.
“ব্ৰদস্কি তো রেগেমেগে একাকার হয়ে আছেন, নার্ভাস হয়ে বললো গোগল। সোলারিনকে ঢুকতে দেখেই অ্যালগোনকুইন হোটেলের লবির চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো সে। “আপনি কোথায় ছিলেন?” জানতে চাইলো গোগল। তার মুখ। ফ্যাকাশে হয়ে আছে।
“একটু মুক্ত বাতাস নিতে গেছিলাম,” শান্তকণ্ঠে বললো সোলারিন। “এটা সোভিয়েত রাশিয়া নয়, বুঝলে। নিউইয়র্কের লোকজন নিঃশঙ্কচিত্তে পথেঘাটে ঘুরে বেড়ায়, তারা জানে সরকারী লোকজন সাদা পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছে না তাদের গতিবিধি নজরদারি করার জন্য। সে কি মনে করেছে আমি পালিয়ে গেছি?”
গোগল একটুও হাসলো না। “উনি খুব আপসেট হয়ে আছেন।” নার্ভাসভাবে লবির আশেপাশে তাকালো সে, যদিও বেশ দূরে চা পান করতে থাকা এক বয়স্ক মহিলা ছাড়া অন্য কেউ নেই। “হারমানোল্ড আজ সকালে বলেছেন ফিস্কের মৃত্যুর আসল কারণ জানার আগপর্যন্ত টুনামেন্ট বন্ধ থাকবে। ফিস্কের ঘাড় নাকি মটকানো ছিলো।”
“আমি জানি,” গোগলের হাতটা ধরে কাছের একটা টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসালো সোলারিন। টেবিলে চা-পাত্র রাখা আছে। তারা সেই চা পান করতে শুরু করলো। মনে রাখবে লাশটা আমি দেখেছি।”
“এটাই হলো সমস্যা,” বললো গোগল। “দুর্ঘটনাটি ঘটার ঠিক আগ মুহূর্তে আপনি তার সাথেই ছিলেন। এটা খুব খারাপ দেখাচ্ছে। আমাদের দিকে কোনো রকম মনোযোগ তৈরি হোক সেটা আমরা চাই না। এই ব্যাপারটা নিয়ে যদি ইনভেস্টিগেশন শুরু হয় তাহলে সবার আগে আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তারা।”
“তুমি কেন আমাকে ভড়কে দিচ্ছো?” বললো সোলারিন।
একটা সুগার কিউব দাঁতের ফাঁকে আটকে রেখে গোগল চা পান করলো। কোনো কথা বললো না সে।
দূরের টেবিলে বসা বৃদ্ধমহিলা হেলেদুলে তাদের টেবিলের কাছে চলে এলো। মহিলার গায়ের পোশাক কালো, হাতে একটা লাঠি। তার দিকে তাকালো গোগল।
“এক্সকিউজ মি,” তাদের দু’জনকে মিষ্টি করে বললো মহিলা। “তারা আমার চায়ে কোনো স্যাকারিন দেয় নি, আর আমি চিনিও খেতে পারছি না ডায়বেটিসের কারণে। আপনাদের কাছে কি স্যাকারিনের প্যাকেট হবে?”
“নিশ্চয়,” বললো সোলারিন। ট্রে’তে থাকা সুগার বোল থেকে কয়েকটি গোলাপি রঙের ছোটো ছোটো প্যাকেট বের করে মহিলার কাছে দিয়ে দিলো। তাদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলো মহিলা।
“খাইছে,” লিফটের দিকে তাকিয়ে আৎকে উঠে বললো গোগল। ওখান থেকে ব্ৰদস্কি ধাই ধাই করে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। “আপনি ফিরে আসলে আপনাকে সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে নিয়ে যাবার কথা ছিলো।” হুট করে উঠে দাঁড়ালো সে, চায়ের ট্রেটা আরেকটুর জন্যে উল্টে পড়েই যেতো। সোলারিন অবশ্য নিজের চেয়ারেই বসে রইলো।
ব্ৰদস্কি খুব লম্বা, বেশ পেশীবহুল আর রোদে পোড়া চামড়া। নেভি পিন স্ট্রাইপ সুট আর সিল্কের টাইয়ে তাকে দেখে মনে হয় কোনো ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ী। বেশ আগ্রাসীভাবে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো সে। সোলারিনের সামনে এসে হাতটা বাড়িয়ে দিলো। বসে থেকেই হাতটা মেলানোর পর চুপচাপ একটা চেয়ারে বসে পড়লো ব্ৰদস্কি।
“তোমার উধাও হয়ে যাবার কথা আমি সেক্রেটারিকে জানাতে বাধ্য হয়েছি,” ব্ৰদস্কি বলতে শুরু করলো।
“আমি তো উধাও হয়ে যায় নি। একটু হাটাহাটি করতে গেছিলাম।”
“মনে হচ্ছে কিছু কেনাকাটাও করেছো?” বললো ব্ৰদস্কি। “ব্রিফকেসটা তো দারুণ সুন্দর। কোত্থেকে কিনলে?” সোলারিনের পাশে থাকা ব্রিফকেসটায় হাত বোলালো সে। গোগল অবশ্য আগে লক্ষ্য করে নি। “ইতালিয়ান চামড়ার। সোভিয়েত দাবা খেলোয়াড়ের জন্যে বেশ মানানসই জিনিস,” পরিহাসের সাথে বললো। এর ভেতরে কি আছে সেটা যদি দেখি তুমি কি কিছু মনে করবে?”
কাঁধ তুললো সোলারিন। ব্রিফকেসটা কোলের উপর রেখে খুলে ফেললো ব্ৰদস্কি। ভেতরের জিনিসপত্রগুলো নেড়েচেড়ে দেখলো সে।
“ভালো কথা, আমি আসার ঠিক আগে তোমাদের টেবিল থেকে যে মহিলাকে চলে যেতে দেখলাম সে কে?”
“এক বুড়ো মহিলা,” বললো গোগল। “চায়ের জন্যে একটু স্যাকারিন নিতে এসেছিলো।”
“তার নিশ্চয় ওটা খুব দরকার ছিলো না,” ব্রিফকেসের কাগজপত্র নাড়তে নাড়তে বললো ব্ৰদস্কি। “আমি আসামাত্রই মহিলা এখান থেকে চলে গেছে।” গোগল চেয়ে দেখলো মহিলা তার টেবিলে নেই, তবে টি-পটটা পড়ে আছে টেবিলে।
ব্ৰদস্কি কাগজপত্রগুলো ব্রিফকেসে রেখে সোলারিনের কাছে সেটা দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে তাকালো গোগলের দিকে।
“গোগল, তুমি আস্ত একটা বোকা,” স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো সে। “এই নিয়ে তিন তিনবার আমাদের মহামূল্যবান গ্র্যান্ডমাস্টার তোমাকে ফাঁকি দিলো। প্রথমত, খুন হবার আগে ফিস্ককে সে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলো। দ্বিতীয়ত, এই ব্রিফকেসটা তুলে আনার সময়। যেটাতে অপ্রয়োজনীয় কাগজ, বইপত্র ছাড়া আর কিছুই নেই। আমি নিশ্চিত, এরইমধ্যে মূল্যবান জিনিস সে সরিয়ে ফেলেছে। আর এখন, তোমার নাকের ডগার উপর দিয়ে এখানে বসে থেকেই একজন এজেন্টকে চিরকুট চালান করে দিলো!”
আরক্তিম হয়ে উঠলো গোগলের মুখ, নামিয়ে রাখলো চায়ের কাপটা।
“তবে আমি আপনাকে আশ্বস্ত-”
“রাখো তোমার আশ্বস্ত,” কাটাকাটাভাবে বললে ব্ৰদস্কি। সোলারিনের দিকে ফিরলো সে। “সেক্রেটারি বলেছেন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আমাদেরকে কন্ট্যাক্ট পেতে হবে নইলে ফিরে যেতে হবে রাশিয়ায়। এই টুর্নামেন্টটা যদি বাতিল হয়ে যায় তাহলে আমাদের কভারটা ভেঙে পড়বে, এই ঝুঁকি উনি নিতে পারেন না। আমরা নিউইয়র্কে বসে ইতালিয়ান ব্রিফকেস কেনার জন্যে শপিং করে বেড়াচ্ছি এ কথাটা উনি জানতে পারলে ভালো হবে না,” নাক সিঁটকে বললো সে। “গ্র্যান্ডমাস্টার, তোমার সোর্সদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য তোমার হাতে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা সময় আছে।”
