বিরোধের পর গ্রিক ও লাতিনরা ভিন্ন পথে যাত্রা শুরু করে । গ্রিক অর্থডস্কিতে ঈশ্বর সম্পর্কিত গবেষণা থিওলোজিয়া ঠিক এরকমই রয়ে যায়। ট্রিনিটি ও অবতারবাদের অত্যাবশ্যকীয় অতিন্দ্রীয় মতবাদের মাঝে ঈশ্বর সম্পর্কিত সকল ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে। তারা ‘থিওলজি অভ গ্রেস’ বা থিওলজি অভ দ্য ফ্যামিলি’র পরস্পর বিরোধী ধারণা আবিষ্কার করে: আসলে। তারা গৌণ বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনায় ও সংজ্ঞায়িতকরণে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। পশ্চিম অবশ্য এই সমস্ত প্রশ্ন বোঝার জন্যে ক্রমশঃ উৎসাহী হয়ে উঠেছিল; সবার জন্যে প্রযোজ্য একটা সঠিত সত্য খুঁজে বের করার প্রয়াস পাচ্ছিল। যেমন, সংস্কার খৃস্টিয় জগতকে আরও বিবদমান শিবিরে বিভক্ত করে দিয়েছিল, কারণ ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্টরা কীভাবে নিষ্কৃতি সম্ভব হয়েছিল এবং ইউক্যারিস্ট আসলে কী ছিল এ বিষয়ে একমত হতে পারেনি। পাশ্চাত্য ক্রিশ্চনরা বারবার এসব প্রশ্নে মতামত দেবার জন্যে চ্যালেঞ্জ করলেও গ্রিকরা এগিয়ে আসেনি আর জবাব দিলেও তাদের উত্তর জোড়াতালি দেওয়া। মনে হয়েছে। আবশ্যিকভাবে যুক্তি এবং ধারণার অতীত একজন ঈশ্বর সম্পর্কে আলোচনার উপায় হিসাবে জুৎসই নয় বোঝার পর যুক্তিবাদের ব্যাপারে বিতৃষ্ণ হয়ে উঠেছিল তারা। সেকুলার গবেষণায় মেটাফিজিক্স গ্রহণযোগ্য ছিল, কিন্তু এটা ধর্মবিশ্বাসকে বিপদাপন্ন করতে পারে বলে ক্রমবর্ধমান হারে ধারণা করেছিল গ্রিকরা। এটা বাকসর্বস্ব মনের ব্যস্ত অংশের কাছে আবেদন সৃষ্টি করে, অথচ থিওরিয়া কোনও বুদ্ধিবৃত্তিক মতামত নয়, বরং ঈশ্বর সকাশে এক নীরব অনুশীলন, যাকে কেবল ধর্মীয় ও অতিন্দ্রীয় অনুভূতি দিয়েই জানা যেতে পারে। ১০৮২ সালে দর্শনের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ ও সৃষ্টির নিওপ্লেটোনিক ধারণা প্রকাশের অপরাধে দার্শনিক ও মানবতাবদী জন ইতালোসকে ধর্মদ্রোহী হিসাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় । দর্শন হতে এই স্বতঃপ্রণোদিত। প্রত্যাহারের ঘটনাটা ঘটেছিল বাগদাদে আল-গাযযালির অসুস্থ হয়ে কালাম ছেড়ে সুফী হবার অল্প কিছুদিন আগে।
সুতরাং, এটা নিয়তির পরিহাস ও দুঃখজনক যে পশ্চিমের ক্রিশ্চানরা এমন একটা সময় ফালসাফাহর দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছিল যখন গ্রিক ও মুসলিমরা এর ওপর আস্থা হারাচ্ছিল। অন্ধকার যুগে লাতিন ভাষায় প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের রচনাবলী সুলভ ছিল না, সুতরাং অনিবার্যভাবে পশ্চিম পেছনে। পড়ে গিয়েছিল। দর্শনের আবিষ্কার ছিল অনুপ্রেরণাদায়ী উত্তেজনাকর । একাদশ শতাব্দীর ধর্মতাত্মিক অ্যানসেল্ম অভ ক্যান্টারবারি, আতারবাদ সম্পর্কে যার দৃষ্টিভঙ্গি আমরা চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি, যেন মনে করতেন যে কোনও কিচুই প্রমাণ করা সম্ভব । তার ঈশ্বর কিছু না হলেও সকল সত্তার সর্বোত্তম ছিলেন। এমনকি আবিশ্বাসীও এক সর্বোচ্চ সত্তার ধারণা গঠন করতে পারে, যা একক প্রকৃতি, সকল বস্তুর চেয়ে উত্তম, অনন্ত স্বর্গবাসে নিজেই সম্পূর্ণ। কিন্তু তিনি এও জোর দিয়ে বলেছেন যে, একমাত্র বিশ্বাস দিয়েই ঈশ্বরকে জানা যেতে পার। যেমন মনে হয় আসলে এটা তেমন স্ববিরোধী কথা নয়। অ্যানসেল্ম তাঁর বিখ্যাত প্রার্থনায় ইসায়াহ্র যদি বিশ্বাস না থাকে, তাহলে বুঝবে না’ এ কথাগুলোর প্রতিধ্বনি করেছেন :
আমি আমার হৃদয়ের বিশ্বাস ও ভালোবাসায় তোমার সত্যের খানিকটা পরিচয় উপলব্ধি করতে চাইছি। কারণ বিশ্বাস করার জন্যে বুঝতে চাই না আমি, বরং আমার বিশ্বাস আছে বোঝার (Credo ut intellegant)। কারণ আমি এও বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাস না থাকলে বুঝব না।[২৯]
প্রায়শঃ উচ্চারিত credo ut intellegan বুদ্ধিবৃত্তি বিসর্জন নয়। ভবিষ্যতে কোনও এক সময় অর্থ বোঝা যাবে, এ আশায় অন্ধের মতো বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরার দাবি করেননি আনসেল্ম । প্রকৃতপক্ষে তার ঘোষণা এভাবে অনূদিত হওয়া উচিত: হয়তো বুঝতে পারব ভেবে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ হচ্ছি। এই পর্যায়ে credo শব্দটির তখনও বর্তমানের ‘বিশ্বাস’ (belief) শব্দটির বুদ্ধিবৃত্তিক ঝোঁক ছিল না, তবে এক ধরনের আস্থা ও আনুগত্যের মনোভাব প্রকাশ করত। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, পাশ্চাত্য যুক্তিবাদের প্রাথমিক জোয়ারের সময়ও ঈশ্বরের ধর্মীয় অনুভূতিই মুখ্য রয়ে গিয়েছিল।
তা সত্ত্বেও, মুসলিম ও ইহুদি ফায়লাসুফদের মতো আনসেল্ম বিশ্বাস করতেন ঈশ্বরের অস্তিত্ব যৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে; তিনি নিজস্ব প্রমাণও হাজির করেছিলেন যাকে সাধারণত ‘অন্টোলজিক্যাল’ যুক্তি বলা হয়। আনসেল্ম ঈশ্বরকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে, এমন কিছু যার চেয়ে মহান fang asal sa stal (aliquid quo nihil maius cogitari possit)। এখানে ঈশ্বরকে চিন্তার বিষয়বস্তু হিসাবে দেখার অবকাশ থাকায় এটাই বোঝায় যে, মানুষের মনের পক্ষে তাকে ধারণ ও অনুধাবন সম্ভব! আনসেল্ম যুক্তি দেখিয়েছেন, এই ‘এমন কিছুর অস্তিত্ব থাকতে বাধ্য। যেহেতু অস্তিত্ব অস্তিত্বহীনতার চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত বা সম্পূর্ণ, সেহেতু আমাদের কল্পনার সম্পূর্ণ সত্তার অস্তিত্ব থাকতেই হবে নইলে তা অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে । আনসেক্সের প্রমাণ প্লেটোনিক ধ্যান-ধারণার অনুসারীদের মাঝে অসাধারণ এবং কার্যকর, যেখানে চিরকালীন আদি আদর্শের দিকে অঙুলি নির্দেশ করাই ধারণার উদ্দেশ্য বলে বিশ্বাস করা হতো। এর পক্ষে আজকের সংশয়বাদীকে সন্তুষ্ট করার সম্ভাবনা নেই বলা যায়। ব্রিটিশ ধর্মতত্ত্ববিদ জন ম্যাককারি যেমন বলেছেন, আপনার কাছে ১০০ ডলার আছে ভাবতে পারেন, কিন্তু দুঃখজনক হলো তাতে টাকাটা বাস্তবে আপনার পকেটে আসবে না।
