কবিতাটা ভালো করে আবারো পড়ে জিনিসটা ধরতে পারলাম।
“ছন্দের ধরণটা অদ্ভুত,” গর্বিতভাবেই বললাম তাকে।
ভুরু কুচকে ফেললো নিম। আমার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে কবিতাটা পড়েই হেসে ফেললো সে। “তাই তো,” আমার কাছে কাগজটা ফিরিয়ে দিয়ে বললো। “আমি অবশ্য এটা ধরতে পারি নি। কলমটা নিয়ে এটা লেখো।”
আমি তাই করলাম :
Key-Four-Mate (A-B-C),
Metaphor-Late-Endlessly (B-C-A),
Fate-Three-Door (C-A-B)
“তাহলে ছন্দের ধরণটা এরকম,” বললো নিম। আমার লেখার নীচে কলি করলো সেটা। “এবার অক্ষরের বদলে সংখ্যা ব্যবহার করে সেগুলো যোগ করো।” ও যেখানে অক্ষরগুলো লিখেছে তার পাশে আমি সংখ্যাগুলো লিখে যোগ করলাম :
ABC ১২৩
BCA ২৩১
CAB ৩১২
মোট ৬৬৬
“এটা তো অ্যাপোক্যালিপসে বর্ণিত সেই প্রাণীটার সংখ্যা : ৬৬৬!” আমি বললাম।
“সেটাই,” বললো নিম। “তুমি যদি প্রতি রো-এর সংখ্যাগুলো পাশাপাশিও যোগ করো একই যোগফল পাবে। এটাকে কি বলে জানো, মাই ডিয়ার?…এটাকে বলে ম্যাজিক স্কয়ার’। আরেকটা গাণিতিক খেলা। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন যে ক’টা নাইট টুর ডেভেলপ করিছলেন তার মধ্যে সিক্রেট ম্যাজিকস্কয়ার লুক্কায়িত ছিলো। এ ব্যাপারে তোমার বেশ ভালো আগ্রহই আছে। তুমি প্রথম দেখাতেই এরকম একটা জিনিস খুঁজে পেয়েছে যা আমি নিজেও দেখতে পাই নি।”
“তুমি দেখতে পাও নি?” মনে মনে একটু খুশিই হলাম। “তাহলে তুমি আমাকে কি খুঁজতে বলেছিলে?” আবারো কাগজটা পড়ে দেখলাম ওখানে আরো কিছু বিষয় লুকিয়ে আছে কিনা।
“শেষ দুটো লাইন বাদে প্রতিটি লাইনের প্রথম অক্ষরটা খেয়াল করো, বললো নিম।
কবিতাটির দিকে চোখ বুলাতেই আমার সারা গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো।
“কি হয়েছে?” আমার হতভম্ব অবস্থা দেখে বললো নিম। কাগজটার দিকে নির্বাক চেয়ে রইলাম। তারপর আস্তে করে কলমটা নিয়ে লিখলাম সেটা।
“J-A-D-0-U-B-E/C-V।”
“অবশ্যই, নিমের পাশে মূর্তির মতো বসে পড়লে সে বললো, Jadoube, এই ফরাসি দাবা টার্মটির মানে হলো আমি স্পর্শ করি, আমি ঠিক করি। সোজা ভাষায় বললে স্পর্শ করে ঠিক করা। বেলার মাঝখানে দাবা খেলোয়াড় যদি তার কোনো খুঁটির অবস্থান বদলাতে চায় তাহলে এটা বলে সে। আর C.V. অক্ষর দুটো তোমার নামের আদ্যাক্ষর। তার মানে ঐ গণক তোমাকে একটা মেসেজ দিয়েছে। সে হয়তো তোমার সাথে যোগাযোগ করতে চাইছে। আমি বুঝতে পারছি…কিসের জন্যে তোমাকে এতোটা বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে,” বললো সে।
“তুমি বুঝতে পারছো না,” কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললাম তাকে। “ফিস্ক মারা যাবার আগে জনসম্মুখে শেষ যে কথাটা বলেছিলো সেটা হলো Jadotube।”
.
বলার দরকার নেই রাতে আমার দুঃস্বপ্ন হলো। একটা খাড়া পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে আমি বাইসাইকেল আরোহীকে অনুসরণ করছি। চারপাশে ভবনগুলো এতোটাই কাছাকাছি যে আকাশ দেখতে পাচ্ছি না। পথটা আরো সরু হতে শুরু করলো, অন্ধকার বাড়তে লাগলো ক্রমশ। প্রতিটি মোড়ে এসেই আমি বাইসাইকেলটা হারিয়ে ফেলছি, দেখতে পাচ্ছি অন্য একটা খাড়া পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে ওটা ছুটে চলেছে। অবশেষে একটা কানাগলিতে তাকে কোণঠাসা করে ফেললাম। মাকড়। যেমন তার জালে শিকার ধরার জন্য অপেক্ষায় থাকে লোকটা ঠিক সেভাবে আমার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে ঘুরে লোকটা তার মুখ থেকে মাফলারটা সরিয়ে ফেলতেই দেখতে পেলাম একটা নরকঙ্কালের মুণ্ড, চোখের কোটর একেবারে ফাঁকা। আমার চোখের সামনে সেই কঙ্কাল মুখটায় মাংস জন্মাতে শুরু করলো, শেষপর্যন্ত যে চেহারাটা ফুটে উঠলো সেটা ঐ মহিলা গণকের।
ঘুম ভেঙে গেলে বুঝতে পারলাম ঘেমেটেমে একাকার, বিছানায় উঠে বসলাম। সারা শরীর কাঁপছে। আমার ঘরে যে ফায়ারপ্লেসটা আছে তাতে এখনও নিভু নিভু করে আগুন জ্বলছে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে নীচের তুষারাবৃত লনটা দেখতে পেলাম। সেটার মাঝখানে ফোয়ারার মতো বিশাল মার্বেলের একটি বেসিন, সেটার নীচে একটি সুইমিংপুল। লনটার পরেই আছে সমুদ্র। সকালের আলোয় সেটা ধূসর রঙের দেখাচ্ছে।
আগের দিন কি হয়েছিলো সেটা পুরোপুরি মনে করতে পারলাম না। নিম আমাকে অনেক বেশি মদ দিয়েছিলো। এখন মাথা ধরে আছে। পা টেনে টেনে বাথরুমে গিয়ে গরম পানির ট্যাপটা ছেড়ে বাথটাবে কিছু বাবলবাথ দিয়ে ফেনা তৈরি করে ওটাতে সারা শরীর এলিয়ে দিলাম। সাবানের গন্ধটা ভালো লাগলো না আমার কাছে। বাথটাবে শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই আমাদের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিলো সেগুলো একটু একটু করে মনে পড়তে লাগলো, ফলে আবারো সুতীব্র ভীতি জেঁকে বসলো আমার মধ্যে।
আমার শোবার ঘরের দরজার বাইরে কিছু জামা-কাপড় রাখা : উলের সোয়েটার আর হলুদ রঙের রাবারবুট। সেগুলো পরে নিলাম। নীচের তলায় নামার সময়ই আমার নাকে চমৎকার গন্ধ এসে লাগলো। এরইমধ্যে নাস্তা তৈরি হয়ে গেছে।
স্টোভের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিম, মোটা কাপড়ের শার্ট, জিন্স আর ঠিক আমারই মতোন হলুদ রঙের বুট পরে আছে সে।
“আমি আমার অফিসে কিভাবে ফোন করতে পারি?” জিজ্ঞেস করলাম তাকে।
“এখানে তো কোনো ফোন নেই,” পেছন ফিরে বললো সে। “তবে আজ সকালে আমার কেয়ারটেকার কালোস যখন সবকিছু পরিস্কার করতে এসেছিলো। তখন তাকে বলে দিয়েছি তোমার অফিসে ফোন করে যেনো বলে দেয় আজ তুমি আসতে পারবে না। আজ দুপুরে তোমাকে আমি নিজে গাড়িতে করে শহরে। পৌঁছে দিয়ে আসবো, সেইসাথে তোমার অ্যাপার্টমেন্টটা কিভাবে আরো সুরক্ষিত করা যায় সেটাও দেখিয়ে দেবো। এইফাঁকে চলো ভালো কিছু খাওয়াদাওয়া করি, পাখি দেখি। এখানে একটা পক্ষিশালা আছে, বুঝলে।”
