এরপর থেকে ইউরোপিয় ক্রিশ্চানরা ইহুদি ও মুসলিমদের ঈশ্বরের প্রতিপক্ষ ধরে নেয়: বাইয়ান্তিয়ামের গ্রিক অর্থডক্স ক্রিশ্চানদের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন গভীর বৈরী মনোভাব পোষণ করেছিল তারা; যারা ওদের বর্বর আর তুচ্ছ মনে করেছিল। ব্যাপারটা আগাগোড়া এরকম ছিল না। নবম শতাব্দীতে পশ্চিমের অধিকতর শিক্ষিত ক্রিশ্চানরা গ্রিক ধর্মতত্ত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেছিল । এভাবে কেলটিক দার্শনিক দানস্ স্কতাস এরিজেনা (৮১০-৮৭৭) পশ্চিম ফ্রাংকদের রাজা চার্লস দ্য বোল্ডের দরবারে কাজ করার জন্যে স্বদেশ আয়ারল্যান্ড ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, পশ্চিমের ক্রিশ্চানদের জন্যে লাতিন ভাষায় গ্রিক ফাদারস অভ দ্য চার্চের বিশেষ করে ডেনিস দ্য আরোপাগাইতের রচনাবলীসহ বহু রচনা অনুবাদ করেছিলেন। এরিজেনা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে, বিশ্বাস ও যুক্তি পরস্পর বিরোধী নয় । ইহুদি ও মুসলিম ফায়লাসুফদের মতো দর্শনকে তিনি ঈশ্বর লাভের রাজকীয় পথ হিসাবে দেখেছেন। যারা ক্রিস্টান ধর্মের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাবি করেছে, তাদের শুরু ছিলেন অ্যারিস্টটল ও প্লেটো। ঐশীগ্রন্থ ও ফাদারদের রচনাবলী যৌক্তিক অনুসন্ধানের অনুশীলনের মাধ্যমে আলোকিত করে তোলা যেতে পারে, কিন্তু তার মানে আক্ষরিক ব্যাখ্যা ছিল নাঃ ঐশীগ্রন্থের কিছু কিছু অনুচ্ছেদ প্রতীকী উপায়ে ব্যাখ্যা করতেই হবে, কারণ, এরিজেনা তাঁর এক্সপোজিশন অভ ডেনিস’স সেলেস্টিয়াল হায়ারারকি-তে ব্যাখ্যা করেছেন, ধর্মতত্ত্ব এক ধরনের কবিতা।[২২]
ঈশ্বর সংক্রান্ত আলোচনায় এরিজেনা ডেনিসের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, কেবল প্যারাডক্সের মাধ্যমেই ঈশ্বরকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যা আমাদের মানবীয় উপলব্ধির সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ঈশ্বর সম্পর্কে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় মনোভাবই বৈধ। ঈশ্বর উপলব্ধির অতীত: এমনকি দেবদূতরাও তার আবশ্যকীয় প্রকৃতি জানে না বা বোঝে নাঃ কিন্তু ‘ঈশ্বর প্রাজ্ঞ,’ ধরনের ইতিবাচক মন্তব্য গ্রহণযোগ্য, কারণ আমরা শব্দটি ঈশ্বরের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সময় আমাদের জানা থাকে যে এর প্রচলিত অর্থে ব্যবহার করেছি। একটা নেতিবাচক মন্তব্য, যেমন ঈশ্বর প্রাজ্ঞ নন,’ করে আমরা এ বিষয়টি নিজেদের স্মরণ করিয়ে দিই। এই বৈপরীত্য ঈশ্বর আলোচনায় আমাদের ডেনিসের তৃতীয় পথের দিকে ঠেলে দেয়, আমরা উপসংহারে পৌঁছাই: ঈশ্বর প্রাজ্ঞেয় চেয়ে বেশি কিছু! একেই গ্রিকরা বলেছে অ্যাপোফ্যাটিক মন্তব্য, কারণ ‘প্রাজ্ঞের চেয়ে বেশি কিছু দিয়ে কী বোঝায় আমরা বুঝি না। এটা কেবল কথার খেলা নয়, বরং এক ধরনের অনুশীলন যা পরস্পর বিরোধী দুটো বিবৃতিকে পাশাপাশি স্থাপন করে আমাদের ঈশ্বর শব্দের উপস্থাপিত রহস্য অনুভব করার উপযোগি করে তোলে, কেননা তুচ্ছ মানবীয় বোধ দিয়ে একে কখনও সীমাবদ্ধ করা যাবে না ।
এরেজিনা এ পদ্ধতিটি ঈশ্বর আছেন’ বিবৃতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করে স্বভাবতই সিদ্ধান্তে (Synthesis) পৌঁছেছেন: “ঈশ্বর অস্তিত্বের চেয়েও বেশি কিছু।’ ডেনিস যেমন উল্লেখ করেছেন, ঈশ্বর তাঁর সৃষ্ট বস্তুর মতো বিরাজ করেন না ও সেসবের পাশাপাশি অবস্থিত স্রেফ আরেকটা বস্তুও নন। এটা আবার দুর্বোধ্য বক্তব্য, কারণ, এরেজিনা মন্তব্য করছেন ‘সত্তার’র চেয়ে বেশি কিছুটা কী এখানে সেটা প্রকাশ পায় না; কারণ এখানে বলা হচ্ছে, ঈশ্বর আর সব বস্তুর মতো নন, বরং বস্তুসমূহের চেয়ে বেশি কিছু, কিন্তু এই ‘কিছুটা কী, এখানে তার কোনও সংজ্ঞা নেই।২৩ প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বর কিছু না। এরিজেনা জানতেন কথাটা হতবুদ্ধিকর, তাই পাঠকদের আতঙ্কিত না হতে বলেছেন। ঈশ্বর কোনও বস্তু নন বোঝানোই ছিল তাঁর পদ্ধতির উদ্দেশ্য, আমরা যেভাবে বুঝি তিনি সেভাবে কোনও ‘সত্তা’ ধারণ করেন না। ঈশ্বর তিনি, যিনি সত্তার অতিরিক্ত’ (aliquo modo superesse)। তাঁর অস্তিত্বের ধরণ আমাদের অস্তিত্বের ধরণের চেয়ে আলাদা, যেমন আমাদের ধরণ পশুদের চেয়ে ভিন্ন আর পশুর ধরণ পাথরের চেয়ে আলাদা। কিন্তু ঈশ্বর কিছু না, হলে তিনি আবার ‘সবকিছুও। কারণ এই ‘অতি-অস্তিত্ব বোঝায় যে কেবল ঈশ্বরেরই প্রকৃত সত্তা আছে; তিনি এর সমস্ত কিছুর মূল সত্তা। সুতরাং, তাঁর সৃষ্ট প্রত্যেকটি প্রাণীই এক একটি থিওফ্যানি, ঈশ্বরের অস্তিত্বের নিদর্শন। এরিজেনার কেলটিক ধর্মানুরাগ-সেইন্ট প্যাট্রিকের বিখ্যাত প্রার্থনায় অঙ্গীভূত: ‘ঈশ্বর যেন আমার মস্তিষ্ক ও উপলব্ধিতে থাকেন’-তাকে ঈশ্বরের সর্বব্যাপীতার ওপর জোর দেওয়ার দিকে নিয়ে গেছে। নিওপ্লেটোনিক প্রকল্পে গোটা সৃষ্টির ধারক মানুষ। হচ্ছে এইসব থিওফ্যানির সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ নমুনা, এবং সেইন্ট অগাস্তিনের মতো এরিজেনাও শিক্ষা দিয়েছেন, কিছুটা অস্বচ্ছভাবে হলেও আমরা নিজেদের মাঝেই ট্রিনিটি আবিষ্কার করতে পারি।
এরিজেনার বৈপরীত্যমূলক ধর্মতত্ত্বে ঈশ্বর একাধারে সবকিছু এবং কিছু না; দুটো সংজ্ঞা পস্পরকে ভারসাম্য দেয় ও আমাদের ঈশ্বর’ শব্দটি প্রতীকায়িত করতে পারে এমন রহস্য বোঝাতে এক সৃজনশীল চাপ সৃষ্টি করে। এভাবে জনৈক ছাত্র যখন জানতে চেয়েছিল যে ঈশ্বরকে ‘কিছু না’ ডাকেন বলে ড্যানিস কী বুঝিয়েছেন, এরিজেনা জবাব দিয়েছিলেন যে, ঐশীসত্তা উপলব্ধির অতীত, কারণ এটা অতি আবশ্যক’-অর্থাৎ স্বয়ং ভাললাত্বের চেয়েও বেশি-এবং ‘অতিপ্রাকৃত।
