কিন্তু সত্যের প্রকৃত অনুসন্ধানীকে কী অবস্থায় ফেলেছিল তা? ঈশ্বরে গভীর অটুট বিশ্বাস কী অসম্ভব? সত্যানুসন্ধানের চাপ আল-গাযযালির উপর এমন হতাশার সৃষ্টি করেছিল যে সাময়িক বৈকল্য ঘটেছিল তাঁর। হতাশার বিপর্যয়কর অনুভূতির চাপে নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, দিশাহারা বোধ করেছেন তিনি। অবশেষে ১০৯৪ সালে আবিষ্কার করেছেন যে, তিনি কথা বলতে বা লেকচার দিতে পারছেন না:
ঈশ্বর আমার জিভ সংকুচিত করে দিলেন, আমি আর নির্দেশনা দিতে পারছিলাম না। তাই একটা নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষা দান করার জন্য নিজের ওপর জোর খাটালাম যাতে আমার অসংখ্য ছাত্র উপকৃত হতে পারে, কিন্তু আমার জিভ একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারেনি।
বিষণ্ণতার শিকারে পরিণত হলেন তিনি। চিকিৎসকরা সত্যি সত্যি তাঁর মনের গভীরে এক গভীর বিরোধ শনাক্ত করলেন, তাঁকে বললেন সুপ্ত উদ্বেগ হতে মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিশ্বাস ফিরে পেতে ব্যর্থ হলে নরক বাসের শাস্তির আশঙ্কায় আল-গাযযালি সম্মানজনক শিক্ষকতার পদ ছেড়ে সুফীদের সঙ্গে যোগ দিতে চলে যান।
এখানেই যা খুঁজছিলেন পেয়ে গেলেন তিনি। যুক্তি বিসর্জন না দিয়ে সুফীবাদের চরম রূপকে বরাবরই আবিশ্বাস করেছেন তিনি-গাযযালি আবিষ্কার করলেন, অতিন্দ্রীয় অনুশীলন এক ধরনের সরাসরি কিন্তু সহজাত বোধ সৃষ্টি করে যাকে ‘ঈশ্বর বলা যেতে পারে। বৃটিশ পণ্ডিত জন বাউকার দেখিয়েছেন, অস্তিত্বের আরবী শব্দ উজুদ এসেছে মুল ওয়াজাদা হতে: ‘সে পেয়েছে। সুতরাং, আক্ষরিক অর্থে উজুদ-এর মানে যা পাওয়া সম্ভব’: এটা গ্রিক মেটাফিজিক্যাল পরিভাষার চেয়ে অনেক সংহত ও মুসলিমদের আরও বেশি অবকাশ দেয়। যখন কোনও আরবীভাষী দার্শনিক ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়ার প্রয়াস পান তখন আরও বহু জিনিসের মাঝে ঈশ্বরকে আরেকটা বস্তু হিসাবে তুলে ধরার প্রয়োজন হয় না। তাকে পাওয়া সম্ভব প্রমাণ করতে পারলেই হয়। ঈশ্বরের উজুদের চুড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যাবে-বা যাবে না-মৃত্যুর পরে বিশ্বাসী যখন ঐশী সত্ত্বার মুখোমুখি হবে তখন, কিন্তু পয়গম্বর ও অতিন্দ্রীয়বাদীদের মতো লোক যারা ইহজীবনেই এই অভিজ্ঞতা অর্জনের দাবি করেছেন তাদের সেই দাবি অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সুফীরা অবশ্যই ঈশ্বরের উজুদের অভিজ্ঞতা লাভের দাবি করেছে: ওয়াজদ শব্দটি ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের ভাববাদী উপলব্ধির প্রকাশের প্রায়োগিক শব্দ বা ঈশ্বর যে বাস্তব, কষ্ট-কল্পনা নয় তার পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা-ইয়াকিন–দান করেছে। স্বীকার্য, তাদের দাবিতে এইসব সংবাদ ভুল বোঝা হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু সুফীদের সংসর্গে দশ বছর কাটানোর পর আল-গাযযালি আবিষ্কার করেন, মানবীয়। বুদ্ধিমত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ার অতীতে অবস্থানকারী কোনও সত্তাকে যাচাই করার একমাত্র উপায়ই হচ্ছে ধর্মীয় অভিজ্ঞতা। ঈশ্বর সম্পর্কে সুফীদের জ্ঞান যৌক্তিক বা মেটাফিজিক্যাল জ্ঞান নয়, বরং অতীতের পয়গম্বরদের সহজাত অভিজ্ঞতার অনেক কাছাকাছিঃ এভাবে সুফীরা ইসলামের মূল বোধের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে নিজেরাই এর অত্যাবশ্যক সত্যের সন্ধান পেয়েছিল।
সুতরাং, আল-গাযযালি এমন এক অতিন্দ্রীয়বাদী বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিলেন যা রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছে; পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখব রাষ্ট্রযন্ত্র সাধারণভাবে ইসলামে অতিন্দ্রীয়বাদীদের তীর্যক দৃষ্টিতে দেখেছে। ইবন সিনার মতো আল-গাযযালিও ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য জাগতিক জীবনের অতীত এক আদি আদর্শ জগতে বিশ্বাসের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। দৃশ্যমান জগৎ (আলম-আল শাহাদাহ) হচ্ছে তাঁর ভাষায় প্লেটোনিক বুদ্ধিমত্তার জগৎ আলম-আল মালাকুত এর নিম্নস্তরের অনুকৃতি, যেকোনও ফায়লাসুফই যেমন মেনে নেয়। কোরান ও ইহুদি-ক্রিশ্চানদের বাইবেল এই আধ্যাত্মিক জগতের কথাই বলেছে। মানুষ বাস্তবতার উভয় জগতেই অবস্থান করে: সে ইহজগতের পাশাপাশি আত্মার জগতেও বাস করে, কারণ ঈশ্বর ঐশী রূপ মানুষের মাঝে প্রোথিত করে দিয়েছিলেন। আল-গাযযালি তার অতিন্দ্রীয়বাদ বিষয়ক নিবন্ধ মিশকাত আল-আনওয়ার-এ সুরা নূরের ব্যাখ্যা করেছেন আগের অধ্যায়ে যেটা উদ্ধৃত করেছি। এইসব পঙক্তিতে উল্লিখিত আলো বা জ্যোতি ঈশ্বর ও অন্যান্য আনোদানকারী বস্তু: প্রদীপ, নক্ষত্রমালা, দুটোর কথাই বলে। আমাদের যুক্তিও আলো দানকারী। এটা কেবল আমাদের অন্যান্য বস্তুকে চিনতেই সক্ষম করে তোলে না, বরং ঈশ্বরের মতো স্থান ও কাল অতিক্রম করে যেতে পারে। সুতরাং এটা আধ্যাত্মিক জগতের একই বাস্তবতার অংশ। কিন্তু যুক্তি দিয়ে স্পষ্ট করার জন্যে কেবল আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক, বিশ্লেষণী ক্ষমতার দিকে ইঙ্গিত করেননি তিনি, আল-গাযযালি পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তার ব্যাখ্যাকে আক্ষরিক অর্থে বোঝা যাবে নাঃ আমরা এসব বিষয় কেবল অলঙ্কারপূর্ণ ভাষায় আলোচনা করতে পারি যা সৃজনশীল কল্পনার এখতিয়ার।
অবশ্য কারও কারও এমন ক্ষমতা থাকে যা যুক্তির চেয়ে উচ্চতর । আল গাযযালি যাকে বলেছেন ‘পয়গম্বরসুলভ চেতনা। যাদের এই গুণের অভাব রয়েছে তারা কেবল অভিজ্ঞতা অর্জন করেনি বলেই এর অস্তিত্ব অস্বীকার করা উচিত হবে না। এটা সূর-কালা কারও সঙ্গীতকে বিভ্রান্তি দাবি করার মতোই অবাস্তব ব্যাপার হবে-সঙ্গীত উপভোগ করতে পারছে না বলেই সে এমন কথা বলছে। আমরা আমাদের যুক্তি প্রয়োেগ ও কল্পনাশক্তি দিয়ে ঈশ্বর সম্পর্কে কিছুটা জানতে পারি, কিন্তু পয়গম্বর বা অতিন্দ্রীয়বাদী, যাদের ঈশ্বরকে ধারণ করার বিশেষ ক্ষমতা আছে কেবল তাদের পক্ষেই সর্বোচ্চ ধরনের জ্ঞান লাভ সম্ভব। কথাটা উচ্চমার্গীয় শোনাচ্ছে, কিন্তু অন্যান্য ধর্ম বা প্রথার অতিন্দ্রীয়বাদীরা দাবি করেছে যে জেন বা বৌদ্ধদের ধ্যানের মতো অনুশীলনে প্রয়োজনীয় সহজাত গ্রহণ ক্ষমতা বিশেষ গুণ, যা কাব্য রচনার বিশেষ যোগ্যতার সঙ্গে তুলনীয়। সবার এই অতিন্দ্রীয় প্রতিভা থাকে না। এই অতিন্দ্রীয় জ্ঞানকে আল-গাযযালি ঈশ্বর একাই অস্তিত্বমান বা তার সত্তা থাকার চেতনাবোধ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। এর পরিণাম আত্মবোধ তিরোহিত হয়ে ঈশ্বরের বিলীন হয়ে যাওয়া । অতিন্দ্রীয়বাদীরা রূপক বিশ্বের ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম, অপেক্ষাকৃত স্বল্পগুণ সম্পন্ন মরণশীলদের সন্তুষ্ট করতে হয় একে; তারা
