ব্ৰদস্কির চোখে চোখ রাখলো সোলারিন। তারপর শীতল হাসি দিলো সে। “আপনি সেক্রেটারিকে জানাতে পারেন আমরা ইতিমধ্যেই কন্ট্যাক্টের সাথে যোগাযোগ করে ফেলেছি, মাই ডিয়ার ব্ৰদস্কি,” সে বললো।
কিছুই বললো না ব্ৰদস্কি। সোলারিন এরপর কি বলে সেজন্যে অপেক্ষা করছে। কিন্তু সোলারিনকে চুপ থাকতে দেখে সে হিসহিসিয়ে বললো, “আমাদেরকে সাসপেন্সের মধ্যে রাখবে না।”
কোলের উপর রাখা ব্রিফকেসটার দিকে তাকিয়ে ব্ৰদস্কির দিকে ফিরলো। সোলারিন। তার মুখ নির্বিকার। যেনো মুখোশ পরে আছে।
“ঘুঁটিগুলো আলজেরিয়াতে আছে,” বললো সে।
.
দুপুরের মধ্যে আমার অবস্থা একেবারে যা তা হয়ে গেলো। নিমকে ফোনে পাবার চেষ্টা করে গেলাম উদভ্রান্তের মতো কিন্তু পেলাম না। চোখের সামনে শুধু সলের মৃতদেহটা দেখতে লাগলাম। এইসব ঘটনার মানে কী ভেবে ভেবে আরো বেশি উদভ্রান্ত হয়ে পড়লাম আমি।
কন এডিসনে নিজের অফিসের দরজা লক করে জানালা দিয়ে ইউএন ভবনের প্রবেশপথটা দেখতে লাগলাম, রেডিও ছেড়ে প্রায় সব স্টেশনের বর শুনলাম, কিন্তু কোথাও সলের খবরটা পেলাম না। ইউএন ভবনে পুলিশের গাড়ি ছুটে যেতেও দেখলাম না।
লিলিকে ফোন করলাম কিন্তু সে বাইরে বেরিয়ে গেছে। হ্যারির অফিস থেকে আমাকে বলা হলো সে নাকি জরুরি একটা কাজে বাফেলোতে গেছে, রাতের আগে ফিরবে না। পুলিশকে নিজের পরিচয় লুকিয়ে ফোন করার কথাও ভাবলাম কিন্তু ভালো করেই জানি লাশটা খুঁজে পাবার পর তারা আমার উপস্থিতির কথাটাও জেনে যাবে।
দুপুরের পর আমি আমার সেক্রেটারিকে দিয়ে কিছু স্যান্ডউইচ কিনে আনতে পাঠালাম। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠলো। আমার বস লিসেল ফোন করেছে। তাকে খুশি বলে মনে হলো আমার।
“আপনার টিকেট এসে গেছে, ভেলিস,” বললো সে। “আগামী সোমবার প্যারিসে যাচ্ছেন। ওখানে এক রাত থেকে চলে যাবেন আলজিয়ার্সে। আজ দুপুরে আমি আপনার অ্যাপার্টমেন্টে টিকেট আর সমস্ত কাগজপত্র পাঠিয়ে দিচ্ছি। ঠিক আছে?” তাকে আমি বললাম ঠিক আছে, পাঠিয়ে দিক।
“আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে না খুশি হয়েছেন, ভেলিস। ঐ অন্ধকার। মহাদেশে যাবার ব্যাপারে দ্বিতীয় কোনো চিন্তাভাবনা করবেন নাকি?”
“মোটেই না,” বেশ দৃঢ়তার সাথে বললাম আমি। “এটাকে আমি অবকাশ হিসেবে ব্যবহার করবো। নিউইয়র্কে থাকতে থাকতে হাপিয়ে উঠেছি।”
“বেশ ভালো। তাহলে আপনার যাত্রা শুভ হোক। বন ভয়েজ। পরে আবার বলবেন না আমি আপনাকে সাবধান করে দেই নি।”
ফোনটা রেখে দিলাম মি। কয়েক মিনিট পরই আমার সেক্রেটারি ফিরে এলো স্যান্ডউইচ আর দুধ নিয়ে। দরজা বন্ধ করে স্যান্ডউইচে কয়েক কামড় দেবার পরই খাওয়ার রুচি হলো না। তেল ব্যবসার উপরে বইপুস্তক পড়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেললাম। চুপচাপ নিজের ডেস্কে বসে রইলাম আমি।
বেলা তিনটার দিকে সেক্রেটারি আবার দরজায় নক করে ঢুকলো। তার হাতে একটা ব্রিফকেস।
“নীচের তলায় গার্ডের কাছে এই ব্রিফকেসটা রেখে গেছে এক লোক, মেয়েটা আমায় বললো। “সাথে একটা নোটও দিয়েছে।” নোটটা আমি কাঁপা কাঁপা হাতে নিয়ে সেক্রেটারির চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম।
দরজা বন্ধ করেই পেপার নাইফ দিয়ে এনভেলপটা ছিঁড়ে নোটটা বের করলাম।
“তোমার কিছু কাগজ আমি সরিয়ে রেখেছি,” নোটে বলা আছে। দয়া করে তোমার অ্যাপার্টমেন্টে একা যেও না। কোনো স্বাক্ষর নেই। তবে আমি বুঝতে পারলাম নোটটা কে পাঠিয়েছে। নোটটা পকেটে রেখে ব্রিফকেসটা খুলে দেখি সব কিছুই ঠিকঠাক আছে শুধু সোলারিনের উপরে যে নোটটা লিখেছিলাম সেটা নেই।
.
সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টার সময়ও আমি অফিসে বসে রইলাম। সেক্রেটারি টাইপরাইটারের সামনে বসে আছে, যদিও অফিসের প্রায় সবাই চলে গেছে এ সময়। মেয়েটাকে খামোখা একটা কাজ দিয়ে বসিয়ে রেখেছি যাতে করে আমি একা না হয়ে যাই। ভাবছি আমার অ্যাপার্টমেন্টে কিভাবে যাবো। এখান থেকে মাত্র এক বুক দূরে ওটা। মনে হচ্ছে ক্যাব ডাকাটা বোকামি হবে।
সুইপার এসে গেছে অফিসঘরগুলো পরিস্কার করার জন্য। একটা অ্যাস্ট্রে যখন আমার ওয়েস্টবাস্কেটে ফেলছে সে তখনই ফোনটা বেজে উঠলো। তড়িঘড়ি ফোনটা তুলতে গিয়ে সেটা ডেস্ক থেকে প্রায় ফেলেই দিতে যাচ্ছিলাম।
“অনেক কাজ করছে মনে হয়, তাই না?” পরিচিত একটা কণ্ঠ বললো। কণ্ঠটা শুনতে পেয়ে যারপরনাই স্বস্তি পেলাম।
“এটা যদি সিস্টার নিম না হয়ে থাকে, নিজের কণ্ঠটা নিয়ন্ত্রনে এনে বললাম, “তাহলে বলতে বাধ্য হচ্ছি একটু দেরিতে ফোন করেছে। অফিস থেকে এইমাত্র বের হতে যাচ্ছিলাম। আমি এখন জিওর একজন নান হয়ে গেছি।”
“এটা নির্ঘাত একই সাথে করুণা আর অপচয় বলে মনে হচ্ছে,” খুশি হয়ে বললো নিম।
“তুমি কি করে জানলে এতো দেরি করে আমি অফিসে থাকবো আজ?” জানতে চাইলাম।
“তোমার মতো কাজপাগল মেয়ে এই শীতের দিনে আর কোথায় যাবে?” বললো সে। “এতোক্ষণে তুমি নিশ্চয় বিশ্বের তেল সরবরাহ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে যাচ্ছিলে…এখন বলো কেমন আছো, মাই ডিয়ার? বুঝতে পারছি আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছো।” সুইপার লোকটা চলে যাবার আগপর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমি।
“কী আর বলবো, ভীষণ বিপদে পড়ে গেছি,” বলতে শুরু করলাম।
“এটাই তো স্বাভাবিক। তুমি সব সময়ই সমস্যার মধ্যে থাকো,” শীতলকণ্ঠে বললো নিম। “এ কারণেই তোমাকে আমার এতো ভালো লাগে।”
