গাড়িটা গ্রাম্য এলাকায় ঢুকে পড়লে বাতাস আরো ঠাণ্ডা অনুভূত হলো। তবে মন দিয়ে নিমের কথা নিতে লাগলাম।
“প্রথমে তোমাকে মন্তগ্লেইন সার্ভিস সম্পর্কে বলবো,” বলতে শুরু করলো সে। “গল্পটা অনেক বড়, তবে জেনে রেখো, এটা আসলে শার্লেমেইনের দাবাবোর্ড…”
“ওহ!” চমকে উঠে আমি সোজা হয়ে বসলাম। এ সম্পর্কে আমি শুনেছি কিন্তু নামটা জানতাম না। আমি আলজেরিয়াতে যাবো শুনেই লিলির মামা লিউলিন আমাকে এর কথা বলেছিলো। সে বলেছে আমাকে দিয়ে সে এই দাবাবোর্ডের একটা খুঁটি সংগ্রহ করতে চায়।”
“সে যে এরকমটি চাইবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই,” হেসে বললো নিম। “ওগুলো একেবারেই দুপ্রাপ্য, আর মূল্যের কথা বলতে গেলে অপরিসীম। বেশিরভাগ লোকে বিশ্বাসই করে না ওগুলোর অস্তিত্ত্ব আছে। লিউলিন ওগুলোর সম্পর্কে কিভাবে জানতে পারলো? ওগুলো যে আলজেরিয়াতে আছে সেটাই বা বুঝলো কি করে?” নিম খুব স্বাভাবিক চালে কথাগুলো বললেও আমি বুঝতে পারছিলাম আমার জবাবের আশায় উন্মুখ হয়ে আছে সে।
“লিউলিন একজন অ্যান্টিক ডিলার, তাকে বললাম। “তার একজন কাস্টমার যেকোনো মূল্যে এর খুঁটিগুলো সংগ্রহ করতে চাইছে। আলজেরিয়াতে তাদের একজন লোক আছে, সে-ই বলেছে ঠিক কোথায় ওগুলো আছে।”
“আমার তাতে সন্দেহ আছে,” বললো নিম। “কিংবদন্তী বলে, ওগুলো শত বছরেরও বেশি আগে মাটির নীচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো, তারও এক হাজার বছর আগে থেকেই ওগুলোর কোনো হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না।”
রাতের অন্ধকারে আমাদের গাড়িটা চলতে শুরু করলে নিম আমাকে মুরিশ রাজা-বাদশাহ্ আর ফরাসি নানদের উদ্ভট গল্প বলে গেলো। এক রহস্যময় শক্তির খোঁজে শত শত বছর ধরেই অনেকে এটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। অবশেষে কিভাবে পুরো সার্ভিসটা মাটির নীচে লুকিয়ে ফেলা হলে আর কখনই সেটা দেখা যায় নি, সবই বললো সে। নিম আমাকে এও বললো বিশ্বাস করা হয় ওটা আলজেরিয়ার কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে। যদিও সে বললো না এরকম বিশ্বাস করার কারণ। কি।
তার গল্প বলা শেষ হলে আমাদের গাড়িটা চলে এলো গভীর বনজঙ্গল সদৃশ্য একটি জায়গায়। সেই বনের মাঝখান দিয়ে রাস্তাটা ক্রমশ বেশ নীচু হয়ে আবার উপরে উঠতে শুরু করলে দেখতে পেলাম আমাদের চোখের সামনে কালচে সাগরের উপরে সাদা ধবধবে চাঁদ। বনের ভেতর থেকে পেঁচার ডাকও শুনতে পেলাম। নিউইয়র্ক থেকে জায়গাটা অবশ্যই অনেক দূরে হবে।
“আমি অবশ্য লিউলিনকে বলে দিয়েছি এসবের মধ্যে আমি নেই,” বললাম তাকে। “স্বর্ণ আর হীরা-জহরত খচিত নক্সা করা দাবার খুঁটিগুলো সংগ্রহ করা তো চোরাকারবারের মধ্যেই পড়ে”।
আমরা প্রায় সাগরের উপরে গিয়ে পড়তাম আরেকটু হলে, নিম দ্রুত আচমকা মোড় নিয়ে নিলো। গতি কমিয়ে নিয়ন্ত্রনে আনতে পারলো গাড়িটা।
“তার কাছে কি একটা খুঁটি আছে নাকি?” বললো সে। “তোমাকে সেরকম কিছু দেখিয়েছে?”
“আরে না,” বললাম তাকে। “তুমি নিজেই না বললে ওগুলো শত শত বছর ধারে লাপাত্তা হয়ে আছে। সে আমাকে একটা ফটোগ্রাফ দেখিয়েছে। মনে হয়। বিবলিওথেক ন্যাশনেইলে রাখা কোনো খুঁটির ছবি।”
“আচ্ছা,” বললো নিম, মনে হলো কিছুটা শান্ত হয়ে উঠলো সে।
“আমি তো বুঝতে পারছি না সোলারিন আর দু দুটো খুনের সাথে এর কি সম্পর্ক থাকতে পারে,” তাকে বললাম।
বুঝিয়ে বলছি, নিম বললো। “তবে ওয়াদা করতে হবে কথাটা অন্য কাউকে বলতে পারবে না।”
“ঠিক এ কথাটা লিউলিনও আমাকে বলেছিলো।”
আমার দিকে মুখ বিকৃত করে তাকালো নিম। “সোলারিন কেন তোমার সাথে যোগাযোগ করেছিলো, তোমাকে হুমকি দিয়েছিলো সেটা যদি বলি তাহলে হয়তো তুমি আরো বেশি সতর্ক হয়ে উঠবে। মনে রেখো, এসবই সে করেছে দাবার খুঁটিগুলোর জন্য।”
“অসম্ভব,” আমি বললাম। “আমি এ জীবনেও ওগুলোর কথা শুনি নি। এখনও বলতে গেলে ওগুলোর সম্পর্কে কিছুই জানি না। এই ফালতু গেমের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।”
“তবে সম্ভবত,” গাড়িটা সাগরতীর ধরে ছুটে যাচ্ছে এখন, “কেউ মনে করছে এর সাথে তোমার সম্পর্ক রয়েছে।”
.
রাস্তাটা ধীরে ধীরে সাগরতীর থেকে সরে বেশ খানিকটা বেঁকে গেছে। এখন দু’ধারে দেখা যাচ্ছে সুন্দর করে ছাটা গাছ, দশ ফিট উঁচু হবে সেগুলো। সীমানার ভেতরে বিশাল একটি এস্টেট। মাঝেমাঝেই বৃক্ষের ফাঁক দিয়ে ভেতরের বরাফাচ্ছিদ লনের পেছনে চমৎকার একটি ম্যানশন দেখতে পাচ্ছি। নিউইয়র্কের তাছাকছি এরকম কোনো জায়গা আমি কখনও দেখি নি। এটা আমাকে স্কট ফিটজারেল্ডের কথা মনে করিয়ে দিলো।
সোলারিন সম্পর্কে বলতে লাগলো নিম।
“দাবা সংক্রান্ত ম্যাগাজিন আর জার্নাল পড়া ছাড়া তার সম্পর্কে বেশি কিছু জানি না,” বললো সে। “আলেক্সান্ডার সোলারিন ছাব্বিশ বছর বয়সী সোভিয়ে ইউনিয়নের একজন নাগরিক, জন্মেছিলো ক্রিমিয়াতে, জায়গাটাকে সভ্যতার পাঠস্থান বলা যায়, অবশ্য বর্তমান সময়ে ওটা চরম অসভ্য আর বর্বর এলাকা হিসেবে পরিচিত। একজন এতিম ছিলো সে, ফলে সরকারী পষ্ঠপোষকতায় বাচ্চাদের আশ্রমে বড় হয়েছে। নয় কি দশ বছর বয়সে স্থানীয় দাবা খেলার একজন হেডমাস্টারকে নাস্তানাবুদ করে দেয়। এই খেলাটা সে চার বছর বয়স থেকে খেলতে শুরু করে। কৃষ্ণসাগরের এক জেলের কাছ থেকে এটা শিখেছিলো। দ্রুতই সে ঠাঁই পায় পাইওনিয়ার্স প্যালাস-এ।”
