সুতরাং আনলোসের ঈশ্বর ছিলেন ‘সত্তা, ডেনিস ও এরিজেনা বর্ণিত ‘কিছু না’ নন। অতীতের যে কোনও ফায়লাসুফের তুলানায় আনসেল্ম অনেক বেশি ইতিবাচক ভাষায় ঈশ্বর সংক্রান্ত আলোচনায় আগ্রহী ছিলেন। তিনি Via Negativa অনুশীলনের প্রস্তাব করেননি, বরং সম্ভবত স্বাভাবিক যুক্তি দিয়েই ঈশ্বর সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা লাভ করা সম্ভব বলে ভেবেছিলেন । পশ্চিমের ধর্মতত্ত্বের ঠিক এ জিনিসটাই গ্রিকদের সবসময় দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে। আপন সন্তষ্টি মোতাবেক ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করার পর আনল্মেস অবতারবাদ ও ট্রিনিটির মতবাদসমূহ প্রমাণে মনোযোগি হন। গ্রিকরা সবসময় যেগুলোকে জোর দিয়ে যুক্তি ও ধারণাগুলোর অতীত দাবি করেছে। হোয়াই গড বিকেম ম্যান শীর্ষক নিবন্ধে, চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা যার আলোচনা করেছি, তিনি প্রত্যাদেশের চেয়ে যুক্তি ও যৌক্তিক চিন্তার ওপর বেশি নির্ভর করেছেন–আমরা দেখেছি, তার দেওয়া বাইবেল ও ফাদারদের উদ্ধৃতিগুলোকে যুক্তির ধারার প্রেক্ষিতে পুরো প্রাসঙ্গিক মনে হয়, যা ঈশ্বরে মানবীয় অনুপ্রেরণা যোগ করেছে। যৌক্তিক ভিত্তিতে ঈশ্বরের রহস্য ব্যাখ্যার প্রয়াস একা আনসেল্মই নেননি। তাঁর সমসাময়িক প্যারিসের ক্যারিশম্যাটিক দার্শনিক পিটার আবেলার্দ (১০৭৯-১১৪৭) ট্রিনিটির একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন যেখানে তিন ব্যক্তির পার্থক্য সৃষ্টি করে স্বর্গীয় একত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রায়শ্চিত্তের রহস্যেরও একটা বিশেষ এবং আবেগময় যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি আমাদের মাঝে সমবেদনা জাগিয়ে তোলার জন্যে ক্রাইস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়েছে; এভাবেই তিনি পরিণত হয়েছেন ত্রাণকর্তায়।
আবেলার্দ অবশ্য প্রধানত দার্শনিক ছিলেন। তাঁর ধর্মতত্ত্ব মোটামুটিভাবে গতানুগতিক। দ্বাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন তিনি, প্রচুর অনুসারী পেয়েছিলেন। এতে করে বারগান্ডির ক্যারিশমাটি অ্যাবট বার্নার্ড সিস্টেরসিয়ান অ্যাবি অভ ক্লেয়ারভার সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়। তিনি তখন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসাবে কথিত ছিলেন। পোপ দ্বিতীয় ইউজিন এবং ফ্রান্সের রাজা সপ্তম লুইস দুজনই ছিলেন বার্নার্ডের পকেটে; তার অসাধারণ বাগ্মীতা ইউরোপে সন্ত বিপ্লবের সূচনা করেছিল: অগুনতি ক্রিশ্চান যুবা সিস্টারসিয়ান মতবাদে দীক্ষা নিতে ঘরবাড়ি ছেড়ে তাঁর দলে যোগ দিয়েছে। সিস্টারসিয়ান মতবাদ পুরোনো বেনেডিক্টাইন ধর্মীয় জীবন আচারের ক্লনিয়াক ধরনের সংস্কার চেয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে বার্নার্ড দ্বিতীয় ক্রুসেডের প্রচারণা শুরু করলে ফ্রান্স ও জার্মানীর জনগণ-এর আগে পর্যন্ত যারা অভিযান সম্পর্কে কিছুটা বৈরিভাবাপন্ন ছিল-বলতে গেলে প্রবল উৎসাহে তাঁকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলার যোগাড় করেছিল, এমন বিপুল সংখ্যায় সেনা দলে যোগ দিতে ভিড় করেছিল যে শেষ পর্যন্ত বার্নার্ড আন্তসন্তুষ্টির সঙ্গে পোপকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, গোটা দেশ জনশূন্য বলে মনে হচ্ছে। বুদ্ধিমান ছিলেন বার্নার্ড, বলা যায় পশ্চিম ইউরোপের বাহ্যিক ধর্মপরায়ণতাকে এক নতুন অভ্যন্তরীণ মাত্রা দান করেছিলেন তিনি। সিস্টেরসিয়ান ধর্মানুরাগ হলি গ্রেইলের কিংবদন্তীকে প্রভাবিত করেছিল বলে মনে হয়-এখানে এক কাল্পনিক শহরে যাত্রার বিবরণ রয়েছে যা এই পৃথিবীর কোনও স্থান নয় বরং ঈশ্বরের দর্শনকেই তুলে ধরে। বার্নার্ড অবশ্য আন্তরিকভাবে আবেলার্দের মতো পণ্ডিতদের বুদ্ধিমত্তাকে অবিশ্বাস করতেন; তিনি তাঁর মুখ বন্ধ করার শপথ নিয়েছিলেন। আবেলার্দের বিরুদ্ধে, মানবীয় যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা যাবে বলে তিনি ক্রিস্টান ধর্ম বিশ্বাসের মূল্যকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রয়াস পাওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। সেইন্ট পলের চ্যারিটির হাইমের উল্লেখ করে বার্নার্ড দাবি করেছেন যে, দার্শনিকের ক্রিশ্চান ভালোবাসার ঘাটতি রয়েছে: ‘কোনও কিছুকেই তার হেয়ালি মনে হয় না, আর্শীর মতো কিছুই না, বরং সবকিছু সামনাসামনি প্রত্যক্ষ করেন। সুতরাং ভালোবাসা ও যুক্তিচর্চা পরস্পর বেমানান। ১১৪১ সালে বার্নার্ড কাউন্সিল অভ সেন্স-এর সামনে হাজির হওয়ার জন্যে আবেলাকে তলব করেন। কাউন্সিলের সবাই বার্নার্ডের সমর্থক ছিলেন । এদের কেউ কেউ আবেলার্দের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে বাইরে অবস্থান করেছেন। কাজটা খুব কঠিন হয়নি, কারণ ততদিনে আবেলার্দের সম্ভবত পারকিনসনস ডিসিজ দেখা দিয়েছিল। বার্নার্ড তাঁকে এমন জোরাল ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন যে স্রেফ ভেঙে পড়ে পরের বছরই মারা যান তিনি ।
এক প্রতীকী মূহুর্ত ছিল এটা, যা মন এবং হৃদয়ের ‘বিচ্ছেদ’ সূচিত করেছিল। অগাস্তিনের ত্রিত্ববাদে মন ও হৃদয় ছিল অবিচ্ছেদ্য। ইবন সিনা ও আল গাযযালির মতো মুসলিম ফায়লাসুফগণ হয়তো মনে করেছিলেন যে কেবল বুদ্ধি দিয়ে ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা দুজনই। এমন এক দর্শনের প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছেন যা ভালোবাসার আদর্শ ও অতিন্দ্রীয়বাদের অনুশীলনের মিশেল। আমরা দেখব, দ্বাদশ ও এয়োদশ শতাব্দীতে ইসলামি বিশ্বের প্রধান চিন্তাবিদগণ মন ও হৃদয়কে সমন্বিত করার প্রয়াস পেয়েছেন এবং দর্শনকে সুফীদের প্রচারিত ভালোবাসা ও কল্পনার আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হিসাবে দেখেছেন। অবশ্য বার্নার্ডকে যেন বুদ্ধিমত্তার প্রতি ভীত মনে হয়েছে; তিনি একে মনের অধিকতর আবেগময় অনুভূতিপ্রবণ এলাকা হতে আলাদা রাখতে চেয়েছেন। বিপজ্জনক ছিল ব্যাপারটা: এতে আবেগ অনুভূতির সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর বিচ্ছেদ জন্ম নিতে পারে যা যুক্তিবাদের মতোই বিরস একটা ব্যাপার । বার্নার্ড প্রচারিত ক্রুসেড ছিল একটা বিপর্যয়। এর আংশিক কারণ এটা এমন এক আদর্শের উপর নির্ভরশীল ছিল যা কিনা সাধারণ বুদ্ধির সঙ্গে বেমানান এবং এখানে ক্রিশ্চানদের সহমর্মিতার নীতি মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। এভাবে, আবেলাদের প্রতি বার্নার্ডের আচরণে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে মায়ামমতার ঘাটতি ছিল । ক্রিশ্চানদের প্রতি পাপীদের হত্যা করার মাধ্যমে খৃস্টের প্রতি ভালোবাসা দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি, তাদের পবিত্র ভূমি হতে উচ্ছেদ করতে বলেছেন। বার্নার্ড ঠিক করেছিলেন, ঈশ্বরের রহস্য ব্যাখ্যায় উদ্যোগি কোনও যুক্তিবাদ ভয়ংকর, এতে ধর্মের আতঙ্ক ও বিস্ময়ের বোধ হালকা হওয়ার ঝুঁকি ছিল; কিন্তু সমালোচকের দৃষ্টিতে কুসংস্কার যাচাই করার ক্ষেত্রে লাগামহীন বিষয়ানুগতার ব্যর্থতা ধর্মকে অতি নীচে নামিয়ে ফেলতে পারে। আসলে যা প্রয়োজন ছিল, তা হচ্ছে সজাগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়মুখীতা, ভালোবাসার আবেগময়তা নয়; যা বুদ্ধিকে প্রবলভাবে দমিত করে ও সমবেদনাকে পরিত্যাগ করে, যার কিনা ঈশ্বরের ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়ার কথা।
