“কিসের ফর্মুলা?”
“আমি জানি না। কিন্তু তার এই বাজির কথাটা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে গেলে রাশিয়ানরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এক রাতের মধ্যেই সে উধাও হয়ে যায়। তারপর থেকে ক’দিন আগে এখানে আসার আগপর্যন্ত তার টিকিটাও দেখা যায় নি।”
“এটা কি পদার্থ বিদ্যার কোনো ফর্মুলা?” জানতে চাইলাম আমি।
“সম্ভবত এটা কোনো গোপন অস্ত্রের ফর্মুলা। এটাই সব কিছুর সাথে খাপ খায়, তাই না?” আমি অবশ্য কোনো কিছু খাপ খেতে দেখছি না। তবে তাকে বকবকানি করতে দিলাম।
“এই টুর্নামেন্টেও সোলারিন ঠিক আগের মতোই হয়তো বাজি ধরবে এই ভয়ে ফিস্ককে সরিয়ে দিয়েছে কেজিবি, তারপর আমাকেও ভয় পাইয়ে দেবার জন্য গুলি করেছে তারা। ফিস্ক আর আমি, যেকোনো একজন যদি সোলারিনের সাথে খেলায় জিতে যাই তাহলে সে আমাদের ফর্মুলাটা দিয়ে দেবে!” লিলি নিজের ধারণায় নিজেই রোমাঞ্চিত কিন্তু আমি তাতে পটলাম না।
“এটা দারুণ একটা তত্ত্বই বটে,” বললাম তাকে। তবে কিছু ফাঁক রয়ে গেছে এতে। যেমন, সলের কি হলো? সোলারিন আবারো ঐ একই কাজ করবে। এই সন্দেহটা যদি রাশিয়ানদের থেকেই থাকে তাহলে তাকে কেন দেশের বাইরে পাঠালো তারা? আর সোলারিনই বা কেন ফিস্ক এবং তোমাকে ফর্মুলাটা দিতে। চাইবে?”
“ঠিক আছে, সব কিছু পুরোপুরি খাপ খাচ্ছে না মানছি,” স্বীকার করলো সে। “তবে শুরু তো করা গেলো।”
“শার্লোক হোমস একবার বলেছিলো, পর্যাপ্ত তথ্য হাতে আসার আগে কোনো তত্ত্ব দাঁড় করানোটা মারাত্মক ভুল, “ তাকে বললাম। “আমি বলি কি, সোলারিনের ব্যাপারে আগাগোড়া একটু স্টাডি করে দেখলে ভালো হয়। তবে। এখনও মনে করছি আমাদের উচিত পুলিশকে সব খুলে বলা। মনে রেখো আমাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে বুলেটের দুটো ফুটো আছে।”
“কখনও না,” বিরক্ত হয়ে বললো লিলি, “আমরা দু’জনে মিলেই এই রহস্যটার সমাধান করবো। স্ট্র্যাটেজি হলো আমার আরেক নাম।”
তো অনেক বাকবিতণ্ডা আর গরম গরম মাংস ভুনা খেতে খেতে অবশেষে আমরা দুজন একমত পোষণ করলাম, কয়েক দিনের জন্য আলাদা আলাদাভাবে গ্র্যান্ডমাস্টার সোলারিনের উপর কিছুটা রিসার্চ করবো, তারপর ঠিক করবো আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ।
লিলির কোচ নিজেও একজন গ্র্যান্ডমাস্টার। মঙ্গলবার লিলির খেলা আছে, তার আগে প্রচুর প্র্যাকটিস করার কথা, যদিও সে ভাবছে ট্রেইনিংয়ের সময় সে সোলারিনের উপলব্ধি সম্পর্কে কিছু জানতে পারবে। এরমধ্যে সলকেও খুঁজবে সে। সল যদি অপহৃত হয়ে না থাকে তাহলে তার খবর আছে। লিলির কাছে তাকে কঠিন জবাবদিহি করতে হবে এভাবে গাড়ি ফেলে চলে যাওয়ার জন্যে।
আমার নিজেরও কিছু পরিকল্পনা আছে তবে আমি সেটা লিলি র্যাডের সাথে শেয়ার করি নি তখন।
ম্যানহাটনে আমার এমন একজন বন্ধু আছে যে সোলারিনের চেয়েও বেশি রহস্যময়। কোনো ফোনবুকে তার নাম নেই, নেই কোনো বাড়িঘরের ঠিকানা। ডাটা প্রসেসিং জগতে সে একজন কিংবদন্তী। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্য একটি বই লিখে ফেলেছে। তিন বছর আগে যখন আমি নিউইয়র্কে চলে আসি তখন সে-ই আমাকে কম্পিউটারের ব্যাপারে সব কিছু শিখিয়েছিলো। এদিক থেকে সে আমার মেন্টর। অতীতে অনেক খারাপ পরিস্থিতি থেকে আমাকে উদ্ধার করেছে। নাম ব্যবহারের দরকার যখন পড়ে তখন নিজেকে উ. লাডিসলাউস নিম বলে পরিচয় দেয়।
নিম কেবল ডাটা প্রসেসিংয়েরই মাস্টার নয়, দাবা খেলায়ও রয়েছে তার। অসাধারণ দক্ষতা। বিশেভস্কি আর ববি ফিশারের সাথে খেলে তাদেরকে হারিয়েও দিয়েছে। তবে তার আসল এক্সপার্টিস হলো খেলাটার উপর অগাধ জ্ঞান। সে কারণেই তাকে খুঁজে বের করতে চাইছি আমি। ইতিহাসের প্রায় সব বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের খেলা তার মুখস্ত। গ্র্যান্ডমাস্টারদের জীবনীর ব্যাপারে তাকে জ্বলজ্যান্ত এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাবার ইতিহাস বলে কাউকে মুগ্ধ করতে পারে সে। আমরা যে ঘটনার মধ্যে পড়েছি সেটার রহস্য বের করা তার পক্ষে সম্ভব বলে মনে করি আমি। খালি একবার তার নাগাল পেলেই হয়।
কিন্তু তাকে পেতে চাওয়া আর খুঁজে বের করা একেবারে ভিন্ন দুটো কাজ। তার ফোনের এনসারিং সার্ভিসটি কেজিবি আর সিআইএ’কে নিয়ে নানান ধরণের গালগল্প ছড়িয়ে বেড়ায়। কয়েক সপ্তাহ ধরেই তাকে খুঁজে যাচ্ছি আমি।
যখন থেকে জানতে পারলাম দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি তখন থেকেই তাকে গুডবাই বলার জন্যে হন্যে হয়ে ফোন করে যাচ্ছি কিন্তু পাচ্ছি না। লিলির সাথে আমার যে চুক্তি হয়েছে সেজন্যে তাকে খুঁজছি না এখন, তাকে খুঁজছি অন্য একটা কারণে। ফিস্কের মৃত্যু, সোলারিনের সতর্কবার্তা, সলের উধাও হয়ে যাওয়া-প্রতিটি ঘটনা আপাতত বিচ্ছিন্ন বলে মনে হলেও একটার সাথে আরেকটার সম্পর্ক আছে। আর সেগুলো আমার সাথেই সম্পর্কিত বলে মনে করছি আমি।
আমার এরকম মনে করার কারণ, গতরাতে পাম রেস্টুরেন্ট থেকে লিলিকে বিদায় জানানোর পর থেকে ছোটোখাটো একটা রিসার্চ শুরু করি আমি। সরাসরি নিজের বাসায় ফিরে না এসে একটা ক্যাব নিয়ে ফিফথ এভিনু হোটেলে চলে যাই সেই গণকের খোঁজে যে তিনমাস আগে আমার হাত দেখে এমন একটা একটা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলো যার সাথে সোলারিনের সতর্কবার্তাটি একদম মিলে যায়। তাদের দু’জনের কথাটাকে আমি মোটেও কাকতালীয় ব্যাপার বলে মনে করছি না এখন। আমি জানতে চাই কেন এটা বলা হলো।
