“ওহ্ না,” এরপর কি বলবে সেটা বুঝতে পেরে বললাম আমি। “তুমি ভালো করেই জানো আমি ভবিষ্যত দেখা আর সাইকিক ক্ষমতার মতো আজগুবি জিনিসে বিশ্বাস করি না।”
“করো না?” হাসতে হাসতেই বললো নিম। “তুমি এইসব কার্ড না দেখেই যেভাবে ছবিটা এঁকেছো তাতে করে বাধ্য হয়ে আমাকে অন্য একটা ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে। তোমার কাছে আমি একটা স্বীকারোক্তি করতে চাই। তোমার বন্ধ লিউলিন, লোলানি আর ঐ গণকের মতো আমিও মনে করি মণ্ডগেইন সার্ভিসের রহস্যের সাথে তোমার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া আর কি ব্যাখ্যা হতে পারে তোমার জড়িত হবার ব্যাপারে? হতে পারে নিয়তি তোমাকে আগে থেকেই মনোনীত করে রেখেছে প্রধান ভূমিকা পালন-”
“ভুলে যাও এটা,” ঝট করে বললাম। আমি এই রূপকথার দাবা সেটের পেছনে ছুটছি না! লোকজন আমাকে খুন করার চেষ্টা করছে, কিংবা নিদেনপক্ষে আমাকে হত্যাকাণ্ডে ফাঁসিয়ে দিতে চাইছে, এটা কি তুমি বুঝতে পারছে না?” প্রায় চিৎকার করেই বললাম কথাটা।
“অবশ্যই বুঝতে পেরেছি,” বললো নিম। কিন্তু তুমি একটা বিষয় মিস করে গেছে। সেরা রক্ষণাত্মক কৌশল হলো সবচাইতে ভালো আক্রমণ।”
“কোনোভাবেই না, তাকে বললাম। “এটা নিশ্চিত তুমি আমাকে বলির পাঠা বানানোর ধান্দা করছো। তুমি ঐ দাবাবোর্ডটি পেতে চাও, সেজন্যে আমাকে ব্যবহার করতে চাইছে। ইতিমধ্যেই এটা আমার ঘাড়ের উপর এসে পড়েছে, এই নিউইয়র্ক শহরেই। যেখানে আমি কাউকে চিনি না, জানি না, কাউকে সাহায্যের জন্যে পাবো না সেই বিদেশ বিভূইয়ে গিয়ে এইসব ফালতু জিনিস খুঁজে বেড়াবো না। হয়তো তুমি একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হয়ে নতুন কোনো অ্যাডভেঞ্চারে মেতে থাকতে চাচ্ছে। কিন্তু একবারও ভাবছো না ওখানে আমি সমস্যায় পড়লে কি হবে? তোমার তো কোনো ফোন নাম্বারও নেই যে কল করে সাহায্য চাইবো। হয়তো ভাবছো এরপর আমি গুলি খেলে তোমার ঐ কারমেলাইট নানেরা এসে আমার সেবা করবে? কিংবা নিউইয়র্ক স্টকএক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এসে মৃতদেহ কুড়াতে শুরু করে দেবে?”
“হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয় না,” বললো নিম। সে সব সময়ই শান্ত থাকে। “কোনো মহাদেশেই আমার কন্ট্যাক্ট নেই এ কথাটা সত্য নয়, অবশ্য তুমি এটা জানো না কারণ এতোটাই ব্যস্ত যে এই ইসুটা এড়িয়ে যাচ্ছো। তুমি আমাকে ঐ তিন বানরের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছো, যারা নিজেদের চোখ-কান বন্ধ রেখে শয়তানের হাত থেকে রেহাই পাবার চেষ্টা করে।”
“আলজেরিয়াতে আমেরিকার কোনো দূতাবাস পর্যন্ত নেই,” দাঁতে দাঁত পিষে বললাম। “সম্ভবত রাশিয়ান অ্যাম্বাসিতে তোমার কন্ট্যাক্ট আছে, তারা অবশ্য খুশিমনেই আমাকে সাহায্য করতে চাইবে?” সত্যি বলতে এটা পুরোপুরি অসম্ভবও নয়, কারণ নিম আংশিক রাশিয়ান এবং গ্রিক। তবে আমি যতোটুকু জানি তার পূর্বপুরুষের দেশ দুটোতে কোনো আত্মীয়স্বজনের সাথে তার কোনো যোগাযোগই নেই।
“সত্যি বলতে কি, তুমি যে দেশে যাচ্ছে সেখানকার কিছু অ্যাম্বাসিতে আমার কন্ট্যাক্ট আছে,” একটু ঠাট্টাচ্ছলেই বললো কথাটা। “তবে সে কথায়, আসছি। তুমি আমার সাথে একমত হবে যে, পছন্দ করো আর না করোক এই ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়েছে। এই হলিগ্রেইল অশেষ মারাত্মক হয়ে উঠেছে। এর হাত থেকে বাঁচার মতো কোনো শক্তি তোমার ক নেই যদি না তুমি আগেভাগে এটায় জড়িয়ে পড়ো।”
“আমাকে পার্সিফল বলে ডাকো,” তিক্তভাবে বললাম আমি। “তোমার কাছে সাহায্য চাইবার আগে আমার আরো ভালো করে ভেবে দেখা উচিত ছিলো। সমস্যা সমাধানের বেলায় তোমার পদ্ধতিগুলো সব সময় এরকমই হয়।”
নিম উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে টেনে দাঁড় করালো। চোখে চোখ রাখলে আমার। তার ঠোঁটে দুর্বোধ্য হাসি। আমার কাঁধে দু’হাত রাখলো সে।
“J’adoube,” বললো সে।
নিঃশব্দ চাল
পজিশনাল : একটি চালের সাথে সম্পর্কিত, দক্ষতা অথবা ট্যাক্টিক্যালের তুলনায় স্ট্রাটেজি বিবেচনা করে খেলার ধরণ। এভাবে পজিশনাল চাল এক ধরণের নিঃশব্দ চাল হয়ে ওঠে।
নিঃশব্দ চাল : এমন একটি চাল যা চেক দেয় না, পাকড়াও করে না, এর মধ্যে সরাসরি কোনো হুমকিও থাকে না…এটা কালো চুঁটিগুলোকে বেশ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ এনে দেয়।
— ইলাস্ট্রেটেড ডিকশনারি অব চেস
এডওয়ার্ড আর. ব্রেস
.
কোথাও একটা ফোন বাজছে। ডেস্ক থেকে মাথা তুলে চারপাশে চেয়ে দেখলাম। আমি যে এখনও প্যান অ্যাম ডাটা সেন্টারেই আছি সেটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লেগে গেলো। এখনও নিউইয়ার্স ইভ চলছে। দূরের দেয়ালে বিরাট ঘড়িটা বলছে রাত সোয়া এগারোটা বাজে। এখনও তুষার পড়ছে। আমি এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। খুব অবাক হলাম কেউ ফোনটা তোলে নি বলে।
ডাটা সেন্টারের দিকে তাকালাম। শত শত কেবল চলে গেছে সাপের মতো একেবেঁকে। এখানে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কারোর চলাফেরার শব্দও কানে আসছে না। জায়গাটা একেবারে মর্গের মতো নিস্তব্ধ।
তারপরই মনে পড়ে গেলো মেশিন অপারেটরদেরকে বলেছিলাম তারা একটু বিশ্রাম নিতে পারে, যতক্ষণ আছি আমিই নজরদারি করার কাজটা করবো। কিন্তু সেটা তো কয়েক ঘণ্টা আগের কথা। সুইচবোর্ডের দিকে যেতে যেতে বুঝতে পারলাম তাদের অনুরোধটা ছিলো একটু অদ্ভুত। “আমরা যদি টেপ ভল্টে গিয়ে একটু কাপড় বোনার কাজ করি তাহলে কি আপনি কিছু মনে করবেন?” তারা আমাকে বলেছিলো। কাপড় বোনা?
