পশ্চিমের খৃস্টবাদে খুব কম ব্যক্তিই তোমাস আকুইনাসের (১২২৫ ৭৪) মতো এত দীর্ঘস্থায়ী অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সেইন্ট অগাস্তিনের মতবাদের সঙ্গে পশ্চিমে সম্প্রতি আগত গ্রিক দর্শনের সংশ্লেষ ঘটানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে ইউরোপিয় পণ্ডিতগণ স্পেনে ভিড় জমিয়েছিলেন, এখানে মুসলিম পণ্ডিতদের সংস্পর্শে আসেন। তাঁরা। মুসলিম ও ইহুদি বুদ্ধিজীবীদের সহায়তায় এই মেধা-সম্পদকে পশ্চিমে পরিচিত করে তোলার উদ্দেশ্যে এক ব্যাপক অনুবাদ প্রকল্পে হাত দেন তারা। প্লেটো, অ্যারিস্টটল এবং প্রাচীন বিশ্বের অন্যান্য দার্শনিকদের আরবী ভাষায় প্রাপ্য অনুবাদ এবার লাতিনে অনূদিত হয়ে প্রথমবারের মতো উত্তর ইউরোপের জনগণের নাগালের মধ্যে চলে আসে। অনুবাদকগণ ইবন রূশদ ও সাম্প্রতিক মুসলিম পণ্ডিতদের রচনাবলীসহ অপরাপর আরব বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের আবিষ্কার তাঁদের প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। একই সময়ে কিছু ইউরোপিয় ক্রিশ্চান নিকট প্রাচ্যে যখন ইসলামকে ধ্বংস করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছিল, তখন স্পেনের মুসলিমরা পশ্চিমকে আপন সভ্যতা গড়ে তুলতে সাহায্য করছিল। তোমাস আকুইনাসের সাম্মা থিওলজিয়া ছিল নতুন দর্শনকে পশ্চিমের ক্রিস্টান ধর্মের সঙ্গে সমন্বিত করার প্রয়াস। আকুইনাস বিশেষভাবে ইবন রূশদের অ্যারিস্টটলের প্রয়োগে অভিভূত হয়েছিলেন। তথাপি আনসেন্স ও আবেলার্দের বিপরীতে তিনি ট্রিনিটি রহস্যগুলো যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করেননি। তিনি সযত্নে ঈশ্বরের অনির্বচনীয়তা ও তার সম্পর্কিত মানবীয় মতবাদসমূহের মাঝে পার্থক্য টেনেছেন। ঈশ্বরের প্রকৃত রূপ যে মানব মনের অগম্য, ডেনিসের এ ধারণার সঙ্গে তিনি একমত প্রকাশ করেছেন: ‘সুতরাং শেষ পর্যন্ত ঈশ্বর সম্পর্কে মানুষ যা জানে সেটা হলো সে তাঁকে চেনে না এটা জানা, কেননা সে জানে ঈশ্বর আমরা তাঁর সম্পর্কে যতটা বুঝতে পারি তাকে ছাপিয়ে যান।৩৫ একটা গল্প প্রচলিত আছে যে, সাম্মার শেষ বাক্যের তিনি শ্রুতিলেখার সময় আকুইনাস বিষণ্ণতার সঙ্গে হাতের ওপর মাথা এলিয়ে দিয়েছিলেন। শ্রুতিলেখক যখন ব্যাপার কী জানতে চাইল, তিনি জবাব দিয়েছিলেন, তিনি যা কিছু দেখেছেন তার তুলনায় শ্রুতিলেখকের লিখিত অংশটি খড়কুটো মাত্র।
নতুন দর্শনের প্রেক্ষাপটে নিজের ধর্মীয় অনুভূতিকে স্থাপন করার আকুইনাসের প্রয়াস অন্যান্য বাস্তবতার সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্যে প্রয়োজন ছিল, একে নিজস্ব বলয়ে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পর্যবসিত করা নয়। বুদ্ধিবৃত্তির অতিপ্রয়োগ ধর্মবিশ্বাসের পক্ষে ক্ষতিকর, কিন্তু ঈশ্বরকে যদি আমাদের নিজস্ব অহমবোধের ইচ্ছা পূরণের প্রকাশ হতে না হয়, তাহলে ধর্মীয় অনুভূতিকে অবশ্যই এর বিষয়বস্তুর সঠিক মূল্য নির্ধারণ দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে হবে। আকুইনাস মোজেসকে দেওয়া স্বয়ং ঈশ্বরের সংজ্ঞার শরণাপন্ন হয়ে ঈশ্বরকে সংজ্ঞায়িত করেছেন: ‘আমি যা আমি তাই। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন ঈশ্বর প্রয়োজনীয় সত্তা’; আকুইনাস যথারীতি দার্শনিকদের ঈশ্বরের সঙ্গে বাইবেলের ঈশ্বরকে তিনি যিনি আছেন বলে সম্পর্কিত করেছিলেন। তিনি অবশ্য এটা পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন যে, ঈশ্বর আমাদের মতো স্রেফ আরেকটি সত্তা নন। স্বয়ং সত্তা হিসাবে ঈশ্বরের সংজ্ঞা যথাযথ, কারণ এটা (সত্তার) কোনও নিশেষ ধরণকে তুলে ধরে না, বরং স্বয়ং সত্তাকেই বোঝায় (esse seipsum)।[৩৬] পরবর্তীকালে পশ্চিমে গড়ে ওঠা ঈশ্বরের যুক্তিভিত্তিক ধারণার জন্যে আকুইনাসকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না।
অবশ্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে আকুইনাস সাধারণ দর্শন হতে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ দিয়ে আলোচনা শুরু করার মাধ্যমে ঈশ্বরকে অন্যান্য দার্শনিক ধ্যান ধারণা বা প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর মতো আলোচনা করা যেতে পারে বলে ধারণা দিয়েছেন। এটা বোঝায় যে অন্যান্য জাগতিক বাস্তবতার মতো করেই আমরা ঈশ্বরকে চিনতে পারি। আকুইনাস ঈশ্বরের অস্তিত্বের পাঁচটি প্রমাণ’ লিপিবদ্ধ করেছেন, যেগুলো পরে ক্যাথলিক বিশ্বে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে ও প্রটেস্ট্যান্টরাও এর প্রয়োগ করবে:
১. প্রাইম মুভারের সপক্ষে অ্যারিস্টটলের যুক্তি। ২. একই ধরনের আরেকটা প্রমাণ,’ যেখানে বলা হয়েছে সীমাহীন কারণ থাকতে পারে না! একটা সুচনা থাকতে বাধ্য। ৩. ইবন সিনার প্রস্তাবিত অনিশ্চয়তার যুক্তি যেখানে একটা প্রয়োজনীয় সত্তা’র অস্তিত্ব দাবি করা হয়েছে। ৪. অ্যারিস্টটলের ফিলোসফি হতে যুক্তি, যেখানে বলা হয়েছে এই বিশ্বের ক্রমোন্নত ধারা এক সর্বোত্তম সম্পূর্ণতা বোঝায়। ৫. পরিকল্পনা হতে নেওয়া যুক্তি, যেখানে বলা হয়েছে মহাবিশ্বে আমাদের প্রত্যক্ষ করা নিয়ম আকস্মিক ঘটনাচক্রের ফল হতে পারে না।
আজকের দিনে এসব প্রমাণ ধোপে টেকে না। এমনকি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এগুলো সন্দেহজনক, যেহেতু পরিকল্পনায় যুক্তির ব্যতিক্রম বাদে প্রত্যেকটা প্রমাণই পরোক্ষে বোঝায় যে ঈশ্বর’ স্রেফ আর-একটি-সত্তা, অস্তিত্বের ধারায় আরও একটি সংযোগ। তিনি সর্বোচ্চ সত্তা’, ‘প্রয়োজনীয়। সত্তা, ‘সবচেয়ে নিখুঁত সত্তা। এখন এটা ঠিক ‘আদি কারণ’ বা ‘প্রয়োজনীয় সত্তা’র মতো পরিভাষাগুলো বোঝায় যে, ঈশ্বর আমাদের চেনা-জানা সত্তাসমূহের মতো হতে পারেন না, বরং তাদের অস্তিত্বের ভিত্তি বা শর্ত। নিঃসন্দেহে এটাই আকুইনাসের উদ্দেশ্য ছিল। তা সত্ত্বেও সাম্মা’র পাঠকগণ সবসময় এই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টানেননি এবং ঈশ্বর প্রসঙ্গে এমনভাবে আলোচনা করেছেন যেন তিনি সকল সত্তার সর্বোত্তম’। এটা হাস্যকর এবং মহাসত্তাকে আমাদের প্রতিমূর্তিতে নির্মিত মূর্তিতে পরিণত করতে পারে, সহজেই রূপান্তরিত করতে পারে স্বর্গীয় মহা অহমে। এটা বলা হয়তো ভুল হবে না যে পশ্চিমে অনেকেই ঈশ্বরকে এভাবে একটি ‘সত্তা’ হিসাবে দেখে ।
