সুতরাং যখন এটা নিজেকে নিয়ে ধ্যানে নিমগ্ন হয় (এটা] নেই, ছিল না, থাকবেও না, কারণ একে অস্তিত্বমান কোনও জিনিস ধরে নেওয়া যাবে না, কারণ এটা সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়; কিন্তু যখন নির্দিষ্ট অনিবার্চনীয়ভাবে কোনও বস্তুতে অবতীর্ণ হয়, তখন মানসচক্ষে ধরা পড়ে, কেবল এটাই সকল বস্তুতে দেখা যায় এবং এটা থাকে, ছিল ও থাকবে।[২৫]
সুতরাং আমরা যখন ঐশীসত্তাকেই বিবেচনা করি, একে অযৌক্তিকভাবে “কিছু “ বলা হয় না, কিন্তু যখন এই ঐশী শূন্যতা কিছু না হতে কিছুতে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, এর অনুপ্রাণিত প্রত্যেকটা জিনিসকে ‘থিওফ্যানি, অর্থাৎ স্বর্গীয় আবির্ভাব বলা যেতে পারে।২৬ ঈশ্বর স্বয়ং যেমন আমরা যেভাবে তাঁকে দেখতে পাব না, কেননা এই ঈশ্বর কার্যত অস্তিত্বহীন। আমরা কেবল সেই ঈশ্বরকে দেখি যিনি সৃষ্ট জগতকে সঞ্চালন করেন এবং ফুল, পাখি, গাছ-পালা ও অন্যান্য মানবরূপে নিজেকে প্রকাশ করে থাকেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা আছে। অশুভ সম্পর্কে কী বলা যাবে? হিন্দুরা যেমন বলে থাকে, এটাও কি জগতে ঈশ্বরেরই ভিন্ন প্রকাশ? এরিজেনা যথেষ্ট বিশদভাবে অশুভের সমস্যা নিয়ে আলোচনার প্রয়াস পাননি, তবে পরবর্তীকালে ইহুদি কাব্বালিস্টরা ঈশ্বরের মাঝেই অশুভকে আবিষ্কার করার প্রয়াস পাবে: তারা ঈশ্বরের কিছু না হতে কিছু হবার প্রক্রিয়া বর্ণনা করার জন্যে এমন এক ধর্মতত্ত্বের অবতারণা করেছিল যা লক্ষণীয়ভাবে এরিজেনার বর্ণনার অনুরূপ, যদিও কাব্বালিস্টদের কেউ তাঁর রচনা পাঠ করেছিল-এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ।
এরিজেনা দেখিয়েছেন, গ্রিকদের কাছ থেকে লাতিনদের শেখার অনেক কিছু ছিল, কিন্তু ১০৫৪ সালে এক বিরোধের ফলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের চার্চের সম্পর্কচ্যুতি ঘটে, যা পরে স্থায়ী রূপ নেয়-যদিও তখন এমন উদ্দেশ্য ছিল না কারওই । বিরোধের একটা রাজনৈতিক দিক ছিল, যা আমি আলোচনা করব না, তবে ট্রিনিটি সক্রান্ত বিরোধও এর মুলে ক্রিয়াশীল ছিল। ৭৯৬ সালে দক্ষিণ ফ্রান্সের ফ্রেইসে পাশ্চাত্য বিশপদের এক সিনদ অনুষ্ঠিত হয়; এ সম্মেলনে নাইসিন ক্রিডে নতুন একটি ধারা যোগ করা হয়েছিল। এ ধারায় বলা হয়, পবিত্র আত্মা কেবল পিতা নয়, পুত্র (filioque) হতেও অগ্রসর হয়েছিলেন। লাতিন বিশপদের কেউ কেউ আরিয়ান দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী হওয়ায় পিতা ও পুত্রকে সমমর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে উদগ্রীব ছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন আত্মা পিতা ও পুত্র উভয়ের নিকট হতে আবির্ভূত হয়ে থাকলে তাদের সমমর্যাদা নিশ্চিত হবে। অচিরেই পশ্চিমের সম্রাটে পরিণত হতে চলা শার্লামেইন ধর্মতত্ত্বীয় বিষয়াদি খুব একটা না বুঝলেও এই নতুন ধারা অনুমোদন করেন। গ্রিকরা অবশ্য এর নিন্দা জানিয়েছিল। কিন্তু তারপরেও লাতিনরা অনড় থাকে ও তাদের নিজস্ব ফাদাররা এই শিক্ষাই দিয়েছেন বলে দাবি করে। এভাবে সেইন্ট অগাস্তিন পবিত্র আত্মাকে ট্রিনিটির মূল শর্ত হিসাবে দেখেছেন, তবে তাঁকে পিতা ও পুত্রের মাঝে ভালোবাসা হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং এটা বলা যায়, আত্মা উভয়ের কাছ থেকেই এসেছে। নতুন ধারাটি তিনটি ব্যক্তিত্বের অত্যাবশ্যক অখণ্ডতার উপর জোর দিয়েছে।
কিন্তু গ্রিকরা বরাবর অগাস্তিনের ত্রিত্ববাদী ধর্মতত্ত্বকে অবিশ্বাস করে আসছিল, কারণ এটা বড় বেশি মানবরূপী। পাশ্চাত্যে যেখানে ঈশ্বরের একত্বের ধারণা দিয়ে শুরু করে পরে সেই একত্বের সঙ্গে তিনটি ব্যক্তিত্ব বিবেচনা করে করেছিল, গ্রিকরা সেখানে সবসময় তিন hypostases দিয়ে শুরু করার পর ঈশ্বরের একত্বের ঘোষণা দিয়ে বলেছে, তার সত্তা আমাদের নাগালের বাইরে। লাতিনরা ট্রিনিটিকে বড় বেশি বোধগম্য করে ফেলেছে বলে ভেবেছিল তারা আর এও সন্দেহ করেছিল যে এইসব ত্রিত্ববাদী ধ্যান-ধারণাকে পর্যাপ্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রকাশ করার যোগ্যতা লাতিন ভাষার নেই। গ্রিকরা যুক্তি দেখিয়েছে, Filioque ধারা ঈশ্বরের অত্যাবশ্যক দুর্বোধ্যতার দিকে নজর না দিয়ে তিন ব্যক্তির ওপর বেশি জোর দিয়েছে। নতুন সংযোজন ট্রিনিটিকে বড় বেশি যৌক্তিক রূপ দিয়ে ফেলেছে। ঈশ্বরকে এটা তিন বৈশিষ্ট্য বিশিষ্ট বা অবস্থানের একটি সত্তায় পরিণত করেছে। প্রকৃতপক্ষে লাতিন ধারণায় ধর্মবিরোধী কিছু ছিল না, যদিও তা গ্রিকদের অ্যাপোফ্যাটিক আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে খাপ খায়নি। শান্তি স্থাপনের ইচ্ছা থাকলে এই বিরোধের অবসান ঘটানো যেতো, কিন্তু বিশেষ করে ১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডাররা বাইন্তাইন রাজধানী কন্সতান্তিনোপলের অবসান ঘটিয়ে গ্রিক সাম্রাজ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলে ক্রুসেডসমূহের সময় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মাঝে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। Filioque ভাঙন আসলে গ্রিক ও লাতিনদের ঈশ্বর সম্পর্কে সম্পূর্ণ আলাদা ধারণা গড়ে তোলার ব্যাপারটি উন্মোচিত করেছিল । ট্রিনিটি যেভাবে গ্রিকদের কাছে আধ্যাত্মিকতার মৌল বিষয়ে রয়ে গিয়েছিল, পশ্চিমের ক্রিশ্চানদের কাছে তা কখনওই ছিল না। গ্রিকরা মনে করেছিল, এভাবে ঈশ্বরের একত্বের ওপর জোর দিতে গিয়ে পশ্চিমারা স্বয়ং ঈশ্বরকে এমন এক ‘তুচ্ছ সত্তার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছে যা দার্শনিকদের ঈশ্বরের মতো সংজ্ঞায়িত ও আলোচনার বিষয় হতে পারে।২৭ পরবর্তী অধ্যায়গুলোয় আমরা দেখব, পাশ্চাত্যের ক্রিশ্চানরা ট্রিনিটি মতবাদ নিয়ে বরাবর অস্বস্তি বোধ করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর আলোকনের সময় অনেকেই এ মতবাদ সম্পূর্ণ ত্যাগ করবে। কার্যতঃ বহু পাশ্চাত্য ক্রিশ্চান মোটেই ত্রিত্ববাদী নয়। তারা বলে থাকে একজন ঈশ্বরের মাঝে তিন ব্যক্তির মতবাদ বোধের অতীত, এটা বোঝেনি যে, গ্রিকদের কাছে এটাই ছিল মোদ্দা কথা।
