আমাদের মনের কাজের ধারা বিবেচনার মাধ্যমে ইবন সিনার ‘প্রমাণের শুরু। আমরা জগতের দিকেই চোখ ফেরাই, বিভিন্ন অসংখ্য উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত যৌক্তিক জিনিস বা সত্তা দেখতে পাই। যেমন কোনও গাছ বাকল, কাঠ, মজ্জা, শাখা-প্রশাখা আর পাতার সমন্বয়। কোনও কিছু বোঝার চেষ্টা করার সময় আমরা একে ‘বিশ্লেষণ করি, একে ভাগ করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছাই যার পর আর ভাগ করা যায় না। সাধারণ উপাদানসমূহ আমাদের কাছে মুখ্য ঠেকে এবং এদের সমন্বয়ে গঠিত যৌগিক বস্তুকে মনে হয় গৌণ। সুতরাং যেসব জিনিস আর ছোট করা যায় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে আমরা অবিরাম সারল্যকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। ফালসাফাহর একটা নীতি ছিল, বাস্তবতা যৌক্তিকভাবে সামজ্ঞস্যপূর্ণ সমগ্রের সৃষ্টি করে; এর মানে সারল্যের জন্যে আমাদের অন্তহীন সন্ধান এক ব্যাপক মাত্রায় বস্তুসমূহে প্রতিফলিত হতে হবে। সকল প্লেটোনিস্টের মতো ইবন সিনাও মনে করেছেন আমাদের চারপাশে দেখা জটিলতা (multiplicity) নিশ্চয়ই কোনও আদি এককের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের মন যেহেতু যৌগিক বস্তুকে গৌণ এবং সৃষ্ট বলে দেখে, এই প্রবণতা নিশ্চয়ই বাইরের কোনও এক সরল ও উচ্চতর সত্তা দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। জটিল বস্তু অনিশ্চিত, নির্ভরশীল এবং নির্ভরশীল বস্তুসমূহ যে বস্তুর ওপর তারা নির্ভরশীল সেগুলোর চেয়ে নিম্নস্তরের, ঠিক যেমন সন্তান-সন্ততিরা মর্যাদার দিক থেকে জন্মদাতা পিতার নিম্নপর্যায়ের। এমন কিছু যা স্বয়ং সরল তাকেই দার্শনিকগণ প্রয়োজনীয় সত্তা’ বলেন, অর্থাৎ এটা অস্তিত্বের জন্যে কারও ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। তেমন কোনও সত্তা কী আছেন? ইবন সিনার মতো ফায়লাসুফ নিশ্চিতভাবে ধরে নিয়েছিলেন যে সৃষ্টিজগৎ যৌক্তিক, এবং এই যৌক্তিক বিশ্বের একজন অকারণ সত্তা থাকতে বাধ্য, অস্তিত্বের ধারাক্রমের সর্বোচ্চ বিন্দুতে একজন অটল চালক (আন-মুভড মুভার)। নিশ্চয়ই কারণ এবং ফলাফলের কোনও ধারা কিছু দিয়ে শুরু হয়েছিল। এমন একজন পরম সত্তার অনুপস্থিতির মানে হবে আমাদের মন সামগ্রিকভাবে বাস্তবতার প্রতি সজানুভূতিশীল নয়। সুতরাং, সেটাই আবার বোঝাবে যে এই মহাবিশ্ব সামঞ্জস্যপূর্ণ ও যৌক্তিক নয়। যে পরিপূর্ণ সরল সত্তার ওপর জটিল অনিশ্চিত বাস্তবতা সামগ্রিকভাবে নির্ভরশীল ধর্মগুলো তাকেই ‘ঈশ্বর’ বলে আখ্যায়িত করেছে। যেহেতু এটা সকল বস্তুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, সেহেতু একেবারে নিখুঁত এবং শ্রদ্ধা ও উপাসনার যোগ্য। কিন্তু এর অস্তিত্ব যেহেতু অন্য যেকোনও কিছুর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাই সত্তার ধারায় এটা স্রেফ আরেকটা বস্তুমাত্র নয় ।
ঈশ্বর স্বয়ং যে সরল, দার্শনিক ও কোরান এ বিষয়ে একমত: তিনি একক। সুতরাং এরপরই কথা আসে যে তাঁকে বিভিন্ন অংশ বা গুণাবলীতে ভাগ করা বা বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। যেহেতু এই সত্তাটি চূড়ান্তরূপে সরল, সেহেতু এর কোনও কারণ নেই, গুণাবলী নেই, কোনও সময়গত মাত্রা নেই এবং তার সম্পর্কে বলার মতো কিছুই আমাদের নেই। ঈশ্বর বাস্তব চিন্তাভাবনার বিষয়বস্তু হতে পারেন না, কারণ আমাদের মস্তিষ্ক অন্য সবকিছু যেভাবে বিবেচনা করে। তাকে সেভাবে বিবেচনা করতে পারবে না। ঈশ্বর যেহেতু আবিশ্যিকভাবে। অদ্বিতীয়, সেহেতু স্বাভাবিক অনিশ্চিত অর্থে বিরাজিত কোনও কিছুর সঙ্গেই তার তুলনা করা যাবে না। এই অবস্থায় আমরা যখন ঈশ্বর সম্পর্কে কথা বলি তখন আলোচনাযোগ্য সবকিছু থেকে তাকে আলাদা রাখার জন্যে আমাদের উচিত নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করা। কিন্তু ঈশ্বর যেহেতু সকল বস্তুর উৎস, আমরা তাঁর সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় স্বীকার করে নিতে পারি । আমরা যেহেতু জানি যে শুভের অস্তিত্ব আছে, সুতরাং ঈশ্বর নিশ্চয়ই অত্যাবশ্যক বা ‘প্রয়োজনীয়’ শুভ (Goodness); যেহেতু আমরা জানি যে প্রাণ, ক্ষমতা ও জ্ঞানের অস্তিত্ব আছে, ঈশ্বর নিশ্চয় অত্যাবশ্যক ও সম্পূর্ণ অর্থে জীবন্ত, ক্ষমতাবান ও বুদ্ধিমান। অ্যারিস্টটল শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, ঈশ্বর যেহেতু নিখুঁত বা খাঁটি কারণ-যুগপত যুক্তি প্রয়োগের ভঙ্গি এবং চিন্তার লক্ষ্য এবং বিষয়-কেবল নিজেকে নিয়েই ভাবতে পারেন তিনি; নিম্ন পর্যায়ের অনিশ্চিত বাস্তবতার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেন না। এটা সর্ব বিষয়ে জ্ঞানী এবং সৃষ্ট জগতে উপস্থিত ও সক্রিয় বলে কথিত প্রত্যাদেশের ঈশ্বরের প্রতিকৃতির সঙ্গে মেলে না। ইবন সিনা একটা আপোসের প্রয়াস পেয়েছিলেন: ঈশ্বর এতই সুমহান যে তার পক্ষে মানুষের মতো তুচ্ছ বিশেষ কোনও সত্তার জ্ঞানে ও তাদের কাজে অবতরণ করা সম্ভব নয়। অ্যারিস্টটল যেমন বলেছিলেন, এমন কিছু বিষয় আছে যেগুলো দেখার চেয়ে না দেখা ভালো। ঈশ্বর ভূমি ও পৃথিবীর তুচ্ছ স্বল্পস্থায়ী জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেকে নোংরা করতে পারেন না। কিন্তু আত্ম-জ্ঞানের চিরন্তন প্রক্রিয়ায় তিনি তাঁর নিকট হতে উৎসারিত সব কিছু এবং তিনি যাদের অস্তিত্ব দিয়েছেন সেসব বুঝতে পারেন। তিনি জানেন যে তিনিই অনিশ্চিত প্রাণীর কারণ। তাঁর চিন্তা এতই নিখুঁত যে চিন্তা ও তাকে বাস্তবে রূপদান একই সঙ্গে সংঘটিত হয়ে থাকে। সুতরাং, নিজেকে নিয়ে তাঁর চিরন্তন ভাবনা ফায়লাসুফদের বর্ণিত উৎসারণের প্রক্রিয়ার সূচনা করে। কিন্তু ঈশ্বর কেবল সাধারণভাবে বিশ্বজনীন অর্থে আমাদের এবং এই জগতকে জানেন, তিনি ব্যক্তি বিশেষকে নিয়ে ভাবেন না।
