আঙটিটা বেসিনে পড়তেই সোলারিন দরজার দিকে দৌড়ে গেলো, মনে মনে গুনতে আরম্ভ করলো সে। এক। দুই। টয়লেট থেকে বাইরে চলে এলো। তিন। চার। ছোট্ট ফয়ারটা অতিক্রম করতে শুরু করলো এবার। ছয়। সাত। ফয়ারের দরজাটা ধাক্কা মেরে খুলে বাইরের প্রাঙ্গনে চলে এসে বড় বড় পা ফেলে ছকদম দূরে চলে গেলো। আট। নয়। লাফিয়ে কাকড় বিছানো পথের উপর হুমরি খেয়ে পড়লো অবশেষে। দশ। দু’হাত দিয়ে কান দুটো ঢেকে ফেললো সোলারিন। অপেক্ষা করলো কিন্তু কোনো বিস্ফোরণ হলো না।
হাতটা সরিয়ে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখতে পেলো দুই জোড়া জুতো তার চোখের সামনে। আরো ভালো করে তাকিয়ে দেখলো আরবিটার দু’জন দাঁড়িয়ে আছেন। বিস্ময়ে চেয়ে আছে তার দিকে।
“গ্র্যান্ডমাস্টার সোলারিন!” একজন জাজ বললো। “আপনি কি আঘাত পেয়েছেন?”
“না, আমি ঠিক আছি,” নিজেকে ধাতস্থ করে উঠে দাঁড়ালো সে। পোশাক থেকে ঝুলো ঝেড়ে ফেললো। “গ্রাভমাস্টার ফিস্ক টয়লেটের ভেতরে আছেন, তিনি বেশ অসুস্থ। আমি তার জন্যে ডাক্তার ডাকাতে আসছিলাম, হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই। এই পাথর বিছানো পথটা বেশ পিচ্ছিল। সোলারিন ভাবতে লাগলো আঙটিটার ব্যাপারে সে ভুল করে ফেলেছে কিনা। হয়তো ওটা খুলে ফেললে কিছুই হবার কথা নয়।
“আমরা তাহলে গিয়ে দেখি তার জন্যে কিছু করা যায় কিনা,” বললো একজন জাজ। “উনি কেন কানাডিয়ান ক্লাবের টয়লেটে গেলেন? মেট্রোপলিটান ক্লাবের টয়লেটে গেলেন না কেন? কিংবা ফার্স্ট এইড স্টেশনে?”
“উনি খুব আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ,” জবাব দিলো সোলারিন। “নিজের অসুস্থতা অন্যকে দেখানোটা নিশ্চয় চাইবেন না।” জাজ দু’জন অবশ্য জিজ্ঞেস করলেন না সোলারিন কেন একই টয়লেটে গেছেন, তাও আবার নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে।
“উনি কি খুব অসুস্থ?” প্রবেশপথের দিকে যেতে যেতে বললেন একজন জাজ।
“তেমন কিছু না, পেট খারাপ,” জবাব দিলো সোলারিন। সেখানে ফিরে গিয়ে দেখাটা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না তার কাছে কিন্তু না গিয়েও উপায় নেই।
তারা তিনজন একসাথেই টয়লেটের কাছে চলে এলো, সামনে থাকা একজন জাজ দরজাটা টান মেরে খুলতেই আৎকে উঠে পিছিয়ে গেলেন।
“দেখবেন না!” বললেন তিনি। তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। জাজ দু’জনকে সরিয়ে দিয়ে টয়লেটের ভেতর ঢুকে পড়লো সোলারিন। টয়লেটের পার্টিশানের উপর থেকে নিজের টাই গলায় পেচিয়ে ঝুলে আছে ফিস্ক। কালচে হয়ে গেছে মুখটা। তার ঘাড়টা দেখেই বোঝা যাচ্ছে সেটা ভেঙে গেছে।
“আত্মহত্যা!” দরজা খুলেছিলেন যে জাজ তিনি বললেন। কিছুক্ষণ আগেও সেখানে দাঁড়িয়েছিলো ফিস্ক। একেবারে জ্বলজ্যান্ত।
“তিনিই প্রথম দাবামাস্টার নন যিনি এভাবে চলে গেলেন, অন্য জাজ জবাব দিলেন। সোলারিন তার দিকে ভুরু কুচকে তাকাতেই চুপ মেরে গেলেন তিনি।
“আমাদের ডাক্তার ডাকা দরকার,” অন্য এক জাজ দ্রুত বললেন।
ফিস্ক যে বেসিনটায় আঙটি ফেলেছিলো সেটার দিকে এগিয়ে গেলো সোলারিন। আঙটিটা আর সেখানে নেই। “হ্যাঁ, চলুন ডাক্তার ডাকা যাক, জবাবে বললো সে।
.
কিন্তু লাউঞ্জে বসে লিলির জন্য অপেক্ষা করতে করতে পর পর তিন কাপ কফি পান করার সময় আমি এসবের কিছুই জানতাম না। পর্দার আড়ালে কি ঘটে যাচ্ছে আমি যদি সেটা জানতে পারতাম তাহলে পরের ঘটনাগুলো হয়তো ঘটতোই না।
খেলার বিরতি প্রায় পাঁচচল্লিশ মিনিট হয়ে গেছে, ভাবতে লাগলাম আসলে কী ঘটছে। আমার টেবিলের কাছে এসে লিলি ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি দিলো।
“বলো তো কী হয়েছে,” চাপা কণ্ঠে জানতে চাইলো সে। “বারে আমার সাথে হারমানোন্ডের দেখা হয়েছে, তাকে দেখে মনে হলো হুট করেই দশ বছর বয়স বেড়ে গেছে। টুর্নামেন্টের ফিজিশিয়ানের সাথে কথা বলছে সে! কফি খাওয়া শেষ হলেই আমরা আজকের খেলাটা বাতিল করে দিতে পারবো, ডার্লিং। আজকে আর কোনো খেলা হচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ঘোষণা দেবে।”
“ফিস্ক কি আসলেই বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছে? হয়তো সেজন্যেই খুব অদ্ভুতভাবে খেলছিলো আজ।”
“সে অসুস্থ নয়, ডার্লিং। সে খুব দ্রুতই অসুস্থতা কাটিয়ে উঠেছে বলতে পারো।”
“নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে?”
“এক দিক থেকে বলতে গেলে তাই। বিরতির পর পরই সে টয়লেটে গিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে।”
“ফাঁস দিয়েছে!” কথাটা বলতেই লিলি আমাকে চুপ করার জন্যে ইশারা করলো। আশেপাশে লোকজন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। “তুমি কী বলছো?”
“হারমানোন্ড বলছে ফিস্কের জন্যে নাকি একটু বেশিই চাপ হয়ে গেছে। তারদের অভিমত অবশ্য অন্যরকম। তারা বলছে, একশ’ চল্লিশ পাউন্ডের একজন লোকের পক্ষে ছয় ফুট উঁচু পার্টিশান দেয়ালে উঠে গলায় ফাঁস দেয়াটা সহজ কাজ নয়।”
“আমরা কি কফি খাওয়া রেখে বাইরে যেতে পারি?” সোলারিন তার গাঢ় সবুজ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে কি বলেছিলো সেটা ভাবতে শুরু করলাম। অসুস্থ বোধ করতে লাগলাম আমি। আমার দরকার মুক্ত বাতাস।
“বেশ,” জোরেই বললো লিলি। “তবে দ্রুত ফিরে আসবো। আমি এই ম্যাচট.র উত্তেজনা মিস করতে চাই না।” তড়িঘড়ি আমরা বের হয়ে লবিতে চলে এলাম। দু’জন রিপোর্টার হুমরি খেয়ে আমাদের সামনে চলে এলো।
“ওহ মিস র্যাড,” তাদের মধ্যে একজন বললো। “কি হচ্ছে সেটা কি আপনি জানেন? আজ কি খেলা শুরু হবে?”
