এজন্যেই নিমকে আমার ভীষণ প্রয়োজন। ফিফথ এভিনু হোটেলে এসে তো আমি বোকা বনে গেলাম। এখানে নাকি কোনো গণক নেই। ম্যানেজারের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি। লোকটা পনেরো বছর ধরে ওখানে কাজ করে। বার বার আশ্বস্ত করে আমাকে বলেছে ফিফথ এভিনু হোটেলে কোনো কালেই কোনো গণক ছিলো না।
হোটেল-বারেও নয়। এমনকি নিউইয়ার্স ইভের দিনেও নয়। যে মহিলা আনতো আমি এই হোটেলে আসবোই, এমনকি আমি যে প্যান অ্যাম-এর ডাটা সেন্টারে আছি সেটাও হ্যারিকে বলেছে, ভবিষ্যৎবাণী করেছে আমার হাত দেখে, সোলারিনের তিন মাস আগেই একই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে-এমন কি, যে মহিলা আমার জন্ম তারিখ পর্যন্ত জানতো-তার কোনো অস্তিত্বই নেই।
.
অবশ্যই তার অস্তিত্ব ছিলো। এটা প্রমাণ করার জন্যে আমার কাছে তিন তিনজন সাক্ষীও আছে। কিন্তু এখন এতো কিছু জানার পর নিজের চোখকেই সন্দেহ করতে শুরু করেছি আমি।
তো সোমবার সকালে আমি আমার ভেজা চুলে নিয়ে তোয়ালে গায়ে পেচিয়ে টেলিফোনটা হাতে নিয়ে বসলাম নিমকে খোঁজার আশায়। এবার আমি আরো বেশি অবাক হলাম।
তার এনসারিং সার্ভিসে ফোন করতেই নিউইয়র্ক টেলিফোন কোম্পানির একটা রেকর্ডিং মেসেজ শুনতে পেলাম। নিমের নাম্বারটা নাকি ব্রুকলিন এক্সচেঞ্জে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। সেই নতুন নাম্বারে ডায়াল করলাম। ভাবলাম, নিম এভাবে নাম্বার বদল করবে সেটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার। তার কারণ এই বিশ্বে যে তিনজনের কাছে তার পুরনো নাম্বারটা আছে তার মধ্যে আমি একজন। এতো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করার কোনো মানে বুঝি না।
নতুন নাম্বারটায় ফোন করে আবারো অবাক হলাম।
“রকাওয়ে প্রিন্স হল,” অপ্ররপ্রান্তে এক মহিলা বললো।
“আমি ড. নিমকে চাচ্ছিলাম।”
“আমাদের এখানে ড. নিম নামে কেউ থাকেন না, মিষ্টি করে বললো মহিলা। নিমের এনসারিং মেশিন সব সময়ই এরকম অস্বীকৃতি দিয়ে শুরু করে, তাই আমি একটু খুশিই হলাম। কিন্তু এরপর আবারো অবাক হবার পালা।
“ড. নিম। ড. লাডিসলাউস নিম,” আমি পরিস্কার করে বললাম। “ম্যানহাটনের ইনফর্মেশন সার্ভিস আমাকে এই নাম্বারটা দিয়েছে।”
“এটা কি কোনো পুরুষ মানুষের নাম?” জিজ্ঞেস করলো মহিলা। “হ্যাঁ,” কিছুটা অধৈর্য হয়ে বললাম। “আমি কি একটা মেসেজ রেখে যেতে পারি আপনার কাছে? তার সাথে যোগাযোগ করাটা আমার জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
“ম্যাডাম, শীতলকণ্ঠে বললো মহিলা। “এটা কারমেলাইট কনভেন্ট! কেউ হয়তো আপনার সাথে মজা করার জন্যে এই নাম্বারটা দিয়েছে!” মহিলা ফোনটা রেখে দিলো।
আমি জানতাম নিম একজন অসামাজিক মানুষ, কিন্তু এটা তো অ্যাবসার্ড। হেয়ারড্রেসার বের করে চুল শুকাতে শুকাতে ভাবলাম এরপর কি করবো। কিছুক্ষণ পরই একটা আইডিয়া চলে এলো মাথায়।
কয়েক বছর আগে নিউইয়র্ক স্টকএক্সচেঞ্জে কম্পিউটার সিস্টেম ইনস্টল করেছিলো নিম। ওখানে যারা কম্পিউটার নিয়ে কাজ করে তারা নিশ্চয় তাকে চেনে। সম্ভবত মাঝেমধ্যে নিম ওখানে গিয়ে দেখেও আসে তার ইনস্টল করা সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে কিনা। ওখানকার ডিরেক্টর অব প্রোগ্রামের ম্যানেজারকে ফোন দিলাম।
“ড. নিম?” বললো ভদ্রলোক। “এ নাম তো কখনও শুনি নি। আপনি কি নিশ্চিত তিনি এখানে কাজ করতেন? তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছি, কখনও
এ নাম শুনি নি।”
“ঠিক আছে, ব্যর্থ মনোরথে বললাম। “যথেষ্ট হয়েছে। আমি আপনাদের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলতে চাই। তার নামটা কি?”
“নিউইয়র্ক স্টকএক্সচেঞ্জে কোনো প্রেসিডেন্ট নেই!” মনে হলো দাঁতে দাঁত পিষে কথাটা বললো ভদ্রলোক। ধ্যাত?
“তাহলে কি আছে?” অনেকটা চিৎকার করেই বললাম। “কেউ না কেউ তো আপনাদের এই প্রতিষ্ঠানটি চালায়, নাকি?”
“আমাদের এখানে চেয়ারম্যান আছে,” বিরক্ত হয়ে তার নামটাও বললো সে।
“বেশ, তাহলে কলটা উনার কাছে ফরোয়ার্ড করে দিন, প্লিজ।”
“ঠিক আছে, ম্যাম,” বললো ভদ্রলোক। “আশা করি আপনি জানেন আপনি কি করতে যাচ্ছেন।”
অবশ্যই জানি। চেয়ারম্যানের সেক্রেটারি খুবই ভদ্র ব্যবহার করলো। মহিলা যেভাবে আমাকে প্রশ্ন করলো তাতে করে মনে হলো আমি সঠিক জায়গাতেই ফোন করেছি।
“ড. নিম?” একটু অদ্ভুত কণ্ঠে বললো মহিলা। “না…আমার মনে হয় না এ নামে কাউকে চিনি। এ মুহূর্তে চেয়ারম্যান দেশের বাইরে আছেন। আমি কি আপনার কাছ থেকে একটা মেসেজ রেখে দিতে পারি?”
“তাহলে তো ভালোই হয়,” বললাম তাকে। নিমের মতো রহস্যময় মানুষকে অনেক দিন ধরেই চিনি, সুতরাং মহিলার কথায় আমি আশাবাদী হয়ে উঠলাম। “ড. নিমের সাথে যোগাযোগ হলে দয়া করে তাকে বলবেন মিস ভেলিস রকাওয়ে প্রিন্স কনভেন্টে তার কলের জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে। আরো বলবেন, রাতের মধ্যে তার কাছ থেকে কোনো রকম সাড়া না পেলে আমি বাধ্য হবো নানের শপথ নিতে।”
মহিলাকে আমার ফোন নাম্বারটা দিয়ে ফোন রেখে দিলাম। এতে কাজ হবে, ভাবলাম আমি।
অবশেষে কন এডিসনের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। লিলির মতো আমিও বালি পেটে কিছু কিছু জিনিসের মুখোমুখি হতে অপছন্দ করি, কন এডিসন হলো তার মধ্যে অন্যতম।
আমার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আধবুক দূরেই লা গালেত্তে নামের ছোটোখাটো একটি ফরাসি রেস্টুরেন্ট আছে। ওখানকার জানালা দিয়ে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের ভবনটি খুব কাছ থেকে দেখা যায়। কমলার জুস, ব্ল্যাক কফি আর পুন। ডেনিশ অর্ডার দিলাম।
