আমি যদি সে মুহূর্তে জানতে পারতাম তার কথা কতোটা সত্যি তাহলে হয়তো এরপর যেসব ঘটনা ঘটে গিয়েছিলো সেসব বদলে যেতো। কিন্তু সে সময় আমি কি করে বুঝবো আসলেই কী ঘটছে-আমার থেকে মাত্র দশ ফিট দূরে-দাবাবোর্ডের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে সোলারিন কি স্টাডি করেছে?
.
সোলারিন যখন প্রথম লক্ষ্য করতে পেরেছিলো তখন সে দাবাবোর্ডের দিকে চেয়ে থাকে। প্রথমে তার চোখের কোণে এক ঝলক ধরা পড়ে জিনিসটা। তবে কৌশলে তিন তিনটি চাল দেবার পর ব্যাপারটা সে লক্ষ্য করে। সোলাবিন যতোবারই চাল দিয়ে ঘড়ি বন্ধ করেছে, ফিস্কের চাল দেবার সময় এসেছে তখনই সে তার দু’হাত কোলের উপর নিয়ে এসেছে। পরের বার সোণারিন চাল দিয়েই ফিস্কের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা ধরে ফেলে। তার আঙটিটা। ফিস্ক এর আগে কখনও আঙটি পরে নি।
খামখেয়ালিভাবে খেলে গেছে ফিস্ক। চান্স নিয়েছে সে। খুবই অভিনবভাবে খেলে গেছে ভদ্রলোক, তবে যখনই ঝুঁকি নিয়েছে সোলারিন তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছে। তার মুখে ঝুঁকি নেয়া লোকের অভিব্যক্তি ছিলো না। এরপর থেকেই তার হাতের আঙটিটার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে শুরু করে সোলারিন।
ফিস্কের শরীরে ট্রান্সমিটার লাগানো আছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সোলারিন অন্য কারো সাথে, কিংবা অন্য কিছুর সাথে খেলছে। এই ঘরের কারো সাথে নয় সেটা। সে আসলে ফিস্কের সাথে খেলছে না। একটু দূরে, দেয়ালের কাছে কেজিবি’র লোকগুলোর দিকে তাকায় সোলারিন। সে যদি এই জুয়াটায় অংশ নিয়ে খেলে যায় তাহলে সে হেরে যাবে, টুনামেন্ট থেকে ছিটকে পড়বে। তবে তার জানা দরকার কে বা কারা ফিস্ককে এই ট্রান্সমিটার লাগিয়ে দিয়েছে। কেন দিয়েছে।
ফিস্ক কিভাবে জবাব দেয় সেটা দেখে একটা প্যাটার্ন বের করার জন্য সোলারিন বিপজ্জনকভাবে খেলতে শুরু করে। এরফলে ফিস্কের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। তখনই সোলারিনের মাথায় কুইনদের এক্সচেঞ্জ করার আইডিয়াটা আসে, যার সাথে খেলার কোনো সম্পর্কই ছিলো না। সে তার কুইনটাকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসে, একেবারে অরক্ষিত করে ফেলে সেটাকে। ফিস্ককে তার নিজস্ব খেলাটা খেলতে বাধ্য করে সে, যাতে করে সে যে প্রতারণা করছে সেটা যেনো জানাজানি হয়ে যায়। ঠিক তখনই ফিস্ক ভেঙে পড়ে।
কয়েক মুহূর্তের জন্যে ফিস্ককে দেখে মনে হয়েছিলো ফিস্ক হয়তো এক্সচেঞ্জটা গ্রহণ করবে, তার কুইনকে খেয়ে ফেলবে। তাহলে জাজদের ডেকে খেলা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারতো সোলারিন। সে কোনো মেশিন কিংবা অন্য কারোর সাথে খেলবে না। কিন্তু ফিস্ক পিছিয়ে যায়, তার বদলে Jadobe চেয়ে বসে। লাফিয়ে উঠে ফিস্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে সোলারিন।
“আপনি এসব কী করছেন?” ফিসফিসিয়ে বলেছিলো সে। “আপনার মাথা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আমরা বিরতি নেবো। আপনি কি বুঝতে পারছেন না এখানে একজন কেজিবি আছে? আপনি যা করছেন তা যদি তাকে বলি তাহলে চিরজীবনের জন্য আপনার দাবা খেলা শেষ হয়ে যাবে।”
এক হাতে ঘড়ি দুটো বন্ধ করে অন্য হাতে আরবিটারদের ডাকে সোলারিন। তাদেরকে সে জানায় ফিস্ক অসুস্থ বোধ করছে, পরের চালটা সিল করে বিরতি নিতে চাইছে সে।
“আর সেটা অবশ্যই কুইন হতে হবে, স্যার,” ফিস্কের দিকে আরো ঝুঁকে বলেছিলো সোলারিন। ফিস্ক তার দিকে মুখ তুলে তাকায় নি। হাতের আঙটিটা মোচড়াতে শুরু করে সে, যেনো ওটা খুব টাইট হয়ে আছে। এরপরই সোলারিন ঘর থেকে ঝট করে বের হয়ে যায়।
হলের ভেতর খাটোমতো আর ভারি ভুরুর কেজিবি’র লোকটা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিলো। তার নাম গোপোল।
“একটু স্লিভোভিজ পান করে আসুন,” বলেছিলো সোলারিন। “আমাকেই ব্যাপারটা সামলাতে দিন।”
“হয়েছেটা কি?” গোগে জানতে চায়। সে কেন Jadobe চাইলো? এটা তো বেআইনী। আপনারও ঘড়ি দুটো বন্ধ করা উচিত হয় নি। এজন্যে তারা আপনাকে ডিসকোয়ালিফাইড করতে পারতো।”
“ফিস্কের শরীরের সাথে ট্রান্সমিটার লাগানো আছে। আমাকে জানতে হবে কে এটা করেছে, কেন করেছে। আপনি শুধু তাকে আরো বেশি ভয় পাইয়ে দেবেন। এখান থেকে চলে যান, ভান করেন যেনো কিছুই জানেন না। ব্যাপারটা আমি দেখছি।”
“কিন্তু ব্ৰদস্কি এখানে আছেন, নীচু কণ্ঠে বলে গোগোল। কেজিবি নামের সিক্রেট সার্ভিসে ব্ৰদস্কি খুবই উচ্চপর্যায়ের লোক। সোলারিনের সাথে যে বডিগার্ড আছে তার চেয়ে অনেক উঁচুপদমর্যাদার।
“তাহলে আপনার সাথে তাকে মদ্যপান করার জন্য আমন্ত্রণ জানান, চট করে বলে সোলারিন। “তাকে আমার কাছ থেকে আধ ঘণ্টার জন্য দূরে রাখুন। কোনো অ্যাকশনে যাওয়া যাবে না, বুঝতে পারছেন, গোগোল?”
বডিগার্ড কিছুটা ভড়কে গেলেও আর কোনো কথা না বলে চলে যায়। সোলারিন বেলকনির শেষমাথায় গিয়ে ফিস্কের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে কখন সে গেমিংরুম থেকে বের হয়ে আসে।
.
বেলকনি দিয়ে দ্রুত হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে নীচের ফয়ারে নেমে যাচ্ছে ফিস্ক। উপর থেকে যে সোলারিন তাকে দেখছে সেটা সে জানে না। ভবনের বাইরে এসে প্রাঙ্গণটা পেরিয়ে বিশাল বটআয়রনের গেটটা দিয়ে বের হয়ে গেলো। এই ক্লাবে ঢোকার পথেই একপাশে রয়েছে কানাডিয়ান ক্লাবে ঢোকার পথ। ফিস্ক সেখানে ঢুকে পড়লো।
সোলারিনও তাকে অনুসরণ করতে করতে চলে এলো সেখানে। ক্লাবের টয়লেট রুমে ঢুকে পড়লো ফিস্ক। ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো সারি সারি ইউরিনাল বেসিনের সামনে। তার অলক্ষ্যে সোলারিন তাকে দেখে যাচ্ছে। হঠাৎ করে ফিস্ক হাটু গেড়ে বসে পড়লো। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো ভদ্রলোক-শব্দহীন-অশ্রুহীন-তারপর আরো ঝুঁকে বেসিনের উপর বমি করে দিলো সে। বমি করা শেষ করে ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথাটা বোলের সাথে ঠেক দিয়ে রাখলো।
