আমার অফিসের কাঁচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে সেক্রেটারি মেয়েটাকে দেখলাম।
“আমি ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছি,” চাপা কণ্ঠে বললাম তাকে। “বিগত দু’দিনে বলতে গেলে আমার চোখের সামনে দু দু’জন লোক খুন হয়ে গেছে! আমাকে সাবধান করে বলা হয়েছে এর সাথে নাকি আমার দাবা খেলা দেখতে যাওয়া সম্পর্ক রয়েছে
“ওয়াও,” বললো নিম। “তুমি করছোটা কি, মোটা কাপড়ের মধ্য দিয়ে কথা বলছো নাকি? তোমার কথা তো শুনতেই পাচ্ছি না। তোমাকে কে সাবধান করেছে? জোরে বলো।”
“এক গণক আমাকে বলেছিলো আমি বিপদে পড়বো,” তাকে বললাম। “আর এখন সেটাই সত্যি হয়ে গেছে। এইসব খুনখারাবি
“মাই ডিয়ার ক্যাট,” হাসতে হাসতে বললো নিম। “একজন গণক?”
“কেবল ঐ মহিলাই নয়,” বললাম আমি। “তুমি কি আলেক্সান্ডার সোলারিনের নাম শুনেছো?” কিছুক্ষণ চুপ মেরে রইলো নিম।
“দাবা খেলোয়াড়?” অবশেষে বললো সে।
“সে আমাকে বলেছে…” আমার গলা ধরে এলো, ভালো করেই জানি এখন যা বলবো সেটা যেকোনো কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না। আষাঢ়ের গল্প বলে মনে হবে।
“তুমি কি করে আলেক্সান্ডার সোলারিনকে চেনো?” জানতে চাইলো নিম।
“গতকাল আমি একটা দাবা টুনামেন্টে গেছিলাম। সেখানেই সোলারিন আমার কাছে এসে বলেছে আমি বিপদের মধ্যে আছি। কথাটা খুব জোর দিয়ে বলেছিলো সে।
“সম্ভবত তোমাকে অন্য কেউ ভেবে এটা বলেছে,” বললো নিম। তবে তার কথা শুনে মনে হলো কেমন জানি উদাস হয়ে গেছে।
“হয়তো,” স্বীকার করলাম আমি। “কিন্তু আজ সকালে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে সে আমাকে পরিস্কার করে বলে দিয়েছে
“একটু দাঁড়াও,” বাধা দিয়ে বললো নিম। “আমার মনে হয় আমি সমস্যাটা বুঝতে পেরেছি। গণক আর রাশিয়ান দাবা খেলোয়াড় তোমাকে রহস্যময় সতর্কবাণী দিয়েছে। তোমার চোখের সামনে লাশ ভেসে বেড়াচ্ছে। আজ তুমি কি খেয়েছো?”
“উম। স্যান্ডউইচ আর কিছু দুধ।”
“খাদ্যাভাব প্যারানইয়াকে উসকে দেয়,” খুশিমনে বললো নিম। “তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নীচে চলে আসো, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে তোমার অফিসের নীচে গাড়ি নিয়ে আসছি। আমরা দু’জন পেট ভরে ভালো কিছু খাবার খাবো তারপর দেখবে এইসব ফ্যান্টাসি উধাও হয়ে গেছে।”
“ওগুলো কোনো ফ্যান্টাসি নয়,” বললাম আমি। যদিও নিম আসছে বলে বেশ স্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। নিদেনপক্ষে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছাতে পারবো।”
“এটার বিচার করবো আমি,” জবাবে বললো সে। এখন যেখানে দাঁড়িয়ে। আছি সেখান থেকে তোমাকে খুব হালকাঁপাতলা দেখাচ্ছে। তবে যে লাল রঙের সুটটা পরে আছে সেটাতে বেশ আকর্ষণীয় লাগছে তোমাকে।
অফিসের চারপাশে তাকালাম, তারপর জানালা দিয়ে নীচের রাস্তার দিকে। অন্ধকার হয়ে আসছে। সবেমাত্র জ্বলে উঠেছে স্টটল্যাম্পগুলো। তবে ফুটপাতে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। বাসস্ট্যান্ডের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম সেটার পাশে একটা ফোনবুথের ভেতর থেকে একজন আমার দিকে হাত নাড়াচ্ছে।
“ভালো কথা, মাই ডিয়ার,” ফোনে বললো নিম, “তুমি যদি বিপদ-আপদ নিয়ে এতোটাই চিন্তিত থাকো তাহলে সন্ধ্যার পর বাতি জ্বালিয়ে জানালার সামনে এভাবে না দাঁড়ানোই ভালো। এটা নিছক সাজেশন, অন্য কিছু না।” কথাটা বলেই সে ফোন রেখে দিলো।
.
নিমের গাঢ় সবুজ রঙের মরগান গাড়িটা কন এডিসনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি দৌড়ে উঠে পড়লাম তাতে।
নিম পরে আছে রঙচটা জিন্স আর দামি ইতালিয়ান লেদার জ্যাকেট। গলায় সাদা রঙের একটা সিল্কের স্কার্ফ পেচাননা। তার মাথার চুলগুলো ছোটো ছোটো করে ছাটা।
“আমরা তোমার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে থামবো যাতে করে তুমি গরম কোনো কিছু পরে নিতে পারো,” বললো নিম। “তাছাড়া ভেতরে কেউ ঢুকেছে কিনা সেটাও দেখে আসা যাবে।” তার চোখ দুটো অদ্ভুত জেনেটিক স্বাক্ষর বহন করছে। দুটোর রঙ দুরকম। একটা ধূসর আরেকটা নীল। সেই চোখে আমার দিকে যখন তাকায় একটু অস্বস্তি বোধ করি।
আমার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গাড়িটা থামলে নিম গাড়ি থেকে নেমে এসে দাড়োয়ান বসওয়েলের হাতে বিশ ডলারের একটা নোট গুঁজে দিলো।
“আমরা খুব অল্প সময় থাকবো, গুডফেলল,” বললো নিম। “গাড়িটা একটু দেখে রেখো, কেমন? এটা নিছক কোনো গাড়ি নয়, এটা আমার পারিবারিক ঐতিহ্য।”
“অবশ্যই স্যার,” ভদ্রভাবে বললো বসওয়েল।
ডেস্ক থেকে আমার মেইলটা নিয়ে নিলাম। ফুঘ্রাইট কোন থেকে পাঠানো হয়েছে সেটা। এর ভেতরেই আছে প্লেনের টিকেটসহ অন্যান্য কাগজপত্র। নিম আর আমি লিফটে করে চলে এলাম আমার অ্যাপার্টমেন্টে।
নিম আমার দরজার দিকে তাকিয়ে বললো ভেতরে কেউ ঢোকে নি। কেউ যদি আমার অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতো তাহলে চাবি ছাড়া ঢুকতে পারতো না। নিউইয়র্কের অন্যসব অ্যাপার্টমেন্টের মতো আমার দরজা দুই ইঞ্চির স্টিলের আর একটি ডাবল ডেড বোল্টের।
আমাকে নিয়ে ভেতরে লিভিংরুমে চলে এলো নিম।
“আমি বলি কি, মাসে একবার কাজের লোক দিয়ে ঝাড়ামোছা করে নিতে পারো,” বললো সে। “তোমার ঘরে এতো বিশাল কালেকশান আছে অথচ ধুলোয় মলিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।” বইয়ের স্তূপ থেকে একটা বই তুলে নিয়ে পাতা ওল্টাতে শুরু করলো সে।
ক্লোজেট হাতরিয়ে একটা খাকি প্যান্ট, আইরিশ ফিশারম্যান সোয়েটার বের করে নিলাম। জামা পাল্টানোর জন্য যখন বাথরুমে যাবো দেখতে পেলাম পিয়ানোর সামনে বসে আনমনে টুংটাং করছে নিম।
