যেমন বলা হয়েছে, স্বর্গীয় সত্য সেই ব্যক্তির জন্যে অপেক্ষা করে যাদের সংস্পর্শে তা আসে এবং যার সঙ্গে নিজেকে সে সংযুক্ত করে, যেন সে ঐ ব্যক্তির ঈশ্বরে পরিণত হতে পারে, পয়গম্বর ও সাধুদের বেলায় যেমনটা ঘটেছে এটা ঠিক আত্মার মতো ণে প্রবেশ করার অপেক্ষায় থাকে, যতক্ষণ না শেষোক্তটির প্রাণশক্তি সত্তার এই উচ্চতর রূপকে গ্রহণ করার যোগ্য হয়ে ওঠার জন্যে পর্যাপ্তভাবে পরিপূর্ণ হয়। এটা ঠিক অপেক্ষমান প্রকৃতির মতো, যা এমন এক তাপমাত্রা ও জলবায়ুর অপেক্ষায় থাকে। যাতে সে মাটির ওপর প্রয়াস চালিয়ে গাছপালার জন্ম দিতে পারে।
সুতরাং ঈশ্বর অজ্ঞাত, অনুপ্রবেশকারী কোনও সত্তা নন, আর ইহুদিও ঐশীজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন কোনও সত্তা নয়। ঈশ্বরকে আবারও মানবতার পূর্ণতা, পুরুষ বা নারীর সম্ভাবনার পরিপূরণ হিসাবে দেখা যেতে পারে; এছাড়াও, তার অভিজ্ঞতার ‘ঈশ্বর একান্তই তার নিজস্ব; এ ধারণাটি পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা আরও বিশদভাবে পরীক্ষা করব। হালেভি স্বয়ং ঈশ্বরের সত্তা ও ইহুদিরা যে ঈশ্বরকে অনুভব করতে সক্ষম তার মাঝে পার্থক্য করার ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। পয়গম্বর ও সাধুগণ যখন ‘ঈশ্বর’ কে প্রত্যক্ষ করার দাবি করেছেন, তখন তিনি স্বয়ং যেমন ঠিক সেভাবে তাঁকে জানতে পারেননি তারা, কেবল তাঁর ঐশী ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমেই তাঁকে চিনেছেন যাকে অনেকটা দুৰ্জেয় অগম্য সত্তার আলোকচ্ছটা বলা যেতে পারে।
আল-গাযযালির যুক্তির ভারে ফালসাফাহ অবশ্য পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। কর্দোবার বিশিষ্ট মুসলিম দার্শনিক আবার এর পুনরুজ্জীবনের প্রয়াস পেয়েছিলেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এটা ছিল ধর্মের সর্বোচ্চ রূপ। ইউরোপে আভেরস নামে পরিচিত আবু আল-ওয়ালিদ ইবন আহমাদ ইবন রূশদ (১১২৬-১১৯৮) পশ্চিমে ইহুদি ও ক্রিশ্চান উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই বিশেষজ্ঞে পরিণত হয়েছিলেন। ত্রায়োদশ শতাব্দীতে তাঁর রচনাবলী হিব্রু ও লাতিন ভাষায় অনূদিত হয় এবং অ্যারিস্টটলের ওপর তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ মায়মোনিদস, আকুইনাস ও আলবার্ট দ্য গ্রেটের মতো ধর্মতাত্ত্বিকদের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে আর্নেস্ট রেনান। মুক্তচিন্তাবিদ এবং অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদের প্রতীক হিসাবে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেন। ইসলামি জগতে অবশ্য আবু রূশদ অপেক্ষাকৃত প্রাতিক চরিত্র ছিলেন। তার জীবদ্দশায় ও মরণোত্তর প্রভাবের প্রেক্ষিতে আমরা ঈশ্বরের ধারণার ক্ষেত্রে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভক্তি দেখতে পাই। ফালাসাফাহ্র বিরুদ্ধে আল-গাযযালির নিন্দা ও নিগূঢ় বিষয়ের প্রকাশ্য আলোচনার জোরাল বিরোধিতা করেছেন আবু রুশদ। পূর্বসুরি আল-ফারাবি ও ইবন সিনার বিপরীতে তিনি ছিলেন একজন কাজী, শরীয়াহ আইনের জুরিস্ট আর দার্শনিকও। উলেমারা আগাগোড়া ফালসাফাহ্ ও তাদের ভিন্নতর ঈশ্বরের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন, কিন্তু ইবন রূশদ অধিকতর প্রথাগত ইসলামী ধর্মানুরাগের সঙ্গে অ্যারিস্টটলকে মেলাতে সক্ষম হন। তিনি ভেবেছিলেন, ধর্ম ও যুক্তিবাদের ভেতর কোনও বিরোধ নেই । দুটো ভিন্নভাবে একই সত্য প্রকাশ করে; একই ঈশ্বরের দিকে দৃষ্টি ফেরায়। সবাই অবশ্য দার্শনিক চিন্তার ক্ষমতা রাখে না, সুতরাং ফালসাফাহ ছিল কেবল বুদ্ধি বা মেধার দিক দিয়ে উচ্চতরদের জন্যে। এটা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করবে, তাতে ভুলের শিকার হয়ে পরজীবনে উদ্ধার প্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। এখানেই এসব নিগূঢ় বিশ্বাসের গুরুত্ব যা এগুলোকে বিপজ্জনক মতবাদ গ্রহণে অক্ষমের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এটা ছিল সুফীবাদ ও ইসমায়েলিদের বাতিনি গবেষণার মতোই। অযোগ্য কেউ এসব মানসিক অনুশীলনের প্রয়াস পেলে সে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে মনোবৈকল্যের শিকার হতে পারে। কালামও একই রকম বিপজ্জনক ছিল। এটা প্রকৃত ফালসাফাহ্ না হওয়ায় মানুষকে এমন ভ্রান্ত ধারণা দিয়েছে যে, তারা বুঝি যৌক্তিক আলোচনায় নিয়োজিত, যদিও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল না। পরিণতিতে এটা কেবল অর্থহীন তাত্ত্বিক বিরোধের জন্ম দিয়েছে, যা অশিক্ষিত মানুষের বিশ্বাসকে টলিয়ে দিয়ে তাদের উদ্বেগেই নিক্ষেপ করতে পারে।
ইবন রূশদ বিশ্বাস করতেন, বিশেষ কিছু সত্যকে মেনে নেওয়া নিষ্কৃতি লাভের জন্যে আবশ্যক-ইসলামি বিশ্বের এক চমৎকার ধারণা। ফায়সাসুফরা মতবাদের ক্ষেত্রে প্রধান কর্তৃত্বের অধিকারী: কেবল তারাই ছিল ঐশীগ্রন্থ ব্যাখ্যায় সক্ষম ও এবং কোরানে বর্ণিত গভীর রোধসম্পন্ন ব্যক্তি। বাকি সবার উচিত হবে কোরানকে প্রাপ্ত রূপে গ্রহণ করা এবং আক্ষরিক অর্থে পাঠ করা। কিন্তু ফায়লাসুফরা প্রতীকী ব্যাখ্যার প্রয়াস পেতে পারে। কিন্তু এমনকি ফায়সুফদেরও অবশ্য পালনীয় বিশ্বাস (Creed) মানতে হবে, ইবন রূশদ যার তালিকা দিয়েছেন এভাবে:
১. বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও প্রতিপালক হিসাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস ।
২. ঈশ্বরের একত্ব।
৩. সমগ্র কোরানে ঈশ্বরকে প্রদত্ত জ্ঞান, ক্ষমতা, ইচ্ছা, জ্ঞান, দেখা এবং বলার। যেসব গুনের কথা উল্লেখ আছে।
৪. ঈশ্বরের অনন্যতা এবং তুলনাহীনতায় বিশ্বাস, কোরান ৪২: ৯-এ স্পষ্ট উল্লেখ আছে: “তার মতো আর কিছুই নেই।
