তবু ইবন সিনা ঈশ্বরের রূপের এই বিমূর্ত উপস্থাপনে সন্তুষ্ট হতে পারেননিঃ একে তিনি বিশ্বাসীদের অর্থাৎ সুফী ও বাতিনিদের ধর্মীয় মনস্তত্ত্বে ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। ধর্মীয় মনস্তত্ত্বে উৎসাহী ইবন সিনা পয়গম্বরত্বের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে উৎসারণের প্রটিনিয় প্রকল্পের ব্যবহার করেছিলেন। ইবন সিনা অনুমান করেছেন, দ্য ওয়ান’ হতে সত্তার অবতরণের দশটি পর্যায়ের প্রত্যেকটায় আত্মা বা দেবদূতসহ দশটি খাঁটি বুদ্ধিমত্তা টলেমিয় বলয়সমূহকে সক্রিয় করে তুলেছিল যা মানুষ এবং ঈশ্বরের মাঝে বাতিনিদের কাল্পনিক আদি আদর্শ জগতের অনুরূপ এক মধ্যবর্তী জগৎ সৃষ্টি করেছে। এইসব বুদ্ধিমত্তার কল্পনা শক্তিও রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এগুলো কল্পনার খাঁটি পর্যায় এবং কল্পনার মধ্যবর্তী এই জগতের মধ্য দিয়ে এলোমেলো কারণ দিয়ে নয়-নারী-পুরুষ ঈশ্বর সম্পর্কে পরিপূর্ণ উপলব্ধিতে পৌঁছতে পারে। বুদ্ধিমত্তার শেষ বলয়টি হচ্ছে আমাদের বলয়-দশম-ব্রিাইল নামে পরিচিত প্রত্যাদেশের পবিত্র আত্মা আলো ও জ্ঞানের উৎস। মানুষের আত্মা পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবহারিক বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশীল বুদ্ধিমতায় তৈরি এবং জিব্রাইলের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে মিশতে পারে। সুতরাং পয়গম্বরদের পক্ষে ঈশ্বর সম্পর্কে সহজাত ও কল্পনা-নির্ভর জ্ঞান অর্জন সম্ভব, ব্যবহারিক এবং এলোমেলো যুক্তির উর্ধ্বে যে বুদ্ধিমত্তা, তার অর্জিত জ্ঞানের সমপর্যায়ের হবে এই জ্ঞান। সুফীদের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে যে, মানুষের পক্ষে যুক্তি বিচার প্রয়োগ না করে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক ঈশ্বরের দর্শন লাভ সম্ভব। সিলোজিসম প্রয়োগের বদলে তারা সিম্বলিজম এবং ইমেজারির কল্পনা নির্ভর উপাদান ব্যবহার করেছে। পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) এই স্বর্গীয় জগতের সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে একীভূত হয়েছিলেন। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা যেমন দেখব, দিব্যদর্শন ও প্রত্যাদেশের এই মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দার্শনিকভাবে : ঝোঁক বিশিষ্ট সুফীদের নিজস্ব ধর্মীয় বোধ আলোচনায় সক্ষম করে তুলবে।
প্রকৃতপক্ষে, জীবনের শেষ পর্যায়ে ইবন সিনা স্বয়ং যেন অতিন্দ্রীয়বাদীতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর কিতাব আল-আশেরাত (দ্য বুক অভ অ্যাডমোনিশন্স) শীর্ষক নিবন্ধে ঈশ্বরের ক্ষেত্রে যৌক্তিক পদ্ধতির ব্যবহারের স্পষ্ট বিরোধী হয়ে উঠছিলেন, একে হতাশাব্যাঞ্জক মনে হয়েছিল তাঁর। তিনি, যাকে বলে, প্রাচ্য দর্শন’ আল-হিকমত আল-মাশারিক্কিয়ার দিকে ঝুঁকছিলেন। ভৌগোলিক পুবদিকের কথা বোঝায়নি এটা, আলোর উৎসের কথা বুঝিয়েছে। একটি নিগূঢ় নিবন্ধ রচনার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন তিনি, আলোকন (ইশরাক), যেখানে যুক্তিতর্কের ওপর নির্ভরশীল অনুশীলনের একটি পদ্ধতি গড়ে তুলবেন বলে ভেবেছিলেন। আমরা জানি না শেষ পর্যন্ত নিবন্ধটি লিখতে পেরেছিলেন কিনাঃ যদি লিখে থাকেন, তাহলে নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু পরবর্তী অধ্যায়ে যেমন দেখব, মহান ইরানি দার্শনিক ইয়াহিয়া সুহরাওয়ার্দি ইশরাকি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে ইবন সিনা পরিকল্পিত দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার সংশ্লেষ ঘটেছিল।
কালাম ও ফালসাফাহর অনুশীলন ইসলামি সাম্রাজ্যের ইহুদিদের মাঝে একই রকম বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জাগিয়েছিল। প্রথমবারের মতো তারা ইহুদিবাদে মেটাফিজিকাল অনুমান নির্ভর উপাদান যোগ করে আরবী ভাষায় নিজস্ব দর্শন রচনা শুরু করেছিল। মুসলিম ফায়লাসুফদের বিপরীতে ইহুদি দার্শনিকরা দর্শন বিজ্ঞানের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে শুধু ধর্মীয় বিষয়াদিতে মনোযোগ দিয়েছিল। ইসলামের ভাষাতেই ইসলামের চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে হবে ভেবে বাইবেলের ব্যক্তিক ঈশ্বরকে ফায়লাসুফদের ঈশ্বরের সমান করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। মুসলিমদের মতো তাঁরা ঐশীগ্রন্থ ও তালমুদে ঈশ্বরের মানবীয় রূপ দেখে উদ্বিগ্ন ছিল; নিজেদের জিজ্ঞেসা করেছে, এই ঈশ্বর কীভাবে দার্শনিকদের ঈশ্বর হতে পারেন । স্বভাবতই ভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল তারা, তারা মুসলিম চিন্তাবিদদের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল ছিল। এভাবে ইহুদিবাদে প্রথম দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদানের দায়িত্ব গ্রহণকারী সাদিয়া ইবন জোসেফ (৮৮২-৯২) একজন তালমুদিস্ট ও মুতাযিলিও ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নিজস্ব শক্তি বলে যুক্তি ঈশ্বর-জ্ঞান অর্জন করতে পারে। ফায়লাসুফের মতো ঈশ্বর সম্পর্কে যৌক্তিক ধারণা অর্জনকে মিতভাহ, অর্থাৎ ধর্মীয় দায়িত্ব হিসাবে দেখেছেন তিনি। কিন্তু আবার মুসলিম যুক্তিবাদীদের মতো ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তার মনে এতটুকু সংশয় ছিল না। সাদিয়ার কাছে স্রষ্টা ঈশ্বরের অস্তিত্ব এত নিশ্চিত মনে হয়েছিল যে, তার বুক অভ বিলিফস অ্যান্ড অপিনিয়নস গ্রন্থে বিশ্বাস নয় বরং ধর্মীয় সন্দেহের সম্ভাবনাই প্রমাণের প্রয়োজন বোধ করেছিলেন তিনি।
সাদিয়া যুক্তি দেখিয়েছেন যে, কোনও ইহুদির প্রত্যাদেশের সত্যকে মেনে নেওয়ার বেলায় যুক্তির ওপর চাপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ঈশ্বর পুরোপুরিভাবে মানবীয় যুক্তিতে সুগম্য। শূন্য হতে সৃষ্টির ধারণা যে দর্শনিক সমস্যায় পূর্ণ ও যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব এ কথা মেনে নিয়েছিলেন সাদিয়া, কারণ ফায়লাসুফদের ঈশ্বর আকস্মিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিবর্তন সুচিত করতে সমর্থ নন। কী করে আধ্যাত্মিক একজন ঈশ্বর বস্তুগত একটা জগতের উৎস হতে পারেন? এখানেই আমরা যুক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে যাই এবং মেনে নিতে হয় যে, প্লেটোনিস্টদের বিশ্বাস অনুযায়ী বস্তু চিরন্তন নয়, বরং সময়ের বিস্তারে এর একটা সূচনা ছিল। একমাত্র এটিই ঐশীগ্রন্থ ও সাধারণ বুদ্ধির সঙ্গে সামজ্ঞস্যপূর্ণ সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। একবার এ ব্যাখ্যা মেনে নিলে ঈশ্বর সম্পর্কে অন্যান্য তথ্য বের করতে পারি আমরা। সৃষ্ট জগৎ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিকল্পিত; এর প্রাণ এবং শক্তি আছে: সুতরাং এর স্রষ্টা ঈশ্বরের অবশ্যই প্রজ্ঞা, প্রাণ ও ক্ষমতা থাকতে বাধ্য। এইসব গুণাবলী ক্রিশ্চানদের ট্রিনিটি মতবাদে প্রকাশিত পৃথক hypostases নয়, বরং ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্যমাত্র। আমাদের মানবীয় ভাষা ঈশ্বরের পরিচয়কে পর্যাপ্তভাবে প্রকাশ করতে পারে না বলে আমরা এভাবে তাঁকে বিশ্লেষণ করতে বাধ্য হই ও তাঁর চরম সারল্যকে যেন নষ্ট করি। আমরা ঈশ্বর সম্পর্কে যথাসম্ভব নিখুঁত হতে চাইলে কেবল সঠিকভাবে এটুকুই বলতে পারি যে, তিনি আছেন। সাদিয়া অবশ্য ঈশ্বরের সব ইতিবাচক বর্ণনাই নিষিদ্ধ করেননি, দার্শনিকদের দূরবর্তী নৈর্ব্যক্তিক ঈশ্বরকে বাইবেলের ব্যক্তিক মানবীয় ঈশ্বরের উর্ধ্বেও স্থান দেননি। উদাহরণ স্বরূপ, তিনি জগতে আমাদের প্রত্যক্ষ করা দুঃখকষ্টের ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়াস পাওয়ার সময় তালমুদ ও প্রজ্ঞা রচয়িতাদের শরণ নিয়েছেন, বলেছেন দুঃখ-কষ্ট পাপের শাস্তি, আমাদের বিনয়ী করে তোলার জন্যে আমাদের তা শুদ্ধ ও নিয়মনিষ্ঠ করে তোলে। প্রকৃত ফায়লাসুফ এব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হবে না, কারণ এখানে ঈশ্বরকে বড় বেশি মানবীয় রূপ দেওয়া হয়েছে ও তার ওপর পরিকল্পনা ও ইচ্ছার মতো গুণ আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু সাদিয়া ঐশীগ্রন্থের প্রকাশিত ঈশ্বরকে ফালসাফাহর ঈশ্বরের চেয়ে নিম্নস্তরের হিসেবে দেখেননি। পয়গম্বরগণ যে কোনও দার্শনিকের চেয়ে শ্রেয়তর ছিলেন। শেষ বিচারে যুক্তি কেবল বাইবেলের শিক্ষাকেই পদ্ধতিগতভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পেতে পারে।
