পানি পড়ার শব্দ শুনে চমকে উঠে তাকিয়ে দেখতে পেলো বেসিনের ট্যাপ থেকে ঠাণ্ডা পানি পড়ছে। ফিস্ক একজন ইংরেজ, জনসম্মুখে বমি করাটাকে সে অসম্মানের বলে মনে করে।
“ওটা আপনার দরকার আছে,” নিজের সামনে থাকা বেসিন থেকে মুখ না সরিয়েই একটু জোরে বললো সোলারিন।
মুখ তুলে তাকালো ফিস্ক, তবে বুঝতে পারছে না কথাটা তাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে কিনা। অবশ্য টয়লেটের ভেতর তারা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। দ্বিধার সাথেই সে উঠে দাঁড়িয়ে সোলারিনের কাছে এগিয়ে গেলো। সে একটা পেপার টাওয়েল দুমড়ে মুচরে ফেলছে। সেটা থেকে ওটামিলের গন্ধ আসছে।
ফিরে কপাল আর মাথাটা স্পঞ্জ করে দিলো সোলারিন। “আপনি যদি আপনার হাত দুটো পানিতে ডুবিয়ে রাখেন কিছুক্ষণ তাহলে আপনার শরীরের রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে আসবে,” ফিস্কের জামার হাত ধরে বললো সে। কাছের একটা ডাস্টবিনে পেপার টাওয়েলটা ফেলে দিলো সোলারিন। পানি ভর্তি বেসিনে নিজের দু’হাত ডুবিয়ে রাখলো ফিস্ক, সোলারিন লক্ষ্য করলো সে তার হাতের আঙুলগুলো ভিজে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করছে।
একটা শুকনো পেপার টাওয়েলের উপর পেন্সিল দিয়ে কিছু লিখলো সোলারিন। ফিস্ক তার দিকে তাকালে লেখাটা তুলে ধরলো সে। এতে বলা আছে : “ট্রান্সমিটারটা কি একমুখি নাকি দ্বিমুখি?”
ফিস্কের চেহারা আরক্তিম হয়ে উঠলো। তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে কাগজটা ভাজ করে অন্য পিঠে আরো কিছু কথা লিখলো সোলারিন : “তারা কি
আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছে?”
গভীর করে দম নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো ফিস্ক, তারপর নেতিবাচকভাবে মাথা নাড়লো। পানি থেকে হাত তুলে পেপার টাওয়েলটা নিতে উদ্যত হলে সোলারিন তার দিকে অন্য একটা পেপার টাওয়েল বাড়িয়ে দিলো।
“এই টাওয়েলটা না,” কথাটা বলেই পকেট থেকে লাইটার বের করে লেখা থাকা টাওয়েলটা আগুনে পুড়িয়ে ফেললো সোলারিন। আপনি নিশ্চিত?” ছাইগুলো বেসিনে ফেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো সে। “এটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
“হ্যাঁ, অস্বস্তির সাথে বললো ফিস্ক। “আমাকে…তাই বলা হয়েছে।”
“বেশ, তাহলে আমরা কথা বলতে পারি। সোলারিনের হাতে এখনও লাইটারটা ধরা। “আপনার কোন্ কানে সেটা বসানো আছে? …ডান নাকি বামে?” ফিস্ক তার বাম কানে টোকা দিলে সোলারিন মাথা নেড়ে সায় দিলো কেবল। সাইটারের নীচ থেকে ছোট্ট একটা আঙটার মতো জিনিস বের করলো। সে। জিনিসটা আসলে ছোটোখাটো চিমটা।
“মেঝেতে শুইয়ে পড়ন, মাথাটা এমনভাবে রাখুন যাতে একদম না নড়ে। আপনার বাম কানটা উপরের দিকে রাখুন। হুট করে নড়াচড়া করবেন না। আপনার কানের পর্দা ছিঁড়ে ফেলার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।”
কথামতোই কাজ করলো ফিস্ক। সোলারিনের হাতে নিজেকে সপে দিয়ে। মনে হচ্ছে বেশ স্বস্তি পাচ্ছে সে, কোনো রকম প্রশ্নই করছে না। হাটু গেড়ে বসে পড়লো সোলারিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিস্কের কান থেকে ছোট্ট একটি জিনিস বের করে আনলো সে। চিমটা দিয়ে জিনিসটা উল্টেপাল্টে দেখে নিলো। আলপিনের মাথার চেয়ে একটু বড়।
“আহ্,” বললো সোলারিন। “আমাদেরগুলোর মতো অতো ছোটো না। মাই ডিয়ার ফিস্ক, এখন বলুন কারা আপনাকে এটা দিয়েছে? এসবের পেছনে রয়েছে কারা?” হাতের তালুর উপর জিনিসটা রেখে দিলো সে।
ধপাস করে বসে পড়ে সোলারিনের দিকে তাকালো ফিস্ক। মনে হলো এই প্রথম সে বুঝতে পারছে সোলারিন আসলে কে : নিছক কোনো দাবা খেলোয়াড় নয়, বরং একজন রাশিয়ানও। তার সঙ্গে আছে কেজিবির একজন এসকর্ট। সশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুয়ে পড়লো সে।
“আমাকে আপনার বলতে হবে। বুঝতে পারছেন, নাকি পারছেন না?” ফিস্কের আঙটিটার দিকে তাকালো সোলারিন। আঙটি পরা হাতটা তুলে নিয়ে ভালো করে লক্ষ্য করলো জিনিসটা। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো ফিস্ক।
আঙটিটার মাঝখানে বেশ বড়সড় একটা সিগনেট বসানো। দেখে মনে হচ্ছে স্বর্ণের তৈরি। সোলারিন সিগনেটটায় চাপ দিলে মৃদু শব্দে একটা ক্লিক করে আওয়াজ হলো। কানের কাছে নিয়ে খুব ভালো করে না শুনলে শব্দটা শোনা যেতো না। এভাবেই চেপে চেপে একটা কোডের মাধ্যমে দাবার চালগুলো বলে দিয়েছে ফিস্ক। এরপর তার সহযোগীরা তার কানে বসানো ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে কোন চালটা দিতে হবে।
“আপনাকে কি এই আঙটিটা না খোলার জন্যে সাবধান করে দেয়া হয়েছে?” জিজ্ঞেস করলো সোলানি। “এটার যে সাইজ তাতে মনে হয় অর কিছু এক্সপ্লোসিভ আর ডেটোনেটর থাকা সম্ভব।”
“ডেটোনেটর!” আর্তনাদ করে উঠলো ফিস্ক।
“এই ঘরটা উড়িয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট,” মুচকি হেসে বললো সে। “নিদেনপক্ষে আমাদের দু’জনকে তো খুব সহজেই উড়িয়ে দিতে পারে। আপনি কি আইরিশদের এজেন্ট? তারা ছোটোখাটো বোমার ব্যাপারে বেশ দক্ষ। যেমন ধরুন চিঠি বোমা, কলম বোমা। আমি জানি তার কারণ তাদের বেশিরভাগই রাশিয়াতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে।” ফিস্কের চেহারা সবুজ হয়ে গেলেও সোলারিন বলতে লাগলো, “আমার কোনো ধারণাই নেই আপনার বন্ধুরা কিসের পেছনে লেগেছে, মাই ডিয়ার ফিস্ক। কিন্তু কোনো এজেন্ট যদি আমাদের সরকারের সাথে বেঈমানি করে, যেমনটি আপনি করেছেন যারা আপনাকে পাঠিয়েছে তাদের সাথে, তবে তারা দ্রুত সেই এজেন্টকে সরিয়ে ফেলে।”
“কিন্তু…আমি তো কোনো এজেন্ট নই!” ফিস্ক চিৎকার করে বললো।
