কিন্তু তারপরেও মায়মোনিদস ঈশ্বর যে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে উপলব্ধির অতীত ও মানবীয় যুক্তির অগম্য, একথা সযত্নে ধারণ করে গেছেন। অ্যারিস্টটল ও ইবন সিনার যুক্তির সাহায্য নিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন, তিনি, কিন্তু জোর দিয়ে বলেছেন, ঈশ্বর তার পরম সারল্যের কারণে অনিবৰ্চনীয় ও বর্ণনার অতীত রয়ে যান। স্বয়ং পয়গম্বরগণ রূপকের ব্যবহার করেছেন এবং আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, কেবল প্রতীক নির্ভর, পরোক্ষ ভাষাতেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সবচেয়ে অর্থপূর্ণ বা বিশদ আলোচনা করা যেতে পারে। আমরা জানি যে, ঈশ্বরকে অস্তিত্বমান কোনও বস্তুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। সুতরাং আমরা যখন তাকে বর্ণনা করার প্রয়াস পাই তখন নেতিবাচক পরিভাষা ব্যবহার করাই শ্রেয়। তিনি আছেন না বলে আমাদের উচিত তার অন-অস্তিত্ব অস্বীকার করা, ইত্যাদি। ইসমায়েলিদের মতো নেতিবাচক ভাষার ব্যবহার একটা অনুশীলন যা ঈশ্বরের দুজেঁয়তা সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি বাড়িয়ে দেবে, আমাদের স্মরণ করিয়ে দেবে যে আমরা সামান্য মানুষ তাকে যতটা বুঝতে পারি তিনি তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা এমনকি ঈশ্বরকে ‘ভালো’ও বলতে পারি না, কারণ ‘ভালোত্ব’ দিয়ে আমরা যা বোঝাতে পারি তিনি তাঁর চেয়ে উন্নত। এভাবে আমরা আমাদের ঘাটতিসমূহ হতে ঈশ্বরকে বাদ দিতে পারি, আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা তার ওপর স্থাপন হতে নিজেদের বিরত রাখতে পারি। সেটা আমাদের নিজস্ব ভাবমূর্তি ও অনুরূপ ঈশ্বর গড়ে তুলবে। আমরা অবশ্য ঈশ্বর সম্পর্কে কিছু ইতিবাচক ধারণা গড়ে তোলার জন্যে VIA NAGATIVA ব্যবহার করতে পারি। এভাবে আমরা যখন বলব যে ঈশ্বর ‘অক্ষম-নন’ (তিনি শক্তিমান না বলে), তখন যৌক্তিকভাবেই বোঝা যাবে ঈশ্বর অবশ্যই কোনও কাজে সক্ষম। যেহেতু ঈশ্বর ‘অসম্পূর্ণ নন,’ সুতরাং তার কর্মধারা নিখুঁত হতে বাধ্য। আমরা যখন বলি যে, ঈশ্বর ‘অজ্ঞ নন’ (তিনি প্রাজ্ঞ বোঝাতে), তখন ধরে নিতে পারব যে, তিনি পরিপূর্ণভাবে প্রাজ্ঞ ও সম্পূর্ণ জ্ঞাত। এসব সিদ্ধান্ত কেবল ঈশ্বরের কর্ম সম্পর্কেই গ্রহণ করা যাবে, আমাদের বুদ্ধির অতীত সত্তা সম্পর্কে নয় ।
বাইবেলের ঈশ্বর ও দার্শনিকদের ঈশ্বরের মাঝে পছন্দের প্রশ্নে মাইমোনিদস বরাবর প্রথমটিকে বেছে নিয়েছেন। যদিও শূন্য হতে সৃষ্টির তত্ত্ব দার্শনিকভাবে অর্থডক্স নয় এবং মায়মোনিদস প্রচলিত বাইবেলিয় মতবাদই আঁকড়ে থেকেছেন এবং উৎসারণের দার্শনিক ধারণা বাদ দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি ছিল, শূন্য হতে সৃষ্টি কিংবা উৎসারণের মতবাদের কোনওটিই কেবল যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না। আবার, পয়গম্বরত্বকে তিনি দর্শনের ওপরে স্থান দিয়েছেন। পয়গম্বর ও দার্শনিকগণ একই ঈশ্বরের কথা বলেছেন, কিন্তু পয়গম্বর অবশ্যই বুদ্ধিমত্তা ও কল্পনাশক্তির দিক থেকে উন্নত ছিলেন। ঈশ্বর সম্পর্কে খেয়ালি যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানের চেয়ে উচ্চতর সরাসরি ও সহজাত জ্ঞান ছিল তার। মায়মমানিদস স্বয়ং যেন এক ধরনের অতিন্দ্রীয়বাদী ছিলেন। এ ধরনের সহজাত ঈশ্বরবোধের সঙ্গে গা-কাঁপানো উত্তেজনার কথা বলেছেন তিনি, এক ধরনের আবেগ যা কল্পনাশক্তির পরিপূর্ণতা লাভের পরিণতি।২০ যুক্তিবাদের ওপর গুরুত্ব দান সত্ত্বেও মায়মমানিদস বিশ্বাস করতেন, কেবল বুদ্ধি দিয়ে অর্জিত ঈশ্বরজ্ঞানের চেয়ে কল্পনার মাধ্যমে প্রাপ্ত ঈশ্বরের জ্ঞান শ্রেষ্ঠ।
দক্ষিণ ফ্রান্স ও স্পেনের ইহুদিদের মাঝে তাঁর ধারণাসমূহ ছড়িয়ে পড়েছিল যার ফলে চতুর্দশ শতাব্দীর সূচনা নাগাদ এ অঞ্চলে ইহুদিদের মাঝে দার্শনিক আলোকনের মতো সাড়া পড়ে যায়। এইসব ইহুদি ফায়লাসুফদের কেউ কেউ মায়মমানিদসের চেয়েও বেশি যুক্তিবাদী ছিল । এভাবে দক্ষিণ ফ্রান্সের বাগনলসবাসী লেভাই বেন গারশম (১২৮৮-১৩৪৪) ঈশ্বরের জাগতিক বিষয়ের জ্ঞান থাকার কথা অস্বীকার গেছেন। তাঁর ঈশ্বর ছিলেন দার্শনিকদের ঈশ্বর, বাইবেলের ঈশ্বর নন। অনিবার্যভাবে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা যেমন দেখব, কোনও কোনও ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে কাব্বালাহ নামে এক নিগুঢ় অনুশীলন সূচিত করেছিল । অন্যরা বিপদের সময় সমবেদনা মেলে না দেখে ফায়লাসুফদের দূরবর্তী ঈশ্বরের দর্শন হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ত্রয়োদশ ও চতুদর্শ শতাব্দীতে পুনর্দখলের খৃস্টিয় যুদ্ধগুলোর ফলে স্পেনে ইসলামের সীমান্ত সংকুচিত হতে শুরু করে এবং পশ্চিম-ইউরোপের অ্যান্টি-সেমিটিজম পেনিনসুলায় নিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত এর ফলে স্প্যানিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের বিনাশ ঘটে ও ষোড়শ শতাব্দীতে ইহুদিরা ফালাসাফাহ্ ছেড়ে বৈজ্ঞানিক যুক্তির বদলে মিথলজি অনুপ্রাণিত ঈশ্বর সম্পর্কিত সম্পূর্ণ নতুন এক ধারণা গড়ে তোলে।
পশ্চিমের খৃস্ট-সাম্রাজ্যের ক্রুসেডিয় ধর্ম একে অন্যান্য একেশ্বরবাদী ধর্ম হতে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। ১০৯৬-৯৯ সময়কালে সংঘটিত প্রথম ক্রুসেড ছিল নতুন পশ্চিমের প্রথম সম্মিলিত প্রয়াস, ইউরোপের অন্ধকার যুগ হিসাবে পরিচিত বর্বরতার দীর্ঘ পর্যায় থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত ছিল এটা। উত্তর ইউরোপের ক্রিশ্চান জাতিগুলোর সমর্থনপুষ্ট নয়া রোম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফিরে আসার জন্যে লড়ছিল। কিন্তু অ্যাংলো স্যাক্সন ও ফ্রাঙ্কদের খৃস্ট ধর্ম ছিল অবিকশিত। আগ্রাসী ও যোদ্ধা জাতি ছিল বলে আগ্রাসী ধর্মের আকাক্ষা করেছিল তারা। একাদশ শতাব্দীতে অ্যাবি অভ কুনির বেনেডিক্টাইন মঙ্করা ও এর অধীনস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সামরিক চেতনা গির্জায় সীমিত রাখার এবং তীর্থযাত্রার মতো ভক্তিমূলক অনুশীলনের মাধ্যমে তাদের প্রকৃত ক্রিশ্চান মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছিল। প্রথম ক্রুসেডার বাহিনী তাদের নিকট-প্রাচ্য অভিযানকে পবিত্র ভূমিতে তীর্থযাত্রা হিসাবেই দেখেছিল, কিন্তু তখনও তাদের ঈশ্বর ও ধর্ম বিষয়ে ধারণা ছিল খুবই আদিম পর্যায়ের। সেইন্ট জর্জ, সেইন্ট মারকারি ও সেইন্ট দেমিত্রিয়াসের মতো সৈনিক-সাধুরা তাদের ধর্মাচরণে ঈশ্বরের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন; বাস্তব ক্ষেত্রে পৌত্তলিক দেবতাদের সঙ্গে খুব একটা পার্থক্য ছিল না তাদের। জেসাসকে মানবরূপী লোগোসের চেয়ে বরং ক্রুসেডারদের সামন্ত প্রভু হিসাবেই দেখা হয়েছে: পৈত্রিক সম্পত্তি-পবিত্র ভূমি-শয়তানের কবল হতে উদ্ধার করার জন্যে নাইটদের তলব করেছেন তিনি। অভিযান শুরু করার পর ক্রুসেডারদের কেউ কেউ রাইন উপত্যকাবাসী ইহুদিদের নির্বিচারে হত্যা করে জেসাসের মৃত্যুর বদলা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ক্রুসেডের আহ্বান জানানোর সময় পোপ দ্বিতীয় আরবানের মূল পরিকল্পনায় এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ৩,০০০ মাইল পাড়ি দিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাওয়ার ব্যাপারটা অনেক ইহুদির কাছেই বিসদৃশ ঠেকেছে, বিশেষ করে মুসলিমদের সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই জানা ছিল না তাদের; সেখানে যে জাতির লোকেরা কিংবা ওরা যেমন ভেবেছিল-ক্রাইস্টকে হত্যা করেছে তারা যেখানে বাড়ির কাছেই আছে। জেরুজালেমমুখী দীর্ঘ কষ্টকর যাত্রায় ক্রুসেডাররা যখন একবার অল্পের জন্যে একেবারে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল, নিজেদের অলৌকিক উদ্ধার প্রাপ্তিকে তারা ঈশ্বরের মনোনীত জাতির প্রতি ঈশ্বর প্রদত্ত বিশেষ নিরাপত্তার ফল ধরে নিয়েছিল। প্রাচীন কালের ইসরায়েলিদের যেভাবে পবিত্র ভূমিতে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, ঠিক সেভাবে ওদেরও সেখানে নিয়ে যাচ্ছে। বাস্তব ক্ষেত্রে, তাদের ঈশ্বর কিন্তু তখনও বাইবেলের প্রথম দিকের পুস্তকে বর্ণিত আদিম গোত্রীয় উপাস্যই ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মে জেরুজালেম অধিকার করার পর ওর জোশুয়ার উন্মাদনা নিয়ে নগরীর ইহুদি ও মুসলিম বাসিন্দাদের ওপর হামলে পড়ে এবং এমন নিষ্ঠুর নৃশংসতার সঙ্গে হত্যালীলা চালায় যা দেখে এমনকি তাদের সমসাময়িকেরাও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল ।
