অন্য ইহুদিরা আরও অগ্রসর হয়েছিল। নিওপ্লেটোনিস্ট সলোমন ইবন গাবিরোল (১০২২-১০৭০) তার ফাউন্টেন অভ লাইফ-এ শূন্য হতে সৃষ্টির মতবাদ মেনে নিতে পারেননি, তিনি ঈশ্বরকে কিছু মাত্রায় স্বতঃস্ফুর্ততা ও স্বাধীন ইচ্ছার প্রদান করার জন্যে উৎসারণ তত্ত্বকে অভিযোজনের প্রয়াস পেয়েছেন। গাবিরোল দাবি করেন, ঈশ্বর উৎসারণ প্রক্রিয়া শুরু করার ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা করছেন এবং এভাবে প্রক্রিয়াটিকে কম-যান্ত্রিক করার প্রয়াস পেয়েছেন; ঈশ্বরকে তিনি একই গতিবিদ্যার অধীন না করে অস্তিত্বের নিয়ম নীতির নিয়ন্তা হিসাবে দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু বস্তু কীভাবে ঈশ্বর হতে আসতে পারে গাবিরোল সে ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। অন্যরা আরও কম উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী ছিল। বাহিয়া ইবন পাকুদাহ্ (মৃত্যু, ১০৮০) গোড়া প্লেটোনিস্ট ছিলেন না, তবে যখনই সুবিধাজনক মনে করেছেন কালামের কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। এভাবে সাদিয়ার মতো তিনিও যুক্তি দিয়েছিলেন যে, একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে ঈশ্বর বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। জগৎ অবশ্যই দুর্ঘটনাবশতঃ অস্তিত্ব লাভ করেনিঃ সেটা হবে কাগজের ওপর কালি ছড়িয়ে একটা চমৎকার অনুচ্ছেদ লেখা হয়ে গেছে কল্পনা করার মতোই হাস্যকর। ধারণা। বিশ্বের নিয়ম-শৃঙ্খলা ও উদ্দেশ্যপূর্ণতা বোঝায় যে ঐশীগ্রন্থের ভাষ্য মোতাবেক নিশ্চয়ই একজন স্রষ্টা আছেন । এই চরম আদর্শিক মতবাদের অবতারণা করে বাহিয়া কালাম ছেড়ে ফালসাফাহয় সরে গেছেন; তিনি ইবন সিনার প্রমাণ দেখিয়ে বলেছেন, এক প্রয়োজনীয় সরল সত্তার অস্তিত্ব থাকতে বাধ্য।
বাহিয়া বিশ্বাস করতেন যে, কেবল পয়গম্বর ও দার্শনিকরাই সঠিকভাবে ঈশ্বরের উপসানা করেছেন। পয়গম্বরের ঈশ্বর সম্পর্কে সরাসরি ও সহজাত জ্ঞান ছিল, দার্শনিকের থাকে তাঁর সম্পর্কে যৌক্তিক জ্ঞান। বাকি সবাই কেবল তার এক অভিক্ষেপ, নিজের কল্পনায় সৃষ্ট ঈশ্বরের উপাসনা করছে। এরা অন্ধের মতো, অন্য মানুষ দ্বারা পরিচালিত, যদি না তারা নিজেরাই ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও একত্ব প্রমাণ করার প্রয়াস না পায়। যে কোনও ফায়লাসুফের মতোই অভিজাত ছিলেন বাহিয়া, আবার তার প্রবল সুফী প্রবণতাও ছিল: যুক্তি আমাদের ঈশ্বরের অস্তিত্ব জানাতে পারে, কিন্তু তাঁর সম্পর্কে আর কিছু বলতে পারে না। শিরোনামে যেমন বোঝা যায়, বাহিয়ার নিবন্ধ ডিউটিজ অভ দ্য হার্ট ঈশ্বরের প্রতি সঠিক মনোভাব গড়ে তুলতে আমাদের সাহায্য করার জন্যে যুক্তি ব্যবহার করেছে। নিওপ্লেটোনিজমের সঙ্গে তাঁর ইহুদিবাদের কোথাও সংঘাত বাধলে তিনি স্রেফ বাদ দিয়ে গেছেন। ঈশ্বর সম্পর্কে তাঁর ধর্মীয় বোধ যেকোনও যৌক্তিক পদ্ধতিকে এড়িয়ে গেছে।
কিন্তু যুক্তি যদি ঈশ্বর সম্পর্কে আমাদের কিছুই বলতে না পারে, তাহলে ধর্মতত্ত্বীয় বিষয়ে যৌক্তিক আলোচনার যথার্থতা কী? এ প্রশ্নটি মুসলিম চিন্তাবিদ আবু হামিদ আল-গাযযালি (১০৫৮-১১১১) কে তাড়িত করেছে। ধর্মীয় দর্শনের ইতিহাসে গাযযালি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবাদ পুরুষ। তাঁর জন্ম খোরাশানে। বিশিষ্ট আশারিয় ধর্মতাত্ত্বিক জুয়াঈনির অধীনে কালাম শিক্ষা করেছিলেন তিনি, এত গভীর ছিল তাঁর জ্ঞান যে মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে বাগদাদের মর্যাদাসম্পন্ন নিযামিয়াহ মসজিদের পরিচালক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল ইসমায়েলিদের শিয়াহ্ চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে সুন্নী মতাদর্শের পক্ষাবলম্বন করা। আল-গাযযালির অবশ্য এক ধরনের অস্থির মানসিকতা ছিল যার কারণে সত্যের সঙ্গে প্রবল সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে এবং সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে গেছেন, সহজ প্রচলিত অর্ধে সন্তুষ্ট হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। আমাদের তিনি যেমন বলছেন,
প্রতিটি অন্ধকার কোণে উঁকি দিয়েছি আমি, প্রত্যেক সমস্যার ওপর আক্রমণ চালিয়েছি, ঝাঁপ দিয়েছি প্রতিটি গহ্বরে। আমি সকল গোত্রের বিশ্বাস পরখ করেছি, প্রতিটি গোষ্ঠীর গূঢ় মতবাদ উন্মোচিত করার প্রয়াস পেয়েছি। এসবই করেছি যাতে সত্য ও মিথ্যা, সঠিক ধর্ম ও বিদ্রোহী মূলক আবিষ্কারের পার্থক্য বুঝতে পারি।
সাদিয়ার মতো দার্শনিকের অনুভূত সন্দেহাতীত নিশ্চয়তার অনুসন্ধানে ছিলেন তিনি, কিন্তু ক্রমবর্ধমান হারে মোহমুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। কঠোর গবেষণা সত্ত্বেও পরম নিশ্চয়তা তাকে এড়িয়ে গেছে। তাঁর সমসমায়িকরা বিভিন্নভাবে যার যার ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও মেজাজ অনুযায়ী ঈশ্বরের সন্ধান করেছেন কালামে, ইমামের সাহায্যে, ফালসাফাহ্ আর সুফী অতিন্দ্রীয়রাদে। আল গাযযালি যেন এগুলোর প্রতিটি অনুশীলন গবেষণা করেছেন ‘আসলে এগুলো কী সেটা বোঝার প্রয়াসে। তাঁর গবেষণাভুক্ত ইসলামের চারটি প্রধান ভাষ্যের অনুসারীরা সম্পূর্ণ দৃঢ় প্রত্যয় দাবি করলেও আল-গাযযালির জিজ্ঞাসা ছিল, এই দাবি বস্তুনিষ্ঠাভাবে যাচাই করা যাবে কীভাবে?
যেকোনও আধুনিক সংশয়বাদীর মতোই আল-গাযযালি সজাগ ছিলেন যে নিশ্চয়তা একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যা বস্তুনিষ্ঠভাবে সত্য নাও হতে পারে। ফায়সুফরা বলেছে, তারা যৌক্তিক তর্কবিতর্কের মাধ্যমে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেছে, অতিন্দ্রীয়বাদীরা জোর দিয়ে বলেছে, সুফী চর্চার মাধ্যমে তারা এটা লাভ করেছে, ইসমায়েলিরা ভেবেছে এটা কেবল ইমামের শিক্ষার মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। কিন্তু যে সত্তাকে আমরা ‘ঈশ্বর’ ডাকি, তাঁকে অভিজ্ঞতা দিয়ে পরখ করা যায় না, সুতরাং আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব যে আমাদের বিশ্বাসসমূহ নিছক বিভ্রান্তি নয়? অধিকতর প্রথাগত প্রমাণাদি আল-গাযযালির কঠোর মানদণ্ডকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। কালামের ধর্মতত্ত্ববিদরা ঐশীগ্রন্থে পাওয়া প্রস্তাবনা নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন, কিন্তু এসবকে যুক্তিসঙ্গতভাবে যাচাই করা হয়নি। ইসমায়েলিরা একজন গোপন ও অগম্য ইমামের শিক্ষার ওপর নির্ভর করেছে, কিন্তু ইমাম যে ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত কী করে সেটা নিশ্চিত হব আমরা, আমরা তাঁর সন্ধান না পেলে এই অনুপ্রেরণার যুক্তি কী? ফালসাফাহ বিশেষভাবে অসন্তে ষিজনক ছিল। আল-গাযযালি তাঁর যুক্তির এক উল্লেখযোগ্য অংশ আল ফারাবি ও ইবন সিনার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেছেন। তাদের নিজস্ব বিশ্বাসে অভিজ্ঞ কারও পক্ষেই তাঁদের যুক্তি খণ্ডণ করা সম্ভব বিশ্বাস করে আল গাযযালি তিন বছর পুরোপুরি আত্মস্থ না করা পর্যন্ত ফালসাফাহ অধ্যায়ন করেছেন। তাঁর নিবন্ধ দ্য ইনকোহেরেন্স অভ দ্য ফিলোসফারস-এ তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, ফায়লাসুফরা প্রশ্নটিকে খুঁচিয়েছে। ফালসাফাহ্ জাগতিক দর্শনযোগ্য ঘটনাবলী যেমন চিকিৎসা বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা বা গণিতশাস্ত্রে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখলে তা দারুণ উপকারে আসবে বটে কিন্তু এ থেকে ঈশ্বর সম্পর্কে কিছুই জানা যাবে না। উৎসারণের মতবাদ ঠিক না ভুল সেটা কেউ প্রমাণ করবে কীভাবে? ফায়লাসুফরা কীভাবে স্থির করল যে, ঈশ্বর কেবল সাধারণ বিশ্বজনীন বিষয়ে ওয়াকিবহাল, ব্যক্তি বিশেষ সম্পর্কে নন? তারা এটা প্রমাণ করতে পারবে? ঈশ্বর অতিমহান বলে তুচ্ছ বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ হবেন, তাদের এই যুক্তি ঠিক নয়: অজ্ঞতা আবার কবে থেকে মহত্ত্বের মাপকাঠি হল? এসব প্রস্তাবনা যথার্থভাবে যাচাই করার জো নেই, সুতরাং ফায়লাসুফরা মানুষের সাধ্যের অতীত ও অনুভূতি দিয়ে যাচাই অযোগ্য জ্ঞান আহরণের প্রয়াস পেয়ে অযুক্তি ও অদার্শনিক সুলভ আচরণ করেছে।
