের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত হন। তিনি এক বাণী উচ্চারণ করেন যা ভক্তির মূলবিন্দুতে পরিণত হয়, যাকে পার্থিব জীবনের ত্রুটিময় ও করুণ অবস্থার সঙ্গে অত্যন্ত কষ্টকর প্রয়াসে বাস্তবায়িত করতে হয়। তিনটি ধর্মের মাঝে সবচেয়ে ব্যক্তিরূপ খৃস্টধর্মে ভালোবাসা দিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ককে বৈশিষ্ট্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু ভালোবাসার শর্ত হলো কিছু মাত্রায় অহমবোধকে বিনাশ করতে হবে। সংলাপ বা ভালোবাসা, উভয়ক্ষেত্রেই অহমবোধ একটা চিরন্তন সম্ভাবনা। খোদ ভাষাই একটা সীমিতকারী বিষয় হতে পারে, যেহেতু এটা আমাদের পার্থিব অভিজ্ঞতার ধ্যান-ধারণায় আমাদের আবদ্ধ রাখে।
পয়গম্বরগণ মিথলজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন: মিথের পবিত্র আদিমকালে নয়, বরং তাদের ঈশ্বর ইতিহাস এবং চলতি ঘটনাপ্রবাহে সক্রিয় ছিলেন। অবশ্য একেশ্বরবাদীরা যখন অতিন্দ্রীয়বাদের শরণাপন্ন হয় তখন মিথলজি ধর্মীয়বোধের প্রধান বাহনের স্থান নতুন করে দখল করে নেয়। মিথ’ (myth), অতিন্দ্রীয়বাদ (mysticism) ও ‘রহস্য’ (mystery) শব্দ তিনটির মাঝে ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে। সবগুলো শব্দই এসেছে গ্রিক ক্রিয়াপদ মাস্তে ইয়ন (musteion) হতে: যার অর্থ মুখ বা চোখ বন্ধ করা। সুতরাং তিনটি শব্দই অন্ধকার ও নৈঃশব্দ্যের অনুভূতির মাঝে প্রোথিত। আজকের পশ্চিমে এগুলো জনপ্রিয় শব্দ নয়। উদাহরণস্বরূপ, মিথ শব্দটি প্রায়শঃ মিথ্যার সমার্থক হিসাবে ব্যবহার করা হয়: চলতি কথায় মিথ হচ্ছে এমন কিছু যা সত্য নয়। কোনও রাজনীতিক বা চিত্রতারকা তাদের নামে রটনা বা সংবাদকে মিথ’ বলে নাকচ করে দেবেন এবং পণ্ডিতগণ অতীত সম্পর্ক ভ্রান্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে পৌরাণিক (mythical) বলে উল্লেখ করবেন। আলোকন পর্বের পর থেকে, ‘রহস্য’কে উদঘাটনযোগ্য বিষয় হিসাবে দেখা হয়েছে। প্রায়শঃ একে স্থবির চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কাহিনীকে বলা হয় ‘রহস্য’ (mystery) এবং এই ঘরানার মূল কথা হচ্ছে সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান বের করা। আমরা দেখব, এমনকি আলোকন পর্বের সময় ধার্মিক ব্যক্তিরা রহস্য’কে বাজে শব্দ হিসাবে দেখতে শুরু করেছিল। একইভাবে অতিন্দ্রীয়বাদকে বাতিক, জোচচুরি বা অসংঙ্গত সুখানুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়। পশ্চিমা জগৎ যেহেতু কখনওই, এমনকি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে এর জোয়ারের সময়ও না, অতিন্দ্রীয়বাদে ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না, সেজন্যে এ ধরনের আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে অপরিহার্য বুদ্ধিমত্তা ও অনুশীলনের ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা এখানে নেই।
