৫. ঈশ্বরই কর্তৃক বিশ্ব জগৎ সৃষ্টি।
৬. পয়গম্বরত্বের বৈধতা।
৭. ঈশ্বরের ন্যায় বিচার ।
৮. শেষ বিচারের দিনে পুনরুত্থান।[১৮]
কোরান যেহেতু এ বিষয়ে একেবারেই দ্ব্যর্থহীন, সুতরাং ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণাগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, ফালসাফাহ্ সব সময় বিশ্ব সৃষ্টির বিশ্বাস মেনে নেয়নি, সুতরাং এটা পরিষ্কার নয় যে কোরানের এ ধরনের মতবাদ কীভাবে বোঝা যেতে পারে। যদিও কোরান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলছে যে, ঈশ্বর বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু তিনি কীভাবে তা করেছেন বা বিশেষ কোন মুহূর্তে বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করা হয়েছে কিনা তা বলছে না। এতে করে ফায়লাসুফদের পক্ষে যুক্তিবাদীদের বিশ্বাস গ্রহণের অবকাশ সৃষ্টি হয়। আবার, কোরান বলছে যে, ঈশ্বরের জ্ঞানের মতো গুণাবলী রয়েছে, কিন্তু আমরা এর অর্থ সঠিকভাবে জানি না, কারণ জ্ঞান সম্পর্কিত আমাদের ধারণা অতি-অবশ্য মানবীয় এবং অপূর্ণ। সুতরাং কোরান যখন বলে যে আমরা যা জানি তার সবই জানেন ঈশ্বর, তখন আবশ্যিকভাবে তা দার্শনিকদের বিরোধিতা করে না।
ইসলামি বিশ্বে অতিন্দ্রীয়বাদের গুরুত্ব এত বেশি ছিল যে ইবন রূশদের সম্পূর্ণ যৌক্তিক ধর্মতত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণা খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। ইসলামে ইবন রূশদ সম্মানিত হলেও গৌণ ব্যক্তিত্ব। ছিলেন, কিন্তু পাশ্চাত্যে যারপরনাই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন তিনি, যে জগৎ তারই মাধ্যমে অ্যারিস্টটলকে আবিষ্কার করে এবং ঈশ্বর সম্পর্ক অধিকতর যৌক্তিক ধারণা গড়ে তোলে। অধিকাংশ পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের ইসলামি সংস্কৃতি সম্পর্কে খুব সামান্যই ধারণা ছিল। তাঁরা ইবন রূশদ পরবর্তী সময়ের দার্শনিক অগ্রগতি সম্পর্কে অজ্ঞই ছিলেন; এ কারণেই প্রায়শঃ মনে করা হয় যে, ইবন রূশদের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গেই ইসলামি দর্শনেরও পরিসমাপ্তি ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে ইবন রূশদের জীবৎকালেই দুজন বিশিষ্ট ইসলামি দার্শনিক ইরাক ও ইরানে তাদের সৃষ্টিকর্মে নিয়োজিত ছিলেন যারা ইসলামি বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করবেন। ইয়াহিয়া সুহরাওয়ার্দি এবং মুঈদ আদ-দিন ইবন আল-আরাবী দুজনই ইবন রূশদের বদলে ইবন সিনার পথ অনুসরণ করেন এবং দর্শনকে অতিন্দ্রীয় আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে একীভূত করার প্রয়াস পান। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা তাদের অবদান পর্যালোচনা করব।
ইবন রূশদ-এর মহান অনুসারী ইহুদি সম্প্রদায়ের মহান তালমুদ বিশেষজ্ঞ ও দার্শনিক র্যাবাই মোজেস ইবন মায়মন (১১৩৫-১২০৪}–সাধারণভাবে ইনি মায়মমানিস নামে পরিচিত। ইবন রূশদের মতো মায়মমানিদসও মুসলিম স্পেনের রাজধানী কর্দোবার নাগরিক ছিলেন। এখানে ঈশ্বরের গভীর অনুভূতি লাভের জন্যে এক ধরনের দর্শনের প্রয়োজন বলে ক্রমবর্ধমান ঐকমত্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আলমোরাভিয় ধর্মান্ধ বারবার গোষ্ঠী ইহুদিদের ওপর তীব্র নির্যাতন চালানোর সময় তিনি স্পেন থেকে পালাতে বাধ্য হন। মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতার সঙ্গে দুঃখজনক বিরোধ বা সংঘর্ষ মায়মোনিদসকে পুরোপুরি ইসলামের প্রতি বৈরী করে তোলেনি। অভিভাবকদের সঙ্গে মিশরে স্থায়ী হন তিনি, সেখানে তিনি সরকারী উচ্চ পদমর্যাদার আসনে আসীন হয়েছেন, এমনকি সুলতানের চিকিৎসকের দায়িত্বও পালন করেছেন। এখানে বিখ্যাত নিবন্ধ দ্য গাইড ফর দ্য পারপ্লেক্সড রচনা করেন তিনি, যেখানে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে ইহুদি ধর্মবিশ্বাস কোনও খেয়ালিপূর্ণ মতাবাদের মিশেল নয়, বরং সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইবন রূশদের মতো মায়মমানিদসের বিশ্বাস ছিল, ফালসাফাহ্ ধর্মীয় জ্ঞানের সবচেয়ে অগ্রসর রূপ ও ঈশ্বরকে লাভ করার রাজকীয় পথ, যা অবশ্যই সাধারণের জন্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া ঠিক হবে না, বরং দার্শনিক অভিজাত শ্রেণীর জন্যে তুলে রাখতে হবে। অবশ্য ইবন রূশদের বিপরীতে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সাধারণ মানুষকেও প্রতীকী উপায়ে ঐশীগ্রন্থ ব্যাখ্যা করার শিক্ষা দেওয়া যতে পারে, যাতে তাঁরা ঈশ্বরকে মানবীয় রূপে কল্পনা করে না বসে। নিস্তার লাভের জন্য নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপনের প্রয়োজনীয়তায়ও বিশ্বাস ছিল তাঁর। তেরটি ধারার এক
ক্রীড প্রকাশ করেছিলেন তিনি যা আশ্চর্যজনকভাবে ইবন রূশদের সমরূপ:
১. ঈশ্বরের অস্তিত্ব। ২. ঈশ্বরের একত্ব। ৩. ঈশ্বরের নিরাকারত্ব। ৪. ঈশ্বরের অনন্ততা। ৫. প্রতিমা উপাসনায় নিষেধাজ্ঞা। ৬. পয়গম্বরত্বের বৈধতায় বিশ্বাস । ৭. মোজেস ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গম্বর। ৮. সত্যের ঐশী উৎস। ৯. তোরাহর চিরন্তন বৈধতা । ১০. ঈশ্বর মানুষের সব কাজের খবর রাখেন। ১১. তিনি সেগুলোর সঠিক বিচার করেন। ১২. তিনি একজন মেসায়াহ্ প্রেরণ করবেন । ১৩. মৃতের পুনরুত্থান।
ইহুদিবাদে এটা ছিল নতুন সংযোজন; কখনওই তা পুরোপুরিভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। ইসলামের মতো অর্থডক্সির ধারণা (অর্থপ্র্যাক্সির বিপরীতে) ইহুদি ধর্মীয় অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে ছিল অচেনা । ইবন রূশদ ও মায়মোনিদসের ক্রীড বোঝায় যে, ধর্ম উপলব্ধি করার যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ডগম্যাটিজম এবং বিশ্বাস’-এর সঙ্গে ‘সঠিক আস্থা’-কে গুলিয়ে ফেলার প্রবণতার জন্ম দেয় ।
