নাস্তা চলে এলে আমি ব্রিফকেস খুলে কিছু নোটপেপার বের করে নিলাম। ওটাতে ঐ দিনের ঘটনাগুলো সময়ানুক্রমে লিখে রেখেছি।
সোলারিনের কাছে একটি সিক্রেট ফর্মুলা আছে, বেশ কিছুদিন তাকে রাশিয়ার বাইরে যেতে দেয়া হয় নি। বিগত পনেরো বছরে ফিস্ক কোনো টুর্নামেন্টে খেলে নি। আমাকে একটা সতর্কবার্তা দিয়েছিলো সোলারিন। তিন মাস আগে ঠিক ঐ গণক যে ভাষায় বলেছিলো সেও একই ভাষায় কথাটা বলেছে। খেলার মাঝখানে সোলারিন আর ফিঙ্কের মধ্যেও কিছু কথাবার্তা হয়েছে, তারপরই তারা একটা বিরতি নেয়। লিলি মনে করছে ফিস্ক প্রতারণা করেছিলো। সন্দেহজনক অবস্থায় ফিস্ককে মৃত পাওয়া গেছে। লিলির গাড়িতে দুটো বুলেট লেগেছে, একটা আমাদের আসার আগেই করা হয়েছিলো। তারপর গাড়ির সামনে আসতেই আরেকটা করা হয়। সল এবং ঐ গণক মহিলা উধাও হয়ে গেছে।
একটার সাথে আরেকটা খাপ খাচ্ছে না। যদিও এসব ঘটনা যে একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত তার প্রচুর কু আর ইঙ্গিত রয়েছে। আমি ভালো করেই জানি অনেক বেশি কাকতালীয় ঘটনার র্যান্ডম প্রোব্যাবিলিটি শূন্য হয়ে থাকে।
কফি শেষ করে প্রন ডেনিশ খেতে শুরু করবো ঠিক তখনই তাকে আমি দেখলাম। জানালা দিয়ে জাতিসংঘের সদর দপ্তরটি দেখছিলাম, হঠাৎ আমার চোখে সেটা ধরে পড়ে। বাইরে পুরোপুরি সাদা পোশাকের এক লোক, হুডওয়ালা সোয়েটার, মুখটা নাকের নীচ থেকে সাদা রঙের মাফলার দিয়ে ঢাকা। একটা বাইসাইকেল ঠেলে ঠেলে এগোচ্ছে।
খাবার খাওয়া বন্ধ করে বরফের মতো জমে গেলাম আমি। জাতিসংঘ ভবনের সামনে যে স্কয়ারটা আছে তার উল্টো দিকে একটা পেঁচানো সিঁড়ি দিয়ে। বাইসাইকেলটা নিয়ে নামছে সে। তড়িঘড়ি টেবিলের উপর কিছু টাকা রেখে কাগজপত্রগুলো ব্রিফকেসে ভরে কাঁচের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
পাথরের সিঁড়ির ধাপগুলো বেশ পিচ্ছিল, বরফ আর পাথুরে লবনের আস্তরণ। পড়ে গেছে সেগুলোর পৃষ্ঠদেশে। কোট আর ব্রিফকেসটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে। নীচে এলাম আমি। মোড়ের কাছে আসতেই দেখি বাইসাইকেলটা নেই। তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে আমার জুতোর হিল আর্টকে গেলো বরফের মধ্যে, সঙ্গে সঙ্গে হুমরি খেয়ে পড়ে গেলাম দুই তিন ধাপ নীচে। উপরের দিকে চেয়ে দেখি পাথরের দেয়ালে জিওর একটা উক্তি খোদাই করে লেখা :
জাতির বিরুদ্ধে জাতি তলোয়াড় ধরবে না। যুদ্ধও করবে না।
সম্ভাবনা খুবই কম। উঠে দাঁড়ালাম আমি। মানুষ আর জাতিসমূহ সম্পর্কে জিশুর আরো বেশি ধারণা লাভ করা দরকার ছিলো। বিগত পাঁচ হাজার বছরে যুদ্ধ ছাড়া পৃথিবীতে একটা দিনও অতিক্রান্ত হয় নি। ইতিমধ্যেই ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধীরা স্কয়ারে জমায়েত হতে শুরু করেছে। তাদের ঠেলেঠুলে আমি এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। আমি দেখতে চাই তারা জিওর বাণীকে স্বার্থক করেছে।
ভাঙা হিল নিয়েই আইবিএম সিস্টেম রিসার্চ ইনস্টিটিউট ভবনটা পেরিয়ে গেলাম। আমার থেকে পুরো এক বুক দূরে আছে লোকটা। এখন সে বাইসাইকেল চালাচ্ছে। ইউএন পুজার সামনে এসে ট্রাফিক সিগন্যালের জন্যে তাকে থামতে হলো কিছুক্ষণ।
আধবুক যেতেই দেখতে পেলাম সিগন্যালটা বদলে গেলো। লোকটা এখন ধীরগতিতে প্যাডেল মারতে মারতে রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে। হাটার গতি বাড়িয়ে দিলাম কিন্তু মোড়ের কাছে আসতেই আবারো সিগন্যাল পড়ে গেলো। আমার চোখ রাস্তার ওপাশে বাইসাইকেল আরোহীর দিকে। ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে সে।
আবারো বাইসাইকেল থেকে নেমে পুজার সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। ফাঁদে পড়ে গেছে! ভাস্কর্য উদ্যান থেকে বের হবার কোনো পথ নেই, সুতরাং আমি একটু শান্ত হলাম। সিগন্যালের জন্যে অপেক্ষা করার সময় বুঝতে পারলাম আমি আসলে কী করছি।
গতকালই আমার চোখের সামনে সম্ভাব্য একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে দেখেছি, তার কিছুক্ষণ পরই মাত্র কয়েক ফিট দূরে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি করা হয় প্রকাশ্য দিবালোকে। এখন অচেনা এক লোকের পেছনে ছুটে চলেছি শুধুমাত্র এ কারণে যে লোকটা দেখতে হুবহু আমার আঁকা পেইন্টিংয়ের সেই বাইসাইকেল চালকের মতো। কিন্তু এটা কিভাবে হলো? ভেবেও কোনো সদুত্তর। পেলাম না। সিগন্যাল বদল হলে আমি দুদিকের দুটো রাস্তার দিকে তাকালাম, তারপর এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে।
ইউএন পুজার রটআয়রনের গেটটা দিয়ে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলাম। সাদা কংক্রিটের চত্বরে পাথরের একটি বেঞ্চে বসে কালো পোশাকের এক বৃদ্ধ মহিলা কবুতরদের দানা খাওয়াচ্ছে। কালো রঙের একটি শাল পেচিয়ে রেখেছে সে। উপুড় হয়ে দানা ছুঁড়ে মারছে কবুতরগুলোর দিকে। তার পাশেই বাইসাইকেল আরোহী লোকটা দাঁড়িয়ে আছে।
থমকে দাঁড়িয়ে তাদেরকে দেখতে লাগলাম আমি। বুঝতে পারছি না কী করবো। কথা বলছে তারা। বৃদ্ধমহিলা আমার দিকে ঘুরে তাকালো, তারপর লোকটাকে কী যেনো বললো। আমার দিকে না তাকিয়েই মাথা নেড়ে সায় দিয়ে। আরো সামনে এগিয়ে গেলো লোকটা, সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো নদী তীরবর্তী এলাকায়। আমি ছুটে গেলাম তার পেছন পেছন। কবুতরগুলো উড়াল দিতে শুরু করলো আমার সামনে। হাত দিয়ে মুখটা আড়াল করে দৌড়াতে লাগলাম।
চত্বরের বাইরে নদীর দিকে মুখ করে আছে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উপহার দেয়া কৃষকের বিশাল একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি। আমার সামনে বরফাচ্ছিদ ইস্ট রিভার, নদীর ওপারে বিশাল কোকা-কোলার সাইনবোর্ড আর কতোগুলো চিমনি। তার ডান দিকে গার্ডেন, এর বিশাল লনের দু’দিকে বৃক্ষের সারি, পুরোটা। এলাকাই বরফে ঢেকে আছে। সেখানে পায়ের কোনো ছাপ নেই। নদীর তীরবর্তী পাথর বিছানো পথ চলে গেছে, গার্ডেন আর এই পথের মাঝখানে রয়েছে ছোটো ছোটো ভাস্কর্য গাছ। ওখানে কেউ নেই।
