তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললো সে। “না, আমিও মনে করি না আপনি কোনো এজেন্ট। হায় ঈশ্বর, তারা আপনাকে দিয়ে কতো বিপজ্জনক একটা কাজই না করিয়েছে!” সোলারিন কিছু একটা ভাবতে শুরু করলে ফিস্ক তার হাতটা মোচড়াতে লাগলো।
“মাই ডিয়ার, ফিস্ক, দেখুন,” বললো সে, “আপনি একটা বিপজ্জনক খেলায় আছেন। যেকোনো সময় এখানে লোকজন চলে আসতে পারে, তখন আমাদের দু’জনের জীবনটাই বিপদের মধ্যে পড়ে যাবে। আপনাকে দিয়ে যারা এ কাজ করাচ্ছে তারা খুব ভালো লোক নয়। বুঝতে পারছেন? তাদের সম্পর্কে যা জানেন আমাকে বলুন, দ্রত। তাহলেই কেবল আপনাকে আমি সাহায্য করতে পারবো।” সোলারিন উঠে দাঁড়িয়ে ফিস্কের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাকে টেনে ওঠালো। ফিস্কের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সে বুবি এখনই কেঁদে ফেলবে। বুড়ো লোকটার কাঁধে আলতো করে হাত রাখলো সে।
“কেউ আপনাকে এই ম্যাচটা জেতার জন্যে এরকম কাজ করতে রাজি করিয়েছে। আপনাকে বলতে হবে সে কে, কিংবা কারা। আর কেনই বা এটা চাচ্ছে।”
“ডিরেক্টর…” কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো ফিস্ক। “অনেক বছর আগে, মানে আমি যখন অসুস্থ ছিলাম, দাবা খেলতে পারতাম না তখন বৃটিশ সরকার আমাকে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে শিক্ষকের চাকরি জুটিয়ে দেয়। গত মাসে আমার ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর এসে আমাকে বললো কিছু লোক আমার সাথে দেখা করতে চাচ্ছে। তারা কারা আমি জানি না। তারাই আমাকে বললো, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এই টুর্নামেন্টে আমাকে খেলতে হবে। এজন্যে আমাকে তেমন কিছুই করতে হবে না…” হেসে ফেললো ফি, ঘরের চারপাটা দেখে নিলো সে। হাতের আংটিটা মোচড়াচ্ছে এখনও। তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে নিলো সোলাবিন।
“আপনাকে তেমন কিছুই করতে হবে না,” শান্তকণ্ঠে বললো সে, “তার কারণ আপনাকে সত্যিকার অর্থে কোনো খেলাই খেলতে হবে না। আপনাকে অন্য কেউ ইন্সট্রাকশন দেবে?”
ছলছল চোখে মাথা নেড়ে সায় দিলো ফিস্ক। সোলারিনের তীক্ষ্ণ চোখের সামনে সে ভেঙে পড়েছে। কথা বলার আগে বার কয়েক ঢোক গিলে নিলো।
“তাদেরকে আমি বলেছিলাম আমি এ কাজ করতে পারবো না, অন্য কাউকে বেছে নিতে, এবার তার কণ্ঠটা একটু চড়া হলো। আমাকে না খেলানোর জন্য অনেক অনুনয় করেছি কিন্তু তাদের কাছে আর কেউ ছিলো না। আমি পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাই। ইচ্ছে করলে যেকোনো সময় তারা আমাকে চাকরি থেকে ছাটাই করে দিতে পারতো। তারা আমাকে বলেছে…” দম ফুরিয়ে নিঃশ্বাস নিয়ে নিলো সে। সতর্ক হয়ে উঠলো সোলারিন। ফিস্ক তার চিন্তাভাবনা গুছিয়ে উঠতে পারছে না। হাতের আঙটিটা মোচড়াচ্ছে বার বার, যেনো সেটা তার হাতে খোঁচাচ্ছে। একটু পর পর উদভ্রান্ত চোখে ঘরে আশেপাশে তাকালো সে।
“তারা আমার কথা শুনতো না। যেকোনো মূল্যেই হোক তারা ফর্মুলাটা চায়। তারা বলেছে
“ফর্মুলা!” ফিস্কের কাঁধটা শক্ত করে ধরে বললো সোলারিন। “তারা ফর্মুলার কথা বলেছে?”
“হ্যা! হ্যাঁ! ঐ বালের ফর্মুলা, সেটাই তারা চায়।”
ফিস্ক এবার ভয়ানকভাবে কাঁপতে শুরু করলো। সোলারিন বুড়ো লোকটার পিঠে আলতো করে হাত বোলাতে লাগলো তাকে শান্ত করার জন্য। “ফর্মুলার ব্যাপারে আমাকে বলুন, খুব সতর্কভাবে বললো সে। বলুন, মাই ডিয়ার ফিস্ক। এই ফর্মুলাটার জন্য তারা এতো মরিয়া কেন? আপনি এই টুর্নামেন্ট খেলে এটা কিভাবে পাবেন সেটা কি তারা বলেছে আপনাকে?”
“আপনার কাছ থেকে,” মেঝের দিকে চেয়ে দূর্বল কণ্ঠে বললো ফিস্ক। দু’চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো।
“আমার কাছ থেকে?” স্থিরদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইলো সোলারিন। এরপর চমকে উঠে দরজার দিকে তাকালো সে। তার কাছে মনে হলো কেউ এদিকেই আসছে।
“জলদি কথা বলুন,” নীচুকণ্ঠে বললো। “তারা কিভাবে জানতে পারলো আমি এই টুর্নামেন্টে খেলবো? আমি যে আসছি সেটা তো কেউ জানতো না।”
“তারা জানতো,” ফিস্ক উন্মাদগ্রস্তের মতো তাকালো সোলারিনের দিকে। হাতের আংটিটা এখনও মুচড়িয়ে যাচ্ছে। “হায় ঈশ্বর, আমাকে রক্ষা করে। আমি তাদেরকে বলেছিলাম আমি এ কাজ করতে পারবো না! বলেছিলাম ব্যর্থ হবে!”
“আঙটিটা খুলে ফেলুন, দৃঢ়কণ্ঠে বললো সোলারিন। ফিঙ্কের হাতটা ধরে মোচড় মারলো সে। “কিসের ফর্মুলা?”
“স্পেনে খেলার সময় যে ফর্মুলাটা নিয়ে আপনি বাজি ধরেছিলেন!” আর্তনাদ করে উঠলো ফিস্ক। “আপনি বলেছিলেন আপনাকে যে হারাবে তাকে ফর্মুলাটা দিয়ে দেবেন! এটাই আপনি বলেছিলেন। আমি জিতে গেলে আমাকে সেটা দিয়ে দিতেন।”
অবিশ্বাস্য চোখে ফিস্কের দিকে চেয়ে রইলো সোলারিন। তার হাতটা ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেলো কয়েক পা। উদভ্রান্তের মতো হাসতে লাগলো সে।
“আপনি এটা বলেছিলেন,” আঙটিটা খুলতে খুলতে বললো ফিস্ক।
“ওহ না,” বললো সোলারিন। পেছনে ফিরে দেখে নিলো সে, চোখে জল। আসা পর্যন্ত হাসতে লাগলো। “মাই ডিয়ার ফিস্ক,” হাসতে হাসতেই বললো সে। “ওটা কোনো ফর্মুলা না! ঐসব বোকাগুলো ভুল বুঝেছে। আপনি একদল বাজে। দাবা খেলোয়াড়, যাকে আমাদের ভাষায় বলে পাতজার, তাদের খুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। আসুন বাইরে যাই…আপনি কি করছেন?!”
সে খেয়াল করে নি, আঙটিটা খুলতে গিয়ে ফিস্কের চেহারায় যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে। কিন্তু এখন, ফিস্ক তার আঙটিটা এক ঝটকায় খুলে কাছের একটা বেসিনে ফেলে দিলো। চিৎকার করে বললো সে, “আমি এ কাজ করবো না! করবো না!”
