লোকটা কোথায় গেলো? গার্ডেন থেকে বের হবার তো পথ নেই। আমি আবার ফিরে গেলাম পুজার সিঁড়িতে। চত্বরে গিয়ে দেখি বৃদ্ধমহিলাও নেই। তবে আবছায়া একটি অবয়ব দেখতে পেলাম ভিজিটর এন্ট্রান্স দিয়ে ঢুকছে। বাইরে বাইসাইকেল স্ট্যান্ডে লোকটার সাইকেল রাখা। কিভাবে আমার আগে এখানে চলে এলো সে? তড়িঘড়ি ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে ভাবলাম আমি। পুরো ফ্লোরটা ফাঁকা, কেবলমাত্র একজন গার্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রিসেপশনের ওভাল ডেস্কে বসে থাকা তরুণীর সাথে কথা বলছে।
“এক্সকিউজ মি,” আমি বললাম, “এইমাত্র এখানে কি সাদা সোয়েটার পরা কোনো লোক ঢুকেছে?”
“খেয়াল করি নি,” বিরক্ত হয়ে বললো গার্ড।
“আপনি যদি এখানে কোথাও লুকোতে চান তাহলে কোথায় যাবেন?” জিজ্ঞেস করলাম। নড়েচড়ে উঠলো দু’জনেই। তারা আমাকে ভালো করে দেখতে লাগলো, যেনো আমি একজন সন্ত্রাসী। দ্রুত ব্যাখ্যা করলাম, “মানে, আপনি যদি একা থাকতে চান একটু প্রাইভেসি চান তাহলে কোথায় যাবেন?”
“মেডিটেশন রুমে,” বললো গার্ড। “জায়গাটা খুব নিরিবিলি। ওই তো ওখানে।” বিশাল মার্বেল ফ্লোরের শেষ মাথায় একটি দরজা দেখিয়ে বললো। ফ্লোরটা গোলাপী আর ধূসর বর্ণের চেক-চেক বর্গের। অনেকটা দাবাবোর্ডের মতো। দরজার পাশে স্টেইডগ্লাসের জানালা আছে একটা। গার্ডকে ধন্যবাদ জানিয়ে দরজার দিকে চলে গেলাম। মেডিটেশন রুমে ঢুকতেই পেছন থেকে দরজাটা আস্তে করে বন্ধ হয়ে গেলো।
ঘরটা বিশাল আর অন্ধকারাচ্ছন্ন। অনেকটা ভূগর্ভস্থ কবরস্তানের মতো। ভেতরে বেশ কয়েকটি ছোটো ছোটো বেঞ্চের সারি। অন্ধকারে তাদের একটার সাথে ধাক্কা খেলাম। ঘরের মাঝখানে কফিন সদৃশ্য পাথরের একটি স্ল্যাব, পেন্সিল আকৃতির একটি স্পটলাইট তার উপরে পতিত হচ্ছে। পুরো ঘরটা স্তব্ধ, হিম-শীতল আর আদ্র। আমাকে চোখ বড় করে তাকাতে হচ্ছে।
একটা বেঞ্চে বসে পড়লে খ্যাচ করে শব্দ হলো। ব্রিফকেসটা বেঞ্চের পাশে রেখে পাথরের স্ল্যাবের দিকে তাকালাম, রহস্যজনকভাবেই আমি কাঁপছি। যেননা মোহাবিষ্টি হয়ে পড়েছি। সম্মোহিত হয়ে গেছি।
দরজাটা আস্তে করে খুলে গেলে সেটার ফাঁক দিয়ে কিছু আলো ঢুকে পড়লো ঘরের ভেতর। সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফিরে তাকালাম।
“চিৎকার করবে না, আমার পেছন থেকে একটা কণ্ঠ বলে উঠলো। “আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না, তবে তোমাকে চুপ থাকতে হবে।”
কণ্ঠটা চিনতে পেরে আমার হৃদস্পন্দন লাফাতে শুরু করলো। ঝট করে উঠে দাঁড়ালাম আমি।
ডিম লাইটের মৃদু আলোতে দাঁড়িয়ে আছে সোলারিন, পাথরের স্ল্যাবের উপর যে আলো সেটা প্রতিফলিত হচ্ছে সোলারিনের সবুজ দু’চোখে। লাফ দিয়ে পিছু হটে পাথরের স্ল্যাবের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার সামনে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো সোলারিন। তার গায়ে সেদিনের সেই পোশাক। শুধু কালো রঙের চামড়ার একটি জ্যাকেট চাপিয়েছে তাতে।
“বসো,” নীচুকণ্ঠে বললো সে। “আমার পাশে, এখানে। আমার হাতে খুব বেশি সময় নেই।”
আমার পা দুটো খুব দুর্বল লাগছে। সে যা বললো তাই করলাম, মুখে কিছু বললাম না।
“গতকাল আমি তোমাকে সাবধান করে দিয়েছিলাম কিন্তু তুমি আমার কথা শোনন নি। এখন তো বুঝতে পারছো আমি সত্যি বলেছিলাম। তুমি এবং লিলি র্যাড এই টুর্নামেন্ট থেকে দূরে থাকবে। যদি ফিস্কের মতো পরিণতি বরণ করতে চাও।”
“আপনি তাহলে বিশ্বাস করেন না উনি আত্মহত্যা করেছেন, ফিসফিসিয়ে বললাম আমি।
“বোকার মতো কথা বোলো না। তার ঘাড়টা কোনো এক্সপার্ট ভেঙে দিয়েছে। আমিই তাকে শেষবারের মতো জীবিত দেখেছি। উনার স্বাস্থ্য বেশ ভালো ছিলো। অথচ দুই মিনিট পরই মারা গেলেন। সেইসাথে তার সাথে থাকা একটা জিনিসও উধাও হয়ে গেলো—”
“যদি না আপনি তাকে খুন করেন,” তার কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বললাম। তার হাসিটা একেবারেই দুর্বোধ্য। একটু ঝুঁকে আলতো করে আমার কাঁধে হাত রাখলো সে। এক ধরণের উষ্ণতা যেনো তার হাত থেকে আমার শরীরে বয়ে গেলো।
“আমাদের দু’জনকে একসাথে দেখে ফেললে আমার খুব বিপদ হবে। সুতরাং আমি যা বলছি মন দিয়ে শোনো। আমি তোমার বান্ধবীর গাড়িতে গুলি করি নি। তবে ড্রাইভারের উধাও হয়ে যাওয়াটা কোনো দুর্ঘটনা নয়।”
অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। লিলি আর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কথাটা কাউকে বলবো না। সোলারিন কিভাবে এটা জানতে পারলো যদি না সে কাজটা করে থাকে?
“আপনি কি জানেন সলের কি হয়েছে? কে গুলি করেছে তাও কি জানেন?”
আমার দিকে তাকালো সোলারিন কিন্তু কিছু বললো না। এখনও আমার কাঁধে তার হাত। আমার দিকে সুন্দর করে হেসে কাঁধটা আরো শক্ত করে ধরলো সে। হাসলে তাকে ছোটো বাচ্চাদের মতো লাগে।
“তারা তোমার ব্যাপারে ঠিকই বলেছে,” শান্তকণ্ঠে বললো। “তুমিই সেই জন।”
“কারা ঠিক বলেছে? আপনি কিছু জিনিস জানেন কিন্তু আমাকে বলছেন না, বিরক্ত হয়েই বললাম তাকে। আমাকে সাবধান করে দিলেন অথচ তার কারণটা বললেন না। আপনি কি ঐ গণককে চেনেন?”
চট করে আমার কাঁধ থেকে হাতটা সরিয়ে নিলো সোলারিন। তবে আমি থামলাম না।
“আপনি জানেন,” বললাম তাকে। “বাইসাইকেলের ঐ লোকটা কে? আপনি যদি আমাকে ফলো করে থাকেন তাহলে অবশ্যই তাকে দেখেছেন! আপনি আমাকে সাবধান করে দেবার জন্যে ফলো করে যাচ্ছেন, অথচ কেন করছেন সে ব্যপারে আমাকে পুরোপুরি অন্ধকারে রেখেছেন? আপনি কি চান? এসবের সাথে আমার কি সম্পর্ক?” নিঃশ্বাস নেবার জন্যে একটু থামলাম। দেখতে পেলাম সোলারিন আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
