ইউরোপে নতুন অ্যারিস্টটলবাদের সঙ্গে ঈশ্বরকে সম্পর্কিত করার প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফায়লাসুফরাও ঈশ্বরের ধারণাকে সমায়ানুগ রাখার ব্যাপারে উদগ্রীব ছিল যাতে তা অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে পরিণত হতে না পারে। প্রত্যেক প্রজন্মে নতুন করে ঈশ্বরের ধারণা ও বোধ গড়ে তুলতে হয়। অবশ্য অধিকাংশ মুসলিমই-বলা যেতে পারে-পায়ের সাহায্যে ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ঈশ্বর পর্যালোচনায় অ্যারিস্টটলের দেওয়ার মতো কিছু ছিল না, যদিও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো অন্যান্য বলয়ে তাঁর ব্যাপক উপযোগিতা ছিল। আমরা দেখেছি, ঈশ্বরের স্বরূপ সম্পর্কিত অ্যারিস্টটলের আলোচনাকে তাঁর রচনাবলীর সম্পাদকবৃন্দ neta ta physica ( After the Physics’) আখ্যা দিয়েছিলেন: তাঁর ঈশ্বর ছিলেন স্রেফ ভৌত বাস্তবতার ধারাবাহিকতা মাত্র, একেবারে ভিন্ন মাত্রার কোনও সত্তা নন। সুতরাং মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যতের অধিকাংশ ঈশ্বর সংক্রান্ত আলোচনার ক্ষেত্রে দর্শনের সঙ্গে অতিন্দ্রীয়বাদের মিশেল ঘটানো হয়েছে। আমরা যে সত্তাকে ঈশ্বর বলি কেবল যুক্তি দিয়ে তার ধর্মীয় উপলব্ধিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়, কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতিকে যদি এলোমেলো, অসংযত-বা এমনকি বিপজ্জনক-আবেগে পরিণত না হতে হয়, সমালোচনাসুলভ বুদ্ধিমত্তা এবং দর্শনের চর্চা দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে হয়।
আকুইনাসের ফরাসি সমসাময়িক বোনাভেঞ্চার (১২১৭-৭৪)-এরও মোটামুটি একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তিনিও উভয় ক্ষেত্রের উন্নতির সুবিধার লক্ষ্যে দর্শনকে ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেশানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন। দ্য থ্রিফোল্ড ওয়ে-তে তিনি অগাস্তিনের অনুসরণে সৃষ্টির সর্বত্র ‘ট্রিনিটি’ প্রত্যক্ষ করেছেন ও তাঁর ‘দ্য জার্নি অভ দ্য মাইন্ড টু গড-এর সূচনা-বিন্দু হিসাবে এই প্রাকৃতিক ত্রিত্ববাদকে গ্রহণ করেছেন। তিনি প্রকৃতই বিশ্বাস করতেন যে, কেবল প্রাকৃতিক যুক্তি দিয়েই ট্রিনিটি প্রমাণ করা সম্ভব, কিন্তু ঈশ্বরের ধারণার ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক অনুভূতির গুরুত্বকে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসাবে জোর দিয়ে যুক্তিভিত্তিক অন্ধত্বের বিপদ এড়িয়ে গেছেন। তিনি ক্রিশ্চানের জীবনের আদর্শ হিসাবে তাঁর মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ফ্রান্সিস অভ অসিসিকে বেছে নিয়েছেন। তার জীবনের ঘটনাবলীর পর্যালোচনা করার মাধ্যমে তার মতো একজন ধর্মবিদ চার্চের মতবাদসমূহের প্রমাণ খুঁজে পেতে পারেন। তুসানের কবি দান্তে আলিগেরি (১২৬৫-১৩২২) দেখেছিলেন যে কোনও একজন সতীর্থ মানব সন্তান দান্তের ক্ষেত্রে ফ্লোরেন্স বিয়েত্রিস পোতিনারি ঈশ্বরের এপিফ্যানি হতে পারে। ঈশ্বর সম্পর্কে এই ব্যক্তিরূপ মনোভাব সেইন্ট অগাস্তিনকে মনে করিয়ে দেয়।
ফ্রান্সিসকে এপিফ্যানি হিসাবে উপস্থাপনের আলোচনায় বোনাভেঞ্চার ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে আনসেন্সের তাত্ত্বিক প্রমাণ ব্যবহার করেছেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, ফ্রান্সিস জীবনে এমন সাফল্য অর্জন করেছেন যাকে মানবীয়র চেয়ে বেশি কিছু মনে হয়, সুতরাং এই মতে বসবাস করেও আমাদের পক্ষে যার চেয়ে শ্রেয়তর আর কিছু কল্পনা করা যায় না তাই “শ্রেষ্ঠ হচ্ছে সেটা দেখা ও বোঝা। আমরা যে শ্রেষ্ঠ’-এর মতো একটা ধারণা করতে পারি সেটাই প্রমাণ করে, এটা অবশ্যই ঈশ্বরে সর্বোত্তম পরিপূর্ণতায় অস্তি তৃমান। প্লেটো ও অগাস্তিনের পরামর্শ মতো নিজেদের মাঝে প্রবেশ করলে আমরা আমাদের নিজস্ব অন্তর্জগতে’৩৮ ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব দেখতে পাব। এই অন্তক্ষেপ আবশ্যক। চার্চের শাস্ত্রাচারে অংশ নেওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একজন ক্রিশ্চানকে আগে নিজের সত্তার গভীরে ডুব দিতে হবে, সেখানে সে বুদ্ধিমত্তার ঊর্ধ্বে এক পরমান্দের দেখা পাবে ও আমাদের সীমিত মানবীয় ধারণার অতীত ঈশ্বরের দর্শন পাবে।
বোনাভেঞ্চার ও আকুইনাস উভয়ই ধর্মীয় অনুভূতিকে মুখ্য হিসাবে দেখেছেন। তারা ফালসাফাহর ঐতিহ্যে আস্থাশীল ছিলেন, কেননা ইহুদিধর্ম . এবং ইসলাম, এ দুই ধর্মেই দার্শনিককে প্রায়শঃই অতিন্দ্রীয়বাদী হাত দেখা গেছে, যারা ধর্মতত্ত্বীয় বিষয়ে বুদ্ধিমত্তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে প্রবলভাবে সচেতন ছিলেন। বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস খাপ খাওয়াতে তারা ঈশ্বরের অস্তিত্বের যৌক্তিক প্রমাণ খাড়া করেছেন, অন্যান্য সাধারণ অভিজ্ঞতার সঙ্গেও একে যুক্ত করতে চেয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে তারা সন্দিহান ছিলেন না। অনেকেই তাদের সাফল্যের সীমাবদ্ধতার বিষয়ে যথাযথভাবে সজাগও ছিলেন। অবিশ্বাসীদের বোঝনোর উদ্দেশ্যে এসব প্রমাণ খাড়া করা হয়নি, কেননা তখনও আমাদের আধুনিক অর্থে নাস্তিকের অস্তিত্ব ছিল না। সুতরাং এই প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব ধর্মীয় অনুভূতির পূর্বশর্ত ছিল না, বরং ছিল সহগামী: ফায়লাসুফরা এটা মনে করত যে অতিন্দ্রীয় অভিজ্ঞতা অর্জনের আগে আপনাকে যৌক্তিকভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে, বরং ব্যাপারটা একেবারে উল্টো। ইহুদি, মুসলিম ও গ্রিক অর্থডক্স জগতে দার্শনিকদের ঈশ্বরকে খুব দ্রুত অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বর অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন।
০৭. অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বর
ইহুদিবাদ, খৃস্টধর্ম এবং-কিছুটা সীমিত পরিসরে-ইসলাম, সকল ধর্মই ব্যক্তিক ঈশ্বরের ধারণা গড়ে তুলেছে; সুতরাং আমরা একথা ভাবতে পারি যে, এই আদর্শই ধর্মকে সবচেয়ে চমৎকারভাবে তুলে ধরে। ব্যক্তিক ঈশ্বর একেশ্বরবাদীদের ব্যক্তির পবিত্র ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারসমূহকে মূল্য দিতে এবং মানুষের ব্যক্তিত্বের উপলব্ধি অর্জনে সাহায্য করেছে। এভাবে জুদো-ক্রিশ্চান ঐতিহ্য পশ্চিমকে উদারবাদী মানবতাবাদের আদর্শ অর্জনে সাহায্য করেছে, যেটাকে তারা এত গুরুত্ব দেয়। এসব মূল্যবোধ আদিতে একজন ব্যক্তিক ঈশ্বরের মাঝে আরোপ করা হয়েছিল, যিনি মানুষ যা যা করে তার সবই করে থাকেন তিনি আমাদের মতো ভালোবাসেন, বিচার করেন, শাস্তি দেন, দেখেন, শোনেন, সৃজন করেন ও ধ্বংস করেন। ইয়াহ্ওয়েহ্র শুরু হয়েছিল মানুষের মতো প্রবল পছন্দ-অপছন্দ সংবলিত ব্যক্তিরূপ উপাস্য হিসাবে। পরে দুজ্ঞেয় সত্তার প্রতাঁকে পরিণত হন তিনি, যার চিন্তা আমাদের চিন্তা ছিল না এবং যার পথ আমাদের পথ থেকে অনেক উর্ধ্বে, যেমন স্বর্গ পৃথিবীর চেয়ে দূরে। ব্যক্তি ঈশ্বরের ধারণা এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দর্শন প্রকাশ করে কোনও চরম মূল্যবোধ মানুষের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হতে পারে না। এভাবে ব্যক্তিবাদ ধর্মীয় ও নৈতিক উন্নতির জন্যে গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেকের ক্ষেত্রেই অপরিহার্য পর্যায় হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। ইসরায়েলের পয়গম্বরগণ তাদের নিজস্ব আবেগ ও কামনা বাসনা ঈশ্বরে আরোপ করেছিলেন; বৌদ্ধ এবং হিন্দুদের সর্বোত্তম সত্তায় ভক্তি দেখাতে অবতারদের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়েছে। খৃস্টধর্ম একজন ব্যক্তিকে এমনভাবে ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করেছে ধর্মের ইতিহাসে যা নজিরবিহীন: এটা ইহুদিবাদের সহজাত ব্যক্তিবাদকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এমন হতে পারে যে, এ ধরনের মিশ্রণ ও একাত্ম হওয়ার একটা মাত্রা ছাড়া হয়তো ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
