বিশ্বে ঈশ্বর ছাড়া যে আর কোনও সত্তা নেই সেটা দেখতে সক্ষম হন, এবং দেখেন একমাত্র তার মুখাবয়ব ছাড়া (কোরান ২৮: ৮৮) অন্য। সবকিছু আবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে…প্রকৃতপক্ষে তিনি ছাড়া আর সবকিছুই খাঁটি সত্তাবিহীন এবং [প্লেটোনিক প্রকল্পের প্রথম বুদ্ধিমত্তা হতে প্রাপ্ত সত্তার দিক হতে বিবেচনা করলে স্রষ্টার (Maker) মুখবয়বের প্রেক্ষিতে ছাড়া এর কোনও সত্তা নেই; সুতরাং একমাত্র যে জিনিসটি সত্য তা হচ্ছে ঈশ্বরের মুখাবয়ব।
বাহ্যিক বস্তুগত সত্তার পরিবর্তে কেবল যুক্তি দিয়ে অস্তিত্ব প্রমাণযোগ্য ঈশ্বর। হচ্ছেন সর্বব্যাপী বাস্তবতা এবং চূড়ান্ত অস্তিত্ব যাঁকে এর ওপর নির্ভরশীল ও অস্তিত্ব গ্রহণকারী অন্যান্য বস্তুকে আমরা যেভাবে দেখি বা অনুভব করি সেভাবে অনুভব করা যাবে নাঃ দেখার এক বিশেষ ভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে আমাদের।
শেষে আবার বাগদাদে শিক্ষকতার কাজে যোগ দিয়েছিলেন আল গাযযালি, কিন্তু এই বিশ্বাস কখনও হারাননি যে যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে কখনওই ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আল-গাযযালি তাঁর আত্মজৈবনিক প্রবন্ধ আল-মুনাদি মিন আল-দালাল (দ্য ডেলিভারেন্স ফ্রম এরার)-এ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, বিশ্বাস হারানোর বিপদোন্মুখ কাউকে রক্ষা করার উপযোগী কিছু ফালসাফাহ্ বা কালামে নেই। স্বয়ং তিনি সংশয়বাদের (সাফসাফা) কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন, যখন উপলব্ধি করেছেন সন্দেহাতীতভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা একেবারেই অসম্ভব। যে সত্তাকে আমরা ঈশ্বর বলে ডাকি তাঁর অবস্থান বোধশক্তি ও যৌক্তিক চিন্তার বাইরে, সুতরাং বিজ্ঞান বা মেটাফিজিক্স-এর পক্ষে আল্লাহর উজুদ প্রমাণ বা নাকচ কোনওটাই সম্ভব নয়। যাদের বিশেষ অতিন্দ্রীয়বাদী বা পয়গম্বরসুলভ গুণ নেই তাদের জন্যে আল-গাযযালি দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়ে ঈশ্বরের সত্তা সম্পর্কে সচেতনাবোধ গড়ে তুলতে মুসলিমদের সক্ষম করে তুলতে এক অনুশীলনের উদ্ভব ঘটিয়েছিলেন। ইসলামে এক অমোচনীয় প্রভাব রেখে গেছেন তিনি। মুসলিমরা আর কখনওই ঈশ্বরকে অন্য কোনও সত্তার মতো মনে করতে যাবে, যার অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিকভাবে তুলে ধরা সম্ভব হতে পারে। এর পর থেকে মুসলিম দর্শন আধ্যাত্মিকতার এবং ঈশ্বরের অতিন্দ্রীয় আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে।
ইহুদিবাদেও প্রভাব রেখে গিয়েছিলেন তিনি। স্প্যানিশ দার্শনিক জোসেফ ইবন সাদিক (মৃত্যু, ১১৪৩) ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ক ইবন সিনার প্রমাণ ব্যবহার করেছেন, কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে এ বিষয়টি তুলে ধরেছেন যে, ঈশ্বর স্রেফ আর একটা সত্তা নন-আমাদের স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধির জগতে ‘বিরাজিত’ এক বস্তু নন। আমরা ঈশ্বরকে বোঝার দাবি করলে তার মানে দাঁড়াবে তাঁকে সীমিত ও অপূর্ণ বোঝানো। ঈশ্বর সম্পর্কে সবচেয়ে সঠিক যে বিবৃতি আমরা দিতে পারি সেটা হচ্ছে তিনি উপলব্ধির অতীত, আমাদের সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার সম্পূর্ণ বাইরে। আমরা জগতে ঈশ্বরের ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে ইতিবাচক অর্থে কথা বলতে পারি, কিন্তু ঈশ্বরের সত্তা আল-ধাত সম্পর্কে নয়, যা সবসময় আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যাবে। টলেমিয় চিকিত্সক জুদাহ হালেভি (১০৮৫-১১৪১) আল-গাযযালিকে গভীরভাবে অনুসরণ করেছেন। যৌক্তিকভাবে ঈশ্বরকে প্রমাণ করা যাবে না; তার মানে এই নয় যে, ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন অযৌক্তিক, আসল কথা তার অস্তিত্বের যৌক্তিক উপস্থাপনের ধর্মীয় কোনও মূল্য নেই। এ থেকে অতি সামান্যই জানতে পারব আমরা: এমন একজন দূরবর্তী ও নৈর্ব্যক্তিক ঈশ্বর কীভাবে এমন অসম্পূর্ণ বস্তুজগৎ সৃষ্টি করতে পারেন বা এই পৃথিবীর সঙ্গে তাঁর অর্থবোধক কোনও সম্পর্ক আছে কিনা সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার কোনও উপায় নেই। দার্শনিকরা যখন যুক্তি প্রয়োগ করে মহাবিশ্বকে পরিচালনাকরী ঐশী বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে একীভূত হবার দাবি করেছেন তখন তারা আসলে নিজেদেরই বিভ্রান্ত করেছেন। একমাত্র পয়গম্বরদেরই ঈশ্বর সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান বা ধারণা ছিল, যাদের সঙ্গে ফালসাফাহর কোনওই সম্পর্ক ছিল না।
আল-গাযযালির মতো দর্শন বুঝতে পারেননি হালেভি, কিন্তু স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, ধর্মীয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত ঈশ্বর সম্পর্কিত জ্ঞানই নির্ভরযোগ্য। আল-গাযযালির মতো তিনিও এক বিশেষ ধরনের ধর্মীয় জ্ঞানের দাবি করেছিলেন, কিন্তু তাকে কেবল ইহুদির অধিকারভুক্ত দাবি করেছেন । তবে প্রাকৃতিক আইনের মাধ্যমে গোয়িমরা ঈশ্বর জ্ঞানের নিকটবর্তী হতে পারে বলে তিনি একে নমনীয় করার চেষ্টা চালিয়েছেন; কিন্তু তাঁর বিখ্যাত দার্শনিক রচনার দ্য কুরি-র উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন জাতির মাঝে ইসরায়েলের অনন্যতা প্রতিষ্ঠা করা। তালমুদের র্যাবাইদের মতো হালেভি বিশ্বাস করতেন মিতভোত-এর সযত্ন অনুসরণের মাধ্যমে যেকোনও ইহুদির পক্ষেই পয়গম্বরসুলভ চেতনা অর্জন সম্ভব। যে ঈশ্বরের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটবে তিনি বৈজ্ঞানিকভাবে অস্তিত্ব উপস্থাপনযোগ্য কোনও বস্তুগত বিষয় নন, বরং আবশ্যিকভাবে এক মানসিক অভিজ্ঞতা। তাঁকে এমনকি ইহুদির স্বাভাবিক সত্তার বর্ধিতরূপ হিসাবেও দেখা যেতে পারে:
