আমি এটা জানি। পাইওনিয়ার্স প্যালাস তরুণ প্রতিভাবান দাবা খেলোয়াড়দের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেবার কাজ করে। সেখান থেকেই ভবিষ্যত দাবা মাস্টারদের আর্বিভাব ঘটে থাকে। রাশিয়াতে দাবা খেলা নিছক জাতীয় খেলা নয়। এটা তাদের কাছে এ বিশ্বের সবচাইতে মস্তিষ্কপ্রসূত খেলা বিশ্বরাজনীতিরই একটি বর্ধিত রূপ। রাশিয়ানরা মনে করে এটা তাদের সুদীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখে।
“সোলারিন যদি পাইওনিয়ার্স প্যালাসে থেকে থাকে তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়। খুব শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থন তার রয়েছে?” বললাম আমি।
“তাই তো থাকার কথা,” জবাবে বললো নিম। গাড়িটা পথের শেষ সীমানায় এসে পড়লো। আমাদের সামনে এখন বিশাল রট আয়রনের একটা গেট। নিম গেটের কাছে থেমে ড্যাশবোর্ডে একটা সুইচ টিপলে গেটটা খুলে গেলো। আমরা প্রবেশ করলাম তার এস্টেটে। মনে হলো আমি বুঝি কোনো স্নো কুইনদের। জগতে ঢুকে পড়ছি।
“সত্যি বলতে কি,” নিম বললো, “কর্তৃপক্ষের পছন্দের খেলোয়াড়দের সাথে ইচ্ছে করে হেরে যেতে অস্বীকৃতি জানায় সোলারিন। রাশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে এটা খুবই কড়া একটি নিয়ম। তাদের কথামতো না চললে কোনো টুনামেন্টে স্থান পাওয়া যায় না। সারা বিশ্বে কঠোর সমালোচনার শিকার হলেও তারা এখনও এ কাজ করা থেকে বিরত থাকে নি।”।
ড্রাইভওয়েটা একেবারেই পরিস্কার, দীর্ঘদিন এ পথ দিয়ে কোনো গাড়ি ঢুকেছে বলে মনে হলো না। বাগানের সামনে বড় বড় গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অবশেষে আমরা বৃত্তাকারের একটি চত্বরে এসে পড়লাম, ওটার মাঝখানে বিশাল একটি ফোয়ারা। আমাদের সামনে ম্যানশনটা চাঁদের আলোয় স্নাত। ছাদের উপরে বেশ কয়েকটি চিমনি।
“সেজন্যেই, গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে বললো নিম। “আমাদের বন্ধু সোলারিন দাবা ছেড়ে পদার্থ বিজ্ঞানে ভর্তি হয়। বিশ বছর বয়স থেকেই মাঝেমধ্যে ছোটোখাটো কিছু টুনামেন্ট বাদে বড় কোনো টুর্নামেন্টে সে আর খেলে নি।”
আমরা গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। একহাতে পেইন্টিং আর অন্যহাতে চাবি দিয়ে দরজা খুলে দিলে আমরা ঢুকে পড়লাম ভেতরে।
বিশাল এন্ট্রান্স হলে দাঁড়িয়ে আছি। সুইচ টিপে বিশাল আকারের একটি ঝারবাতি জ্বালিয়ে দিলো সে। মেঝেটা স্লেটের হলেও এমনভাবে পলিশ করা হয়েছে দেখে মার্বেল বলে মনে হয়। বাড়ির ভেতরটা এতো ঠাণ্ডা যে আমার নাক-মুখ দিয়ে নির্গত বাতাস জমে যাচ্ছে। মেঝেতেও দেখতে পেলাম বরফের পাতলা আস্তর পড়ে আছে। বেশ কয়েকটা ঘর পেরিয়ে আমাকে রান্নাঘরে নিয়ে এলো নিম। এটা বাড়ির একেবারে পেছন দিকে অবস্থিত। জায়গাটা দারুণ। পেইন্টিংটা নামিয়ে রেখে দেয়ালে থাকা কিছু ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিলো সে। সোনালি আলোয় ছেয়ে গেলো পুরো ঘরটা।
রান্নাঘরটা বিশাল, সম্ভবত ত্রিশ বাই পঞ্চাশ ফিটের মতো হবে। পেছনের দেয়ালে কতোগুলো ফ্রেঞ্চ জানালা, সেটা দিয়ে বরাফাচ্ছিত লন আর ফেনিল সমুদ্র দেখা যাচ্ছে মায়াবি চাঁদের আলোয়। দেয়ালের একপাশে বিশাল একটি ওভেন। তার বিপরীতে আরো বিশাল একটি ফায়ারপ্লেস। তার সামনে রয়েছে। ওক কাঠের একটি গোলটেবিল আর আট-দশটি চেয়ার। ঘরের চারপাশে আরো কিছু চেয়ার আর আরামদায়ক সোফা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
ফায়ারপ্লেসটায় আগুন ধরিয়ে দিলো নিম, সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা আরো বেশি আলোকিত হয়ে উঠলো। নিম যখন শেরি মদের একটি বোতল খুলতে ব্যস্ত আমি তখন বুট জুতো খুলে আরাম করে সোফায় বসে পড়লাম। নিজের জন্যে একগ্লাসে মদ ঢেলে আমার জন্যেও এক গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে পাশে এসে বসলো সে। আমি আমার গায়ের কোটটা খুলে ফেলার পর সে তার গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলো চিয়ার্স করার জন্য।
মন্তগ্লেইন সার্ভিস এবং এরফলে যতো অ্যাডভেঞ্চার তোমার জীবনে বয়ে আনবে তার উদ্দেশ্যে,” বলেই এক চুমুক পান করলো সে।
“হুম। জিনিসটা দারুণ,” আমি বললাম।
“এটা স্পেনের শেরি মদ,” বললো নিম। “লোকজন এটা পান করার জন্যে পাগল হয়ে থাকে। সাধারণ শেরি এর সামনে কিছুই না।”
“আশা করি তুমি আমার জন্যে এ ধরণের কোনো অ্যাডভেঞ্চারের পরিকল্পনা করো নি, তাকে বললাম। “আগামীকাল সকালে আমাকে অবশ্যই কাজে যেতে হবে।”
“আমি সুন্দরের জন্যে মরিতে পারি, মরিতে পারি সত্যের জন্য, একটা কবিতার লাইন আওড়ালো নিম। “প্রত্যেক মানুষের জীবনে এমন কিছু হিনি থাকে যার জন্যে সে জীবনও দিতে পারে। আমি এ জীবনে এমন কোনো প্রাণীর দেখা পাই নি যে অপ্রয়োজনীয় একটা কাজে ঐ জঘন্য এডিসনে গিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে আগ্রহী!”
“এখন কিন্তু তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে।”
“মোটেই না, চামড়ার জ্যাকেট আর সিল্কের স্কাটা খুলে ফেললো নিম। জ্যাকেটের ভেতরে লাল টকটকে একটি সোয়েটার পরা, দেখতে দারুণ লাগছে তাকে। হাত-পা ছড়িয়ে বসলো এবার। “তবে রহস্যময় কোনো আগন্তুক যদি ফাঁকা ইউএন ভবনে আমাকে অনুসরণ করে চলে আসে তাহলে আমি আরেকটু বেশি মনোযোগ দেবো। বিশেষ করে তার সতর্ক করে দেবার পর পরই যদি কিছু মানুষ খুন হয়ে থাকে তাহলে তো কথাই নেই।”
“সোলারিন কেন আমাকে বেছে নিয়েছে বলে মনে করো তুমি?” জিজ্ঞেস করলাম তাকে।
“আমি তো ভেবেছিলাম এই প্রশ্নের উত্তর তোমার কাছ থেকেই পাবো, শেরিতে চুমুক দিয়ে ফায়ারপ্লেসের দিকে তাকালো সে।
