মদ মিশিয়ে ডিম পোচ, কানাডিয়ান বেকন, আলু ভাজা আর কফি বানিয়ে রেখেছে নিম। নাস্তার সময় খুব কমই কথাবার্তা হলো আমাদের মধ্যে। এরপর ফ্রেঞ্চ জানালা খুলে নিমের এস্টেটটা দেখলাম।
প্রায় একশ’ গজ দূরেই সমুদ্রতীর। পুরোটাই ভোলা, শুধু একদিকে উঁচু হেজের বেড়া দেয়া। ডিম্বাকৃতির ফোরার বেসিন আর সেটার নীচে যে সুইমিংপুলটা আছে তাতে এখনও কিছু পানি দেখা যাচ্ছে।
বাড়ি সংলগ্ন বিশাল একটি পক্ষিশালা আছে, মোটা তারে তৈরি এই পক্ষিশালাটির একটা গম্বুজও আছে, তারগুলোতে সাদা রঙ করা। বাইরের তুষার তারের জাল ভেদ করে ভেতরের ছোটো ছোটো গাছগুলোর উপর পড়েছে। গাছের শাখা-প্রশাখায় ওড়াওড়ি করছে নানান ধরণের পাখি। বিশাল আকারের বেশ কয়েকটি ময়ূর মাটিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে মনে হলো কোনো মেয়েকে ছুরিকাঘাত করা হচ্ছে বুঝি। একেবারে নার্ভে আঘাত করে সেটা।
পক্ষিশালার দরজা খুলে নিম আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। বিভিন্ন জাতের পাখির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো আমাকে।
“পাখিরা প্রায়শই মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে থাকে, আমাকে বললো সে। আমি এখানে ফ্যালকনও রেখেছি, তবে অন্য একটি জায়গায়। কালোস তাদেরকে দিনে দু’বার মাংস খাওয়ায়। তাদের মধ্যে পেরিগ্রিন আমার সবচাইতে প্রিয়। অন্য অনেক প্রাণীর মতোই পাখিদের মধ্যে স্ত্রী পাখিগুলোই শিকারের কাজ করে থাকে।”
“তাই নাকি?” আমি এটা জানতাম না।
“আমার সব সময়ই মনে হয়েছে, আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকালো নিম, “তোমার মধ্যে কিলার ইন্সটিংক্ট রয়েছে।”
“আমার মধ্যে? ঠাট্টা করছো?”
“সেটার যথাযথ প্রকাশ ঘটে নি এখনও,” সে বললো। “তবে সেটা জাগিয়ে তোলার পরিকল্পনা করছি আমি। আমার মতে, এটা তোমার ভেতরে পুরোপুরি সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে।”
“কিন্তু আমাকেই লোকজন খুন করার চেষ্টা করছে, তাকে মনে করিয়ে দিলাম।
“যেকোনো খেলার মতোই,” আমার দিকে আবারো তাকালো নিম, গ্লাভ পরা হাতে আমার চুল স্পর্শ করলো সে, “তোমাকে বেছে নিতে হবে তুমি রক্ষণাত্মক খেলবে নাকি আক্রমনাত্মক খেলবে। আমি অবশ্য পরেরটার কথাই বলবো। তুমি কেন তোমার প্রতিপক্ষকে পাল্টা হুমকি দিচ্ছো না?”
“আমি তো জানিই না আমার প্রতিপক্ষ কে!” একেবারে উদভ্রান্ত হয়ে বললাম।
“আহ, তুমি কিন্তু জানো, রহস্যময়ভাবে জবাব দিলো নিম। “প্রথম থেকেই তুমি জানতে। আমি কি তোমাকে প্রমাণ করে দেখাবো এটা?”
“দেখাও।” পক্ষিশালা থেকে আমরা বের হয়ে ফিরে এলাম বাড়ির ভেতরে।
কোট খুলে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসলাম। আমার পা থেকে বুট জোড়া খুলে রাখলো নিম। তারপর দেয়াল থেকে আমার আঁকা বাইসাইকেল আরোহীর। পেইন্টিংটা খুলে আমার কাছে নিয়ে এসে একটা চেয়ারে বসলো।
“কাল রাতে তুমি ঘুমাতে যাবার পর,” বললো নিম, “এই পেইন্টিংটা অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। আমার মধ্যে দেজা-ভু অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিলো। দেজা-ভুর অর্থ তো জানোই, মানে আগে দেখেছি বলে মনে হওয়া, আমি হ্যাঁ-না বলার আগেই সে বলে ফেললো। “এটা আমার মধ্যে একটা খচখচানি তৈরি করলো। তুমি তো জানোই সমস্যাটা নিয়ে কতোটা ভেবেছি। আজ সকালেই সেটা সমাধান করতে পেরেছি আমি।”
ওভেনের পাশে একটা কাঠের কাউন্টারের কাছে গেলো সে, একটা ড্রয়ার থেকে কয়েক পেটি খেলার তাস নিয়ে চলে এলো আমার কাছে। প্রতিটি পেটি থেকে জোকার বের করে টেবিলের উপর রাখলো। আমার সামনে রাখা তাসগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
একটা জোকারের মাথায় ক্যাপ পর, হাতে বেল, বসে আছে সাইকেলের উপর। সে ঠিক আমার আঁকা পেইন্টিংটার মতোই পোজ দিয়ে আছে। তার সাইকেলের পেছনে একটা কবরের ফলক, তাতে লেখা আছে আর.আই.পি। দ্বিতীয় তাসের ছবিটাতেও একই জোকার, তবে আয়নায় প্রতিফলিত হওয়া দুটো ছবি। আমার ছবিটার মতোই তবে এখানে সাইকেলের উপর উল্টো করে বসে আছে একটি কঙ্কাল। তৃতীয়টা টারোট কার্ডের একটি বোকা, হাসিখুশি মেজাজে একটা খাদের উপর থেকে লাফ দিতে উদ্যত।
নিমের দিকে তাকাতেই সে হেসে ফেললো।
“তাসের যে জোকারটা আছে সেটা ঐতিহ্যগতভাবেই মৃত্যুর সাথে সংশ্লিষ্ট,” বললো সে। “তবে এটা পুণর্জন্মেরও প্রতীক, এবং পতিত হবার আগে মানবজাতির নিষ্কলুষতার। আমি তাকে হলি গ্রেইলের নাইট বলে ভাবতে পছন্দ করি। যাকে সহজ-সরল আর অপরিপক্ক হতে হবে, যে সৌভাগ্য সে খুঁজে বেড়াচ্ছে আচমকা সেটার মুখোমুখি হবার জন্য। মনে রেখো, তার মিশন হলো মানবজাতিকে রক্ষা করা।”
“তো?” বললাম আমি, যদিও আমার সামনে যে কার্ডগুলো রাখা আছে তার সাথে আমার আঁকা ছবিটার মিল দেখতে পেয়ে খানিকটা ভড়কে আছি। এখন সাইকেলে চড়া লোকটার অবিকল ছবিগুলো দেখতে পাচ্ছি আমি।
“তুমি জানতে চেয়েছিলে তোমার প্রতিপক্ষ কে,” খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো নিম। “আমার মনে হয় এই কার্ডগুলো আর তোমার পেইন্টিংয়ের সাইকেল আরোহী একই সাথে তোমার প্রতিপক্ষ এবং মিত্র।”
“তুমি সত্যিকারের কোনো লোকের কথা নিশ্চয় বলছো না?”
নিম ধীরে ধীরে মাথা দোলালো। “তুমি তো তাকে দেখেছোই, তাই না?”
“কিন্তু সেটা নিছকই কাকতালীয় ঘটনা।”
“হয়তো,” একমত পোষণ করলো সে। “কাকতালীয় ব্যাপারগুলো অনেক ধরণের হতে পারে। একটার কথা বলি, তোমার পেইন্টিংটা সম্পর্কে অবগত আছে এরকম কেউ প্রলুব্ধও করতে পারে তোমাকে। অথবা এটা অন্য কোনো ধরণের কাকতালীয় ঘটনা,” হেসে বললো সে।
