“আমি জানি না কতোটা তোমাকে বলতে পারবো,” বললো সে। তার কণ্ঠটা খুব কোমল শোনালো। আর প্রথমবারের মতো আমি তার ইংরেজি বাচনভঙ্গিতে স্লাভিচ টান টের পেলাম। “তোমাকে যা-ই বলি না কেন সেটা তোমাকে আরো বেশি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলে দেবে। আমি শুধু তোমাকে বলবো, আমার কথা বিশ্বাস করো। তোমার সাথে কথা বলে এরইমধ্যে যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছি।”
আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে সে আমার চুলে হাত বোলাতে লাগলো। যেনো আমি কোনো বাচ্চা মেয়ে। “এই দাবা টুর্নামেন্ট থেকে তোমাকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। কাউকে বিশ্বাস কোরো না। তোমার পক্ষে ক্ষমতাশালী বন্ধুরা আছে, কিন্তু তুমি জানো না কোন খেলা তুমি খেলছো…”
“কোন সাইডে খেলছি?” আমি বললাম। “আমি তো কোনো খেলা খেলছি না।”
“অবশ্যই খেলছো, আমাকে যেনো জড়িয়ে ধরবে এমন আন্তরিক ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললো সে। “তুমি দাবা খেলছো। তবে চিন্তা কোরো না। আমি এই খেলার একজন মাস্টার। আমি আছি তোমার পক্ষে।
উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়ালো সে। আমিও সম্মোহিতের মতো তার পেছন পেছন গেলাম। দরজার কাছে পৌঁছানো মাত্রই সোলারিন দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো, হয়তো মনে করছে কেউ ভেতরে আসছে। তারপর আমার দিকে তাকালো সে। কিছু বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।
জ্যাকেটের ভেতরে একহাত ঢুকিয়ে সোলারিন আমাকে দরজা খুলে বাইরে যাবার ইশারা করলো। এক ঝলক দেখতে পেলাম তার জ্যাকেটের নীচে একটা অস্ত্র আছে। ঢোক গিলে সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলাম, পেছন ফিরে আর তাকালাম না।
লবির কাঁচের দেয়ালগুলো ভেদ করে বাইরের চকচকে রোদ ঢুকে পড়েছে। বের হবার পথের দিকে এগিয়ে গেলাম দ্রুত। পুজার খোলা চত্বরে এসে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম ইস্ট রিভার ড্রাইভের দিকে।
ডেলিগেট এন্ট্রান্সের কাছে এসে হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমি আমার ব্রিফকেসটা মেডিটেশন রুমে ফেলে চলে এসেছি। ওটাতে শুধু আমার লাইব্রেরির বই-ই নেই, আছে গতকালকের ঘটনার নোটগুলোও।
দারুণ। সোলারিন যদি ওটা হাতে পেয়ে যায়, নোটগুলো পড়ে দেখে তাহলে সে বুঝতে পারবে আমি এখনও ঐ ঘটনাটা নিয়ে তদন্ত করে যাচ্ছি। নিজেকে গালি দিলাম মনে মনে। জুতোর ভাঙা হিল নিয়েই ফিরে গেলাম ইউএন প্লাজার দিকে।
লবিতে ঢুকে দেখি রিসেপশনিস্ট একজন ভিজিটরের সাথে কথা বলছে তবে গার্ড লোকটাকে কোথাও দেখতে পেলাম না। নিজেকে আশ্বস্ত করলাম, ঐ ঘরে একা একা ফিরে যাওয়াটা মোটেও ভয়ের কোনো ব্যাপার হবে না। পুরো লবিটা ফাঁকা-পেচানো সিঁড়িটা দেখতে পেলাম। ওখানেও কেউ নেই।
বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে ঢুকে পড়লাম মেডিটেশন রুমের ভেতর।
মৃদু আলোর ঘরটায় আমার চোখ সয়ে নিতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো। ঘরে সোলারিন নেই। নেই আমার ব্রিফকেসটাও। কিন্তু পাথরের স্ল্যাবের উপর পাড়ে আছে একটা মৃতদেহ। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম প্রচণ্ড ভীতি নিয়ে। হাত-পা ছড়িয়ে থাকা বিশাল দেহটার গায়ে শফারের পোশাক। আমার রক্ত হিম হয়ে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। কানে ভো ভো শব্দ শুনতে পেলাম। গভীর করে নিঃশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলাম সামনে।
স্পটলাইটের আলোতে যে মুখটা দেখতে পেলাম সেটা আর কারোর নয়, লিলির ড্রাইভার সলের! মরে পড়ে আছে সে। এর আগে জীবনে কখনও আমি মৃতদেহ দেখি নি। এমন কি শেষকৃত্যের সময়েও না। বুক ফেটে কান্না আসতে লাগলো আমার।
ঠিক তখনই একটা কথা মাথায় হুট করে চলে এলো : সল তো এখানে নিজে নিজে আসে নি। তাকে অন্য কেউ বয়ে নিয়ে এসেছে। যারা তাকে নিয়ে এসেছে তারা পাঁচ মিনিট আগেও এখানেই ছিলো, এই ঘরে!
দৌড়ে চলে এলাম লবিতে। রিসেপশনিস্ট মেয়েটি এখনও ভিজিটরের সাথে কথা বলে যাচ্ছে। অল্প সময়ের জন্যে আমার মনে হলো কথাটা তাদেরকে জানাই, কিন্তু পরক্ষণেই মত পাল্টালাম। আমার বান্ধবীর ড্রাইভার ওখানে যখন মরে পড়ে আছে ঠিক তখনই আমি কিভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলাম, এটা সবাইকে বোঝানো কঠিন হয়ে যাবে। আগের দিনই বা কেমন করে, কাকতালীয়ভাবে টুনামেন্টের মৃত্যুর ঘটনায় আমি ছিলাম সেটাও একটা প্রশ্ন বটে। এই মৃত ড্রাইভারও তখন ওখানে ছিলো, এটাও তারা জেনে যাবে। আমাদের গাড়িতে দুটো গুলি করা হয়েছিলো সেটা কেন আমরা পুলিশকে জানালাম না তাও তো জানতে চাইবে।
অনিচ্ছায় অনেকটা বিপর্যস্ত অবস্থায় ইউএন পুজা থেকে ফিরে এলাম আমি। জানি পুলিশের কাছে যাওয়া উচিত ছিলো কিন্তু খুব আতঙ্কে আছি। আমি ঐ ঘর থেকে চলে যাবার পর পরই সলকে হত্যা করা হয়েছে। দাবা টুর্নামেন্টে একটা বিরতির সময়ে ফিস্ক মারা গেছেন। দুটো ক্ষেত্রেই ভিকটিম দু’জন পাবলিক প্লেসে ছিলো। তাদের চারপাশে ছিলো অনেক মানুষ। দুটো ঘটনার সময়ই সোলারিন ছিলো তাদের খুব কাছে। তার কাছে একটা অস্ত্রও আছে, আমি নিজে সেটা দেখেছি।
তাহলে আমরা দাবা খেলছি। যদি তাই হয়ে থাকে আমাকে এর নিয়মটাও জেনে নিতে হবে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্যে হেঁটে নিজের উষ্ণ অফিসে ফিরে আসার সময় আমর মধ্যে শুধু ভীতি আর হতবিহ্বলতাই কাজ করে নি, একটা বিষয়ে দৃঢ়প্রতীজ্ঞ হয়ে উঠলাম আমি। এই খেলাটাকে ঘিরে যে রহস্যময়তার চাদর জড়িয়ে আছে সেটা ভেদ করবো। এই খেলার নিয়ম আর খেলোয়াড়দের চিহ্নিত করবে, খুব জলদি। কারণ দ্রুত চাল দেয়া হচ্ছে। তবে আমার থেকে ত্রিশ বুক দূরে যে চালটা দেয়া হচ্ছে সেটার সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। এই চালটা আমার জীবনের গতিধারা বদলে দিতে যাচ্ছে…
